যুদ্ধ অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। খৃস্টান সৈন্যরা বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়েছে। তাদের কমাণ্ড ভেঙ্গে পড়েছে। রসদ-পানি এসে পড়েছে জঙ্গীর কজায়। এ যুদ্ধের আগা-মাথা, দিক-পাশ কিছুই ধরতে পারছে না তারা। কী থেকে কী হয়ে গেল, কী-ইবা হচ্ছে, কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না। কোন দিশা না পেয়ে তারা পালাতে শুরু করে। পালাবার শক্তিও যাদের নেই, তারা আত্মসমর্পণ করতে থাকে।
সেনাপতি রেজল্ট হার মানতে প্রস্তুত নন। তিনি একস্থানে কিছু সৈন্য জড়ো করে নেন এবং তাদেরকে জঙ্গীর অবস্থান সম্পর্কে অবহিত করেন। তারা জঙ্গীর অবস্থানের উপর হামলা চালায়। জীবন্মুত্যুর লড়াই লড়ছে খৃস্টান সৈন্যরা। চতুর্থ কিংবা পঞ্চম রাতে জঙ্গীর গেরিলা গ্রুপের কিছু সৈন্য রেজাল্টের নিজস্ব তাঁবুতে হামলা চালায়।
ভোর হল। খৃস্টান সেনাপতি রেজল্ট বন্দী হিসেবে জঙ্গীর সামনে দণ্ডায়মান। সুলতান জঙ্গী বিভিন্ন শর্তে তাকে মুক্তি দেয়ার কথা ভাবছেন। মুক্তির শর্তগুলো তাকে অবহিত করছেন। বাইতুল মোকাদ্দাসের প্রসঙ্গ আসে। জঙ্গী বললেন, বাইতুল মোকাদ্দাসকে আমাদের হাতে তুলে দিয়ে তুমি মুক্ত হয়ে যাও।
সন্ধ্যা নাগাদ সুলতান আইউবীও এসে পড়েন।
যথাযথ সম্মানের সাথে রাখা হয়েছে রেজনাল্টকে। সুলতান আইউবী তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে আলিঙ্গনাবদ্ধ হন।
আপনি এক মহান যোদ্ধা। সুলতান আইউবীর উদ্দেশ্যে রেজােল্ট বললেন।
বরং বল, ইসলাম এক মহান ধর্ম- সুলতান বললেন- সেই যোদ্ধা-ই মহান হন, যার ধর্ম মহান।
মোহতারাম রেজনাল্ট আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, তাদের নৌ-বহর এসেছে নাকি? নুরুদ্দীন জঙ্গী সুলতান আইউবীকে বললেন- এ প্রশ্নের সঠিক জবাব তুমি-ই দিতে পার; আমি তো এখানেই ছিলাম।
আপনাদের নৌ-বহর সমভিব্যহারে এসেছিল- সুলতান আইউবী বললেন- আবার ফিরেও গেছে। অনেকগুলো জাহাজ সমুদ্রের তলায় ডুবে গেছে। যেগুলো ডুবেনি, সেগুলোর পোড়া খোল সমুদ্রে ভেসে বেড়াচ্ছে। যেসব সৈন্য জাহাজ থেকে নেমেছিল, তারা একজনও ফিরে যেতে পারেনি। আপনাদের সমস্ত মরদেহ আমরা পূর্ণ সম্মানের সাথে মাটিতে পুঁতে রেখেছি।
সুলতান আইবী সেনাপতি রেজল্টকে যুদ্ধের পুরো ঘটনার বিবরণ প্রদান করছেন আর রেজল্ট তন্ময় হয়ে শুনছেন। তার বিশাস হচ্ছিল না যে, সুলতান যা বলছেন, সত্য বলছেন কি?
আপনি যা শোনালেন, যদি সত্য হয়, তাহলে বলতে পারেন, এমনটা কিভাবে সম্ভব হল? রেজনাল্ট জিজ্ঞেস করে। তার চোখে-মুখে দুনিয়ার বিস্ময়।
এই রহস্য আপনাকে সেদিন উন্মোচন করব, যেদিন ফিলিস্তীন থেকে খৃষ্টানদের সর্বশেষ সৈন্যটি বেরিয়ে যাবে- নুরুদ্দীন জঙ্গী বললেন- আপনার এই পরাজয় শেষ পরাজয় নয়। কেননা, আপনারা এই ভূখন্ড ত্যাগ করতে ইচ্ছুক নন মনে হচ্ছে।
আপনার ভূখন্ড আমি আপনাকে দিয়ে দিব- রেজনাল্ট বললেন- আপনি আমাকে মুক্তি দিন। আমি আপনার সঙ্গে আর যুদ্ধ না করারও চুক্তি করব। আপনার সাম্রাজ্য অনেক বিস্তৃত হয়ে যাবে।
নিজের রাজত্ব নয়-সুলতান আইউবী বললেন, আমরা আল্লাহর রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করার জন্য লড়াই করছি। আমরা ইসলামের সাম্রাজ্য বিস্তৃত করতে চাই। আপনাদের লক্ষ ইসলামের মূলোৎপাটন, যা কোনদিনও সম্ভব নয়। আপনারা ফৌজ ব্যবহার করে দেখেছেন। নৌ-শক্তিও পরীক্ষা করেছেন। নিজ কন্যাদেরও ব্যবহার করে দেখেছেন। আপনারা আমাদের জাতির মধ্যে গাদ্দার তৈরি করেছেন। বলুন, বিগত এক শতাব্দীতে কতটুকু সাফল্য অর্জন করেছেন?
আমি কি আপনাকে বলব যে, আমরা কোন্ কোন্ স্থান থেকে ইসলাম বের করে দিয়েছি?- রেজল্ট বলল- ইসলাম তো রোম উপসাগরের ওপারে পৌঁছে গিয়েছিল। বলুন তো সেখান থেকে ইসলাম কেন বিতাড়িত হয়েছে? রোম আপনাদের হাতছাড়া হল কেন? সুদান কেন আপনাদের দুশমনে পরিণত হল? শুধু এই জন্য যে, ইসলামের মোহাফেজদেরকে আমরা ক্রয় করে নিয়েছি। আর আজও আপনাদের বহু শাসক ভাই আমাদের কেনা গোলাম। তাদের শাসনাধীন ভূখন্ডগুলোতে মুসলমান আছে বটে; ইসলাম নেই।
আমরা ওসব ভূখন্ডে ইসলামকে পুনর্জীবিত করব। সুলতান আইউবী বললেন।
আপনি স্বপ্ন দেখছেন, সালাহুদ্দীন!- রেজল্ট বললেন- আপনারা দুজন কদিন জীবিত থাকবেন? কদিন যুদ্ধ করতে পারবেন? আপনারা ইসলামের পাসবানী কতদিন পর্যন্ত করবেন? আমি আপনাদের দুজনের প্রশংসা করছি। স্বীকার করছি, আপনারা সফল। আপনারা দুজন সত্যিই ইসলামের রক্ষণাবেক্ষণ করছেন। কিন্তু আপনাদের জাতির মধ্যে ধর্মকে নীলামে বিক্রয়কারী লোকের সংখ্যা অনেক। আমরা হলাম ক্রেতা। আপনারা আমাদেরকে পরাজিত করতে পারবেন না। আপনাদের জাতির কর্ণধাররা আকণ্ঠ বিলাসিতায় নিমজ্জিত। আপনারা অস্বীকার করতে পারবেন না যে, যে পঁচন একটি জাতির মাথা থেকে শুরু হয়, তা রোধ করা যায় না; গোটা জাতিই তাতে ধ্বংস হয়ে যায়। সে কারণে আমরা আপনাদের জাতির কর্ণধারদের ফাঁদে ফেলেছি। আপনারা যদি আমাকে হত্যা করে ফেলেন, যদি আমার ন্যায় দুচারজন খৃস্টান সম্রাটকে খুন করেন, তবু ইসলামের পতন অনিবার্য। আমরা যে বিষ আপনাদের জাতির শিরায় ঢুকিয়ে দিয়েছি, তার ক্রিয়া দিন দিন বাড়বে বৈ কমবে না।
সেনাপতি রেজল্ট এমন এক বাস্তবতার বিবরণ দিচ্ছিলেন, সুলতান আইউবী ও নুরুদ্দীন জঙ্গী যা অস্বীকার করতে পারেন না। কিন্তু আপাতত তারা তো খৃস্টানদের উপর বিশাল এক বিজয় অর্জন করেছেন এবং এ মুহূর্তে খৃস্টানদের একজন বড় মাপের কমান্ডার তাদের হাতে বন্দী আছে। আরো অনেক খৃস্টান তাদের হাতে বন্দী হয়েছে।
