নৌ-বাহিনী প্রধান সাদী বিন সাদ-এর। এক মাল্লা জবাব দেয়।
সুলতান আইউবী দৌড়ে নীচে নেমে আসেন। লাশের উপর থেকে কাপড়টা সরালেন। তার নৌ-বাহিনী প্রধান সাদী বিন সাদ-এর রক্ত রঞ্জিত লাশ!
মাল্লারা জানায়, সাদী বিন সাদ একটি জাহাজে গিয়ে পৌঁছে যুদ্ধের কমাণ্ড হাতে তুলে নেন এবং নিজে লড়াই করতে থাকেন। সেই জাহাজটির উপর তিনি তার কমাণ্ডের পতাকা উড়িয়ে দেন। খুব সম্ভব সে কারণেই খৃস্টানদের চারটি জাহাজ তাকে ঘিরে ফেলে। প্রতিরোধের শিকার হয়ে সেগুলোর মধ্যে দুটি জাহাজ ধ্বংস হয়ে যায়। সাদী বিন সাদ-এর জাহাজও ধ্বংস হয়।
সুলতান আইউবী তার নৌ-বাহিনী প্রধানের লাশের হাতে চুমো খেয়ে অশ্রু ছল ছল নয়নে বললেন, তুমি-ই সমুদ্রের বিজেতা সাদী বিন আদ- আমি নই।
সুলতান আইউবী নির্দেশ দেন, দুশমনের কিশতিগুলো সব সমুদ্রে ডুবিয়ে দাও। শহীদদের লাশগুলো সব সমুদ্র থেকে তুলে আন, একটি লাশও যেন সমুদ্রে না থাকে। তাদেরকে এখানেই দাফন কর। রোম উপসাগরের হিমেল হাওয়া চিরদিন তাদের কবরগুলোকে ঠাণ্ডা রাখবে।
সমুদ্রে শহীদহওয়া মুজাহিদদের সংখ্যা কম ছিল না।
***
বাইতুল মোকাদ্দাস থেকে খৃস্টানদের বাহিনী রওনা হয়ে অর্ধেক পথ অতিক্রম করেছে। তারা জানেনা যে, তাদের নৌ-বাহিনী চূড়ান্ত পরিণতিতে পৌঁছে গেছে। খৃস্টানদের খ্যাতনামা যুদ্ধবাজ ম্রাট রেজল্ট তাদের কমাণ্ডার। বাহিনীটি তিন ভাগে বিভক্ত। এক অংশ সম্মুখে। দ্বিতীয় অংশ কিছুটা পিছনে মধ্যখানে এবং তৃতীয় অংশ অনেক বাঁ ঘেষে এগিয়ে চলছে। বাহিনীর সম্মিলিত কমান্ড রেজনাল্টের হাতে। তাদের আশা, তারা সুলতান আইউবীর উপর সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত অবস্থায় আঘাত হানতে সক্ষম হবে। কল্পনার চোখে তারা কায়রো দেখতে পাচ্ছে। ঘোড়া-গাড়ির কাফেলা এবং রসদও আছে তাদের সাথে।
ইস্কান্দারিয়া থেকে অনেক দূরে উত্তর-পশ্চিমে বিস্তৃত বালুকাময় এক এলাকা। এখানকার কোথাও মাটির টিলা, কোথাওবা সমতল ভূমি। তার পার্শ্ববর্তী এলাকাটা পর্বতময়। পর্যাপ্ত সুপেয় পানি আছে এখানে। এই এলাকায় ছাউনি ফেলেন কমান্ডার রেজােল্ট। তার বাহিনীর অগ্রগামী অংশ এগিয়ে চলছে সম্মুখে। ডানদিকের অংশ এখনো অনেক দূরে পিছনে। মধ্যরাতে হঠাৎ-নিতান্ত-ই হঠাৎ সম্পূর্ণ অকল্পনীয়ভাবে প্রলয়কাণ্ড ঘটে যায় তার ক্যাম্পে। কেয়ামতটা আসমান থেকে নেমে এল, নাকি তার বাহিনী বিদ্রোহ করে বসল, কিছুই বুঝে উঠতে পারলেন না তিনি।
সুলতান নুরুদ্দীন জঙ্গীর ফাঁদে এসে পা দিয়েছে রেজল্ট। জঙ্গী তার সৈন্যদেরকে কয়েকদিন যাবত বসিয়ে রেখেছেন এ এখানকার বিভিন্ন জায়গায়। তিনি ধরে নিয়েছেন, যেহেতু এখানে পানি আছে, কাজেই খৃস্টানরা অবশ্যই এখানে ছাউনি ফেলবে।
সুলতান জঙ্গীর কমাণ্ডারদের দুঃখ, খৃস্টান বাহিনীর অগ্রগামী অংশ আগে চলে গেছে। তাদের প্রতি নির্দেশ ছিল, রাতে ছাউনিতে হামলা চালাবে। কিন্তু অগ্রগামী বাহিনী এখানে ছাউনি না ফেলে এগিয়ে গেছে সামনের দিকে। অনেক পরে তারা দূরে ধূলির মেঘ দেখতে পায়। তারা ভেবেছিল, ঝড় আসছে। মরু এলাকার ঝড়োহাওয়া বড় ভয়ানক হয়ে থাকে। কিন্তু আসলে তা ঝড় নয় খৃস্টান বাহিনীর মধ্যম অংশ। তারা এসে এ স্থানে থেমে যায়। তারা তাবু স্থাপন করেনি। কেননা, ভোরেই তাদেরকে রওনা হতে হবে। পশুগুলোকে আলাদা বেঁধে রাখে। সূর্য ডুবে যায়।
মধ্যরাতে জঙ্গীর ওঁত পেতে থাকা সৈন্যরা বাইরে বেরিয়ে আসে। তারা সকলে-ই আরোহী। তারা প্রথমে অন্ধাকারে তীরবৃষ্টি বর্ষণ করে। খৃস্টান সৈন্যদের মধ্যে হুলস্থুল শুরু হয়ে যায়। এবার আরোহীরা ঘোড়া ছুটায়। এলোপাতাড়ি বর্শা ও তরবারী চালাতে চালাতে সামনে এগিয়ে যায়। খৃস্টান সৈন্যরা নিজেদের সামলে নিতে না নিতে-ই জঙ্গীর সৈন্যেরা আবার তীব্র। আঘাত হানে। খৃস্টানদের বেঁধে রাখা ঘোড়াগুলোর রশি খুলে দেয়া হয়। সঙ্গে সঙ্গে ঘোড়াগুলো এদিক-ওদিক ছুটাছুটি শুরু করে। রেজল্ট এলাকা ছেড়ে পালিয়ে পিছনের বাহিনীর সঙ্গে গিয়ে মিলিত হয়। বাহিনীর সেই অংশটি এখান থেকে এখনো অনেক দূরে ছাউনি ফেলে অবস্থান করছে। নুরুদ্দীন জঙ্গী সেদিকে-ই কোথাও অবস্থান করছেন। খৃস্টান বাহিনীর সমস্ত রসদ পিছনে আসছে। জঙ্গী তাঁর জন্য আলাদা ইউনিট নিয়োজিত করে রেখেছেন। তারা ভোর নাগাদ রসদের উপর দখল প্রতিষ্ঠিত করে ফেলে। ডানদিকের বাহিনী রাতে-ই টের পেয়ে গিয়েছিল। রেজােল্ট সেই বাহিনীকে নিজের কাছে নিয়ে আসতে চাইছেন। তার ধারণা মতে যুদ্ধ এখানেই সংঘটিত হবে। এই বাহিনী ভোরের আলো-আঁধারিতে রওনা হয়। নুরুদ্দীন জঙ্গী পিছন থেকে তার এক পার্শ্বের উপর আক্রমণ করে বসেন। তারা টেরই পেলনা যে, আক্রমণটা কোন্ দিক থেকে আসল বা কে করল। সুলতান আইউবীর ন্যায় জঙ্গীও এক জায়গায় স্থির হয়ে লড়াই করেন না। ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে হামলা করে প্রতিপক্ষকে বিক্ষিপ্ত করার চেষ্টা করে থাকেন।
সুলতান জঙ্গী রাতে সুলতান আইউবীর নিকট দূত প্রেরণ করেন। পরিকল্পনা তো দুজনে আগেই তৈরী করে রেখেছেন। জঙ্গীর প্রতিটি কর্মতৎপরতা, পদক্ষেপ ও দুশমনের গতিবিধি হুবহু তার পরিকল্পনা মোতাবেক পরিচালিত হচ্ছে। রেজল্ট তার অগ্রগামী বাহিনীকে পিছনে সরে আসার বার্তা প্রেরণ করে। চারদিন পর্যন্ত জঙ্গী ও রেজনাল্টের মধ্যে লড়াই চলতে থাকে। জঙ্গী খৃস্টান সৈন্যদের বিক্ষিপ্ত করে ফেলেন এবং আঘাত কর আর পালাও-এর নীতি অনুযায়ী যুদ্ধ চালিয়ে যান। খৃস্টানদের সম্মুখের বাহিনী পিছনে সরে আসে। রাতে তার উপর পিছন দিক থেকে হামলা হয়। হামলা করে সুলতান আইউবীর কমাণ্ডো বাহিনী। তারা দু-তিন রাত কমাণ্ডো হামলা চালায় এবং সঙ্গে সঙ্গে অদৃশ্য হয়ে যায়। এই ধারা অব্যাহত থাকে তারপরও। খৃস্টানরা মুখোমুখি লড়াই করার চেষ্টা করছে। কিন্তু সুলতান আইউবী তাদেরকে সফল হতে দিচ্ছেন না। যে পন্থায় হামলা চলছে, তাও চাট্টিখানি বিষয় নয়। আক্রমণে কমাণ্ডে যদি যাচ্ছে একশ, ফিরে আসছে ষাটজন। তা ছাড়া তার জন্য প্রয়োজন বিশেষ দক্ষতা, বীরত্ব ও দৃঢ়তা, যা সুলতান আইউবী তার সৈন্যদের মধ্যে সৃষ্টি করে রেখেছেন।
