সুলতানের এই পদক্ষেপে বাহিনী প্রধান স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন। তার কামনাও এটা-ই ছিল। তিনি সুলতান আইউবীকে বললেন, খৃস্টানরা জাহাজগুলোতে যেসব মালামাল ও রসদপাতি বোঝাই করে রেখেছে, সেগুলো এখন তাদের পক্ষে বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। রসদ ছাড়া তাদের জাহাজে ফৌজও আছে। কোন কোন জাহাজে ঘোড়াও আছে। এই কারণে তাদের জাহাজের গতি কম, চক্কর কাটতে সময় লাগে। অন্যদিকে আমার জাহাজ শূন্য ও হালকা।
সুলতান আইউবীর নৌ-বাহিনী প্রধানের জখম খুব গুরুতর। এখন আর তিনি বসে থাকতে পারছেন না, মাথাটা দুলছে। সুলতান ডাক্তার ডেকে পাঠান।
সুলতানের স্থাণীয় হেড-কোয়ার্টার সমুদ্র কূলবর্তী এক পার্বত্য এলাকায়। তিনি উঁচু একখণ্ড পাথরের উপর দাঁড়িয়ে আছেন। সূর্যের প্রভাত-কিরণ সমুদ্রের যে দৃশ্য উপস্থাপন করল, তা রীতিমত ভয়াবহ। অনেকগুলো জাহাজ মত্ত হাতীর ন্যায় সমুদ্রে দিগ্বিদিক ঘুরে বেড়াচ্ছে। আগুনে জ্বলছে বহু জাহাজ। পাল-মাস্তুল পুড়ে যাওয়ায় একই স্থানে দাঁড়িয়ে চক্কর কাটছে জাহাজগুলো। সমুদ্রে বহু মানুষ ভাসতে দেখা গেল। তরঙ্গমালা লাশগুলোকে তীরের দিকে ছুঁড়ে ছুঁড়ে মারছে। নিজের জাহাজগুলোর কোন সন্ধান পেলেন না সুলতান। অনেক দূরে পশ্চিমদিকে প্রথমে অনেকগুলো মাস্তুলের মাথা, তারপর পাল চোখে পড়তে শুরু করে। জাহাজগুলো এক সারিতে একটা থেকে অপরটা বেশ ব্যবধানে রণাঙ্গন অভিমুখে এগিয়ে আসছে। সুলতান আইউবী তোমার জাহাজ আসছে বলেই তিনি পার্শ্বের দিকে দৃষ্টিপাত করেন। কিন্তু নৌ-বাহিনী প্রধান সেখানে নেই।
নৌ-বাহিনী প্রধান তার জাহাজ-বহরের আগমন দেখে-ই সুলতানকে কিছু না বলে উপর থেকে নেমে যান। সুলতান যখন তাকে দেখতে পান, ততক্ষণে তিনি একটি নৌকায় চড়ে বসেছেন এবং নৌকার পালও উঠে গেছে। নৌকাটা দশ দাঁড়ের। সুলতান চীৎকার করে তাকে ডাক দেন- সাদী! তুমি ফিরে আস, তোমার স্থলে আমি আবু ফরীদকে পাঠাচ্ছি।
নৌ-বাহিনী প্রধান বেশ দূরে চলে গেছেন। তিনি উচ্চকণ্ঠে জবাব দেন এটা আমার যুদ্ধ আমীরে মেসের! আল্লাহ হাফেজ।
নৌকাটা দ্রুতগতিতে দূর থেকে দূরান্তে চলে যেতে থাকে। তারপর একসময় দৃষ্টিসীমার বাইরে হারিয়ে যায়।
দূত এসে সুলতান আইউবীকে সংবাদ দেয়, ইস্কান্দারিয়ার উত্তর-পশ্চিমে তিন মাইল দূরে খৃস্টানদের কিছু সৈন্য অবতরণ করেছে এবং সেখানে ঘোরতর লড়াই চলছে। সুলতান সেখানকার জন্য কিছু নির্দেশ জারি করেন এবং সমুদ্রের যুদ্ধ অবলোকন করতে থাকেন।
সুলতান দেখতে পান, খৃস্টানদের একটি জাহাজ কূলের একেবারে নিকটে এসে পড়েছে। আবার তার বহরের একটি জাহাজও ঐ জাহাজটির কাছে চলে আসার চেষ্টা করছে। খৃস্টানরা বৃষ্টির মত তীর ছুঁড়ে সেটিকে প্রতিহত করার কসরত চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু মুসলমান মাল্লারা সবকিছু উপেক্ষা করে জাহাজটির একেবারে নিকটে চলে যায় এবং লাফিয়ে লাফিয়ে জাহাজে ঢুকে পড়ে-ই হাতাহাতি লড়াই করে জাহাজটি দখল করে নেয়। মিসর নৌ-বাহিনীর জানবাজ সৈন্যরা খুন ও জীবনের নজরানা পেশ করে এ যুদ্ধ জয় করে। তারা তিন তিনজন, চার চারজন করে ভাগে ভাগে শত্রুপক্ষের বিভিন্ন দলের সঙ্গে লড়াই করে। জীবন দিয়ে জীবন নিয়ে তারা শত্রুর জাহাজটা দখল করে নেয়।
খৃস্টানদের কোমর রাতারাতি-ই ভেঙ্গে যায়। তাদের কমাণ্ডার ক্রুশের শপথ পূর্ণ করে চলেছে। তারা তাদের সৈন্যদেরকে ভোর পর্যন্ত এই আশ্বাস দিয়ে দিয়ে লড়াতে থাকে যে, এই অল্প সময়ের মধ্যেই আমরা সুলতান আইউবীর ক্ষুদ্র বাহিনীটিকে কাবু করে ফেলছি। কিন্তু পরদিন দ্বি-প্রহর পর্যন্ত তাদের অবস্থা দাঁড়ায়, জাহাজগুলো বিক্ষিপ্ত হয়ে যেদিক থেকে এসেছিল সেদিকেই ফিরে যেতে থাকে। তাদের অধিকাংশ শক্তি মুসলমানদের হাতে ধ্বংস হয়ে গেছে। তাদের যে ক্ষুদ্র বাহিনীটি কূলে অবতরণ করেছিল, তাদের অনেকে ইস্কান্দারিয়া থেকে তিন-চার মাইল দূরে উত্তর-পশ্চিমে একস্থানে লাশ হয়ে পড়ে আছে। অবশিষ্টরা মুসলমানদের হাতে আত্মসমর্পণ করেছে।
সুলতান আইউবীর বাহিনীর দ্বিতীয় গ্রুপ এখনো যুদ্ধে অবতরণ করেনি। সুলতানের নিকট দূত আসছে-যাচ্ছে। তিনি যখন নিশ্চিত হলেন যে, খৃস্টানরা পরাজিত হয়ে গেছে, তখন তিনি ফৌজের দ্বিতীয় গ্রুপটিকে অন্য এক ময়দানে প্রেরণ করেন। ইমরানের তথ্য মোতাবেক বাইতুল মোকাদ্দাসের দিক থেকেও খৃস্টান ফৌজ আসার কথা। তাদের জন্য নুরুদ্দীন জঙ্গী ওঁত পেতে আছেন। তথাপি অধিক সতর্কতার জন্য সুলতান আইউবী তাঁর প্রতিরক্ষা শক্ত করে নেন। সুলতান তৃতীয় যে গ্রুপটিকে নিজের অধীনে লুকিয়ে রেখেছিলেন, তাদেরকে সেই খৃস্টানদের গ্রেফতার করার কাজে লাগিয়ে দেন, যারা সমুদ্র থেকে উঠে আসছে।
শেষ বেলার ক্লান্ত সূর্যের ম্লান কিরণমালা সুলতান আইউবীকে যে দৃশ্যটি প্রদর্শন করল, তাহল, এখন খৃস্টানদের সেই জাহাজগুলো-ই দেখা যাচ্ছে, যেগুলো পুড়ে গেছে, কিন্তু এখনো ডুবেনি কিংবা যেগুলোকে মুসলমানরা ধরে নিয়ে এসেছে অথবা সেই জাহাজগুলোর-ই পাল-মাস্তুল নজরে আসছে, যেগুলো ফিরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে দ্রুতগতিতে দূরে সরে যাচ্ছে। অপরদিকে সুলতানের নিজের যে জাহাজগুলো ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পেয়ে গেছে, সেগুলো কূলের দিকে এগিয়ে আসছে। দর্শকরা অনুমান করল, সুলতান আইউবীর অর্ধেক নৌ-শক্তি মিসরের জন্য আত্মত্যাগ করেছে। নৌকাগুলো কূলের দিকে আসছে। ধ্বংসপ্রাপ্ত জাহাজের রক্ষাপাওয়া আহত-অক্ষত সৈন্যরা এগুলোতে করে কূলে আসছে। একটি নৌকা সেই টিলাটির নিকটে এসে কূলে ভিড়ে, সুলতান আইউবী যার উপর দাঁড়িয়ে। কার যেন লাশ তার মধ্যে। সুলতান আইউবী বিচলিত কণ্ঠে উচ্চস্বরে জিজ্ঞেস করেন, এই, এটি কার লাশ?
