দ্বিতীয় অংশকে ইস্কান্দারিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে যাওয়ার আদেশ দেন। তাদের প্রতি নির্দেশনা, রওনা হবে রাতে আর গন্তব্যে পৌঁছবে দিনের বেলা। এ দলের কমান্ডারদেরকে বলে দিলেন, তোমার গন্তব্য কোথায় এবং সর্বশেষ অবস্থান কোন স্থানে হবে, তা পরে জানান হবে।
তৃতীয় দলকে সুলতান আইউবী নিজের হাতে রেখে দেন। তিনি কোন দলের কমান্ডারকে বলেননি যে, এই অভিযানের উদ্দেশ্যে কি? তারা সবাই দেখতে পেল, সবগুলো মিনজানীক সেই দলটিকে দেয়া হয়েছে, যাদের গন্তব্য ইস্কান্দারিয়া।
এর সাত দিন পর। সুলতান আইউবী কায়রোতে নেই, নুরুদ্দীন জঙ্গী কার্কে নেই। দুজনই ইস্কান্দারিয়ার পূর্বপ্রান্তে ঘোরাফেরা করছেন। কিন্তু কারো বুঝার যো নেই যে, এরা কোন্ দেশের সম্রাট কিংবা সেনাকমান্ডার। কারো বুঝার সাধ্য নেই যে, এরাই তারা, যারা খৃস্টানদের জন্য আপাদমস্তক আতংক। এ মুহূর্তে তারা দুজন নিরীহ উষ্ট্ৰচালক, কোথা থেকে এসেছে, কোথায় যাবে কেউ জানে না।
সমুদ্রের কূলে গিয়ে তারা চোখের দৃষ্টিতে রোম উপসাগরের বিস্তৃতি পরিমাপ করেন। দূর-দূরান্ত পর্যন্ত তাদের এই ঘোরাফেরা অব্যাহত থাকে তিন-চারদিন পর্যন্ত। তারপর নুরুদ্দীন জঙ্গী চলে যান কার্কে আর সুলতান আইউবী ইস্কান্দারিয়া গিয়ে তার নৌ-বাহিনী প্রধানকে জরুরী নির্দেশনা দিয়ে মিসর ফিরে যান।
***
পূর্ণ নীরবতা ও গোপনীয়তা রক্ষা করে এসে পড়ে খৃস্টানদের নৌ-বহর। বাইতুল মোকাদ্দাস থেকে মিসর অভিমুখে রওনা দেয় স্থল বাহিনী। উভয় বাহিনী রওনা দেয় সময়ের মিল রেখে। বেশ উপযুক্ত মওসুম বেছে নিয়েছে খৃস্টানরা। শান্ত সমুদ্র। ঝড়-ঝঞ্ঝা, ঢেউ-তরঙ্গের আশংকা নেই।
খৃস্টীয় নৌ-জাহাজের কাপ্তানদের মিসরের উপকূলীয় এলাকা চোখে পড়তে শুরু করেছে। একেবারে সম্মুখের জাহাজের কাপ্তান সমুদ্রে একটি মাছধরা নৌকা দেখতে পায়। চলে যায় নৌকার কাছে। জাহাজ থামিয়ে উপর থেকে ঝুঁকে জিজ্ঞেস করে, এই, তোমাদের জঙ্গী জাহাজগুলো কোথায়? মিথ্যে বললে কিন্তু পানিতে ডুবিয়ে মারব।
জেলেরা বলল, মিসরের জাহাজ এদিকে থাকেনা। এখান থেকে এনেক দূরে থাকে।
জাহাজ থেকে একটি রশি ফেলা হয়। দুজন জেলে রশি বেয়ে জাহাজে উঠে যায়। তারা কাপ্তানকে মিসরের যুদ্ধজাহাজ সম্পর্কে যেসব তথ্য প্রদান করে, তাহল, কয়েকটি জাহাজের মেরামতের কাজ চলছে। যেগুলো ভাল, সেগুলোও ইস্কান্দারিয়া পৌঁছতে দুদিন প্রয়োজন হবে। কারণ, একে তো এখান থেকে অনেক দূরে, তদপুরি ওগুলোর পাল ও দাঁড় দুর্বল। জেলেরা খৃষ্টানদেরকে সবচেয়ে মূল্যবান যে তথ্যটি প্রদান করে, তা হল, সুলতান আইউবী নৌ-বাহিনীর প্রতি তেমন গুরুত্ব দেন না; ফলে এই শাখার সৈন্য ও মাল্লারা অলসতা-বিলাসিতায় নিমগ্ন হয়ে পড়ে থাকে। তারা কূলবর্তী লোকালয়ে চলে যায়, জেলেদের থেকে মাছ ছিনিয়ে নেয় আর খায়।
খৃস্টান নৌ-বাহিনীর রাহবারের জন্য এই সব তথ্য দারুণ সুসংবাদ-ই বটে। সে জাহাজ থামিয়ে দেয় এবং একটি নৌকায় করে বাহিনীর কমাণ্ডারের নিকট ছুটে যায়। কমাণ্ডারকে জেলেদের থেকে প্রাপ্ত তথ্যসমূহ অবহিত করে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী ময়দান ফাঁকা। কমাণ্ডার জাহাজের বহর এখানেই থামিয়ে দেয় এবং সন্ধার পর অন্ধকারে কূলে গিয়ে ভিড়বে বলে সিদ্ধান্ত নেয়।
ইস্কান্দারিয়ার বন্দরঘাট থেকে আরো একটি নৌকা সমুদ্রের দিকে ছেড়ে আসে। বাহ্যত মাছধরার নৌকা। সূর্য এখনো অস্ত যায়নি। নৌকাটা খৃস্টানদের জাহাজের বহরের নিকট চলে যায়। অন্তত আড়াইশ যুদ্ধ-জাহাজ সমুদ্রে দূর দূরান্ত পর্যন্ত ছড়িয়ে আছে। জেলেরা নৌকাটা বহরের মধ্যখান দিয়ে নিয়ে যায় এবং একে ওকে জিজ্ঞাসা করে কমাণ্ডারের নিকট চলে যায়। তারা কমাণ্ডারকে জানায়, ইস্কান্দারিয়ায় কোন ফৌজ নেই। আছে শুধু সাধারণ মানুষ। মিসরের যুদ্ধ জাহাজ এখান থেকে অনেক দূরে। এই জেলেরা মূলত সুলতান আইউবীর গোয়েন্দা; কিন্তু পরিচয় দেয় খৃস্টানদের গোয়েন্দা বলে।
রাতের প্রথম প্রহর। প্রথম সারির জাহাজগুলো সম্মুখ পানে এগিয়ে চলে এবং কোন বাধা-প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই কূলে ভিড়ে। দ্বিতীয় সারিটি প্রথমটির পিছনে পিছনে এগিয়ে এসে নোঙ্গর ফেলে। এগিয়ে আসে তৃতীয়টিও।
সৈন্য অবতরণ করার ব্যবস্থা এই ছিল যে, প্রতিটি জাহাজ তীরে ভিড়বে না। একটির সঙ্গে আরেকটি সামনে পিছনে লাগোয়া থাকবে আর একের পর এক জাহাজ বেয়ে একেবারে সম্মুখের জাহাজ দিয়ে তারা ডাঙ্গায় অবতরণ করবে।
খৃস্টানদের সিদ্ধান্ত, ইস্কান্দারিয়ার উপর নীরবে হামলা করবে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী ইস্কান্দারিয়ায় মুসলমানদের কোন সৈন্য নেই, কোন প্রতিরোধের আশংকাও নেই। শহরটি অতি অনায়াসে দখল হয়ে যাবে।
সম্মুখের জাহাজ থেকে যেসব সৈন্য অবতরণ করে, তাদেরকে ইস্কান্দারিয়ায় ঢুকে পড়ার নির্দেশ দেয়া হল। তাদের আগাম বলে দেয়া হল, শহর তোমাদের কোন প্রতিরোধ হবে না। হুড়মুড় করে ছুটে চলে খৃস্টান সৈন্যরা। শহরটা লুণ্ঠন করা তাদের প্রথম কাজ। দ্বিতীয় কাজ নারীদের প্রতি হস্ত প্রসারিত করা।
কিন্তু বাহিনীটি যেইমাত্র শহরের কাছাকাছি চলে আসে, শহরের বাইরে ডানে-বাঁয়ে হঠাৎ করে বিভিন্ন স্থানে আগুন জ্বলে উঠে। অগ্নিশিখায় অন্ধকার রাত আলোকিত হয়ে যায়। এগুলো শুকনো খড়, কাঠ ও কাপড়ের স্তূপ। রাতের অন্ধকারে আলোর প্রয়োজনে কেরোসিন ঢেলে এগুলোতে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়েছে।
