শহরের অলি-গলিতে প্রদীপ জ্বলে উঠে। ঘরের ছাদ থেকে তীর বৃষ্টি শুরু হয়। খৃস্টানরা পিছন দিকে পালাতে উদ্যত হয়। কিন্তু ডান-বাম থেকেও তাদের উপর তীর বর্ষিত হতে থাকে। আত্মসংরক্ষণ করা তাদের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে। তীরের আঘাত খেয়ে আহত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ছে সৈন্যরা। তাদের হাঁক-ডাক আর আর্তচিৎকারে রাতের পরিবেশ প্রকম্পিত হয়ে উঠে।
সংখ্যায় তারা দুহজার। দুচার-জন জীবনে রক্ষা পেলেও পেতে পারে। অন্যরা সব ধ্বংস হয়ে গেছে সুলতান আইউবীর যোদ্ধাদের হাতে।
যেসব খৃস্টান সৈন্য জাহাজ থেকে অবতরণ করেনি, তারা এগিয়ে যাওয়ার নির্দেশ পায়। তারা এলোপাতাড়ি অগ্নিগোলা ও বহুদূরগামী তীর ছুঁড়তে শুরু করে।
কাপ্তানরা পিছনের দিকে তাকিয়ে দেখে, হঠাৎ একেবারে পিছনের দুতিনটি জাহাজ থেকে আগুনের শিখা জ্বলে উঠেছে। তাদের মনে হল, যেন সমুদ্রের ভিতর থেকে আগুনের গোলা উঠে এসে জাহাজে নিক্ষিপ্ত হচ্ছে। পরম আত্মবিশ্বাসের শিকার হয়ে খৃস্টানরা সবগুলো জাহাজকে একত্রিতভাবে জড়ো করে রেখেছিল তাদের ধারণা, বিনা বাধায় বিজয় তাদের সুনিশ্চিত। কিন্তু তারা যে সুলতান আইউবীর পাতা ফাঁদে এসে ঢুকেছে, সে খবর তাদের নেই।
দিনের বেলা প্রথম জাহাজের কাপ্তান যে সব জেলের সাথে কথা বলেছিল, তারাও ছিল আলী বিন সুফিয়ানের গোয়েন্দা বিভাগের লোক। কিন্তু সমুদ্রে জেলেদের পেয়ে যাওয়াকে সৌভাগ্য মনে করে তাদের থেকে ভুল তথ্য সংগ্রহ করে সে আনন্দ করেছিল। জেলেরা তাদেরকে একটি তথ্য-ই সঠিক দিয়েছিল যে, মিসরের নৌ-বহর এখান থেকে অনেক দূরে। ছিল আসলে দূরে-ই।
সুলতান আইউবী তার নৌ-বাহিনী প্রধানকে বলে রেখেছিলেন, সমুদ্রের প্রতি নজর রাখ; যে কোন সময় হামলা আসতে পারে। নৌ-বাহিনী প্রধান নজরদারীর বিশেষ ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন। তিনি সময়ের আগে ই খবর পেয়ে যান যে, খৃস্টানদের নৌ-বহর মাঝ-দরিয়ায় এসে পড়েছে। তিনি কয়েকটি যুদ্ধ জাহাজকে যেগুলোতে অগ্নি-গোলা নিক্ষেপকারী মিনজানীক স্থাপন করা আছে- দূরে একদিকে পাঠিয়ে দেন। জাহাজগুলোর পাল-মাস্তুল নামিয়ে রাখা হয়েছে, যাতে দূর থেকে দেখা না যায়। তার পরিবর্তে তিনি জাহাজগুলোকে গতিময় করার জন্য একাড়ে দুজন করে লোক নিয়োজিত করেন।
সন্ধ্যার পর যখন খৃস্টানদের নৌ-বহর তীরে এসে ভীড়ে, সঙ্গে সঙ্গে মিসরের নৌ-বাহিনী প্রধান তার জাহাজগুলোর পাল-মাস্তুলও তুলে দেন। দাঁড়ের গতিও তীব্রতর করে তুলেন। অল্পক্ষণের মধ্যে তিনি এমন একসময় খৃস্টানদের জাহাজ-বহরের পিছনে গিয়ে পৌঁছেন, যখন তারা তাদের জাহাজগুলোকে একটার সঙ্গে অপরটা মিলিয়ে নোঙ্গর করে রেখেছে। খৃস্টানদেরকে এই প্রবঞ্চনায় ফেলেছে ইস্কান্দারিয়া থেকে আসা জেলেরা। তারা খৃস্টান কমাণ্ডারকে বলেছিল, আমরা আপনাদের-ই গুপ্তচর। তারা তথ্য দিয়েছিল, ইস্কন্দারিয়ায় কোন ফৌজ নেই। অথচ বাস্তব অবস্থা হল, নগরীর সমুদ্রবর্তী বাড়ী-ঘরগুলোতে শুধু ফৌজ-ই ছিল- অধিবাসীদেরকে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে নিরাপদ আশ্রয়ে।
সুলতান আইউবীর নৌ-বাহিনী প্রধান মাত্র অল্প কটি জাহাজ নিয়ে গিয়েছিলেন। তা দ্বারা-ই তিনি দুশমনের ব্যাপক ক্ষতি সাধন করতে সক্ষম হন। কয়েকটি জাহাজ পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। অন্যরা মোকাবেলা করে। জ্বলন্ত জাহাজগুলো রাতকে দিবসে পরিণত করে দেয়। সেই আলোতে সুলতান আইউবীর জাহাজগুলোও চোখে পড়তে শুরু করে। তার মধ্য থেকে একটি জাহাজ খৃস্টানদের আক্রমণের শিকার হয়ে পড়ে। আইউবীর নৌ-প্রধান তার জাহাজগুলোকে পিছনে সরিয়ে নিতে শুরু করেন। খৃস্টানরা সেগুলোকে ঘিরে ফেলার চেষ্টা করতে থাকে। ইস্কান্দারিয়ায় অবস্থানরত আইউবীর জানবাজরা দুশমনের জাহাজগুলোতে অগ্নি-গোলা ছুঁড়তে শুরু করে। এই জানবাজরা মিসরের বাহিনীর তৃতীয় অংশ, যাদেরকে সুলতান নিজের হাতে রেখে দিয়েছিলেন। তাদেরকে-ই অসামরিক বেশে ইস্কান্দারিয়ার বসত বাড়ীগুলোতে সাজিয়ে রাখা হয়েছিল এবং অতি নীরবে শহরের বাসিন্দাদেরকে অন্যত্র সরিয়ে দেয়া হয়েছিল। সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী লড়ছেন বুদ্ধি আর কৌশলের লড়াই। শক্তি ব্যয় করছেন নিতান্ত কম। তার নিজের অধীনৈ রাখা আছে এখনো অনেক কমাণ্ডো।
রাতভর এই যুদ্ধ অব্যাহত থাকে। সমুদ্রে জ্বলতে থাকে অসংখ্য জাহাজ। এক প্রলয়ের দৃশ্য সৃষ্টি হয়ে আছে নদীতে। খৃস্টানদের জাহাজ অসংখ্য। বিপুল পরিমাণ ধ্বংসপ্রাপ্ত হওয়ার পর এখনো আস্তো আছে অনেকগুলো। এগুলো মুসলমানদের জাহাজগুলোকে ঘিরে ফেলার চেষ্টা করছে। অবস্থা অনেকটা ঘিরে ফেলার মতো-ই হয়ে গেছে। রাত হওয়ার কারণে অবস্থা পরোপুরি আঁচ করা যাচ্ছে না। সুলতান আইউবীও রণাঙ্গনে উপস্থিত। তিনি নিরাপদ স্থানে লুকিয়ে রাখা জাহাজগুলোকে অভিযানে অংশ নেয়ার নির্দেশ প্রেরণ করেন। রাতের শেষ প্রহরে সেগুলোও এসে পড়ে।
রাত পোহাতে আর দেরি নেই। মিসরের নৌ-বাহিনী প্রধান একটি নৌকায় করে কূলে এসে পৌঁছান। সঙ্গে তার কয়েকজন সিপাহী। তার পরিধানের পোশাক রক্তে রঞ্চিত। এক-পা আগুনে ঝলসে গেছে। তিনি যে জাহাজে ছিলেন, সেটিও পুড়ে গেছে। নিজে আহত হয়ে কয়েকজন সিপাহীকে উদ্ধার করে নিয়ে তীরে এসেছেন। তিনি সুলতান আইউবীকে পরিস্থিতির বিবরণ দেন যে, তার অর্ধেক জাহাজ ধ্বংস হয়ে গেছে। খৃস্টানদেরও এতো অধিক ক্ষতি হয়েছে যে, আর বেশী সময় লড়াই করার সাধ্য তাদের নেই। সুলতান আইউবী তাকে অবহিত করেন যে, আমাদের অবশিষ্ট জাহাজগুলোকেও পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে।
