সুলতান আইউবী তৎক্ষণাৎ তার সকল সিনিয়র কমান্ডদের তলব করেন। আলী বিন সুফিয়ানকে নির্দেশ দেন, দুশমনের গোয়েন্দাদের প্রতি নজরদারী তীব্রতর কর, তৎপরতা বৃদ্ধি কর, যাতে তারা আমাদের বাহিনীর গতিবিধি সংক্রান্ত কোন সংবাদ বাইরে পাচার করতে না পারে। ইস্কান্দারিয়া সম্পর্কেও তিনি জরুরী নির্দেশনা প্রদান করেন।
***
বৃটেন এখনো এ-যুদ্ধে শরীক হতে চাচ্ছে না। ইংরেজদের আশা ছিল, তারা একাই যে কোন সময় মুসলমানদেরকে পরাজিত করে মুসলিম অঞ্চলগুলো দখল করে নিতে পারবে। কিন্তু পোপের অনুরোধে তারা ক্রুসেডারদেরকে গোটা কতক যুদ্ধজাহাজ প্রদান করে। স্পেনের পূর্ণ বহর এই আক্রমণে অংশ নিতে প্রস্তুত। ফ্রান্স, জার্মানী এবং বেলজিয়ামের জাহাজও এসে পড়েছে। এই সম্মিলিত নৌ-বহরে ইউনান ও সিসিলীর কতগুলো জঙ্গী কিশতীও যোগদান করেছে। রসদ ও অস্ত্র বহনের জন্য নেয়া হয়েছে মাছ ধরার পালতোলা নৌকা। এ বহরে ঐ সকল দেশ থেকে তাগড়া সৈনিকরা এসে যোগ দিচ্ছে, যারা ক্রুশে হাত রেখে শপথ করেছিল, বিজয় অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত ঘরে ফিরবে না।
সালাহুদ্দীন আইউবী যদি তার নৌ-বাহিনী দ্বারা আমাদের মোকাবেলা করে, তাহলে তাকে মিসরের সমান মূল্য দিতে হবে- রোম উপসাগরের ওপারে এক কনফারেন্সে বসে ফরাসী নৌ-বাহিনীর কমান্ডার বলল- আমরা জানি, তার নৌবাহিনীর কতটুকু শক্তি আছে। সালাহুদ্দীন আইউবী ও নুরুদ্দীন জঙ্গী স্থলপথে লড়াই করার মানুষ। আমরা আশা করতে পারি যে, এই অভিযানের সংবাদ মুসলমানরা সময়ের আগে জানতে পারবে না। সালাহুদ্দীন আইউবী যখন এ সংবাদ পাবেন, ততক্ষণে আমরা কায়রো অবরোধ করে ফেলব। আর নুরুদ্দীন জঙ্গীও তার সাহায্যে আসতে পারবেন না। আমাদের এই আক্রমণ হবে চূড়ান্ত।
আমি আবারো বলছি, সুদানীদেরকে কাজে লাগানো আবশ্যক। বললেন রেনাল্ট। রেনাল্ট একজন প্রখ্যাত খৃস্টান সম্রাট ও যুদ্ধবাজ। তার দায়িত্ব বাইতুল মোকাদ্দাসের দিক থেকে স্থলপথে আসা ও আক্রমণ করা। তিনি শুরু থেকেই জোর দিয়ে বলছিলেন, মিসরের উপর উত্তর ও পশ্চিম দিক থেকে হামলা হলে দক্ষিণ দিক থেকে সুদানীরা যাতে আক্রমণ করে, সেই ব্যবস্থা করা হোক।
আপনি পূর্বের অভিজ্ঞতার কথা ভুলে যাচ্ছেন- ইসলামের সবচেয়ে বড় শত্রু ফিলিপ অগাস্টাস বললেন- ১১৬৯ সালে আমরা সুদানকে দেদারছে সাহায্য দিয়েছিলাম এবং এই আশায় আমরা সমুদ্রপথে মিসর আক্রমণ করেছিলাম যে, সুদানীরা দক্ষিণ দিক থেকে হামলা করবে এবং সালাহুদ্দীন আইউবীর বাহিনীতে যেসব সুদানী আছে, তারা বিদ্রোহ করবে। কিন্তু তারা কিছুই করেনি। দুবছর পর আবার তাদেরকে মদদ দিলাম। তাতেও কোন সুফল পেলাম না। তারা আবারো আমাদেরকে হতাশ করল। এখন কেন আমরা তাদেরকে আমাদের এই অভিযানে শরীক করতে যাব? আপনি জানেন না যে, সুদানীদের মধ্যে মুসলমানদের সংখ্যা। মুসলমানদের উপর ভরসা রাখা ঠিক নয়। আপনি যদি সত্য সত্য ইসলামের নাম-চিহ্ন মুছে ফেলতে চান, তাহলে কোন মুসলমানকে বন্ধু বানাবেন না। ক্রয় করে তাদেরকে কাজে লাগাতে পারেন, বন্ধুত্বের ভাব দেখাতে পারেন, কিন্তু অন্তরে তাদের প্রতি শক্রতা-ই পোষণ করতে হবে।
আপনি ঠিকই বলেছেন- অপর এক খৃস্টান সম্রাট বললেন আপনারা ফাতেমীদেরকে বন্ধু বানিয়েছিলেন। কিন্তু সালাহুদ্দীন আইউবীর শত্রু হওয়া সত্ত্বেও তারা এখন পর্যন্ত তাকে হত্যা করতে পারেনি। আমরা তাদেরকে বড় বড় যোগ্যতাসম্পন্ন গোয়েন্দা ও নাশকতা কর্মী দিয়েছিলাম। কিন্তু তারা ভুল সিদ্ধান্ত দিয়ে তাদেরকে ধরা খাইয়েছে ও খুন করিয়েছে। তাই এখন আর আমরা কারো প্রতিই আস্থা রাখতে পারছি না। আমাদের ভরসা একমাত্র আমাদের নিজেদের সামরিক শক্তির উপর। এখন সাফল্য আমাদের সুনিশ্চিত।
বিপুল সমরশক্তিতে গর্বিত খৃস্টানরা। তাদের নৌ-শক্তির তো কোন হিসাব নেই। বাইতুল মোকাদ্দাসের দিক থেকে যে বাহিনী আসছে, সংখ্যায় তারা সমুদ্রপথে আগমনকারী সেনাসংখ্যার দ্বিগুণ। অন্তত ছয়জন সম্রাটই আছেন এই বাহিনীতে। নিজ নিজ বাহিনী নিয়ে আসা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শাসকের সংখ্যা ছিল অগনিত। তবে তাদের একটি ত্রুটি ছিল, তাদের একক কমান্ড ছিল না। তথাপি এই বাহিনী অতি অনায়াসে সুলতান আইউবী ও নুরুদ্দীন জঙ্গীকে পরাস্ত করে ফেলার কথা।
সুলতান আইউবীর দুর্বলতা, প্রথমত তাঁর সৈন্য কম। দ্বিতীয়ত গাদ্দাররা মিসরে অশান্তি ছড়িয়ে রেখেছে। বড় আশংকা, সুদানীরা হামলা করে বসতে পারে। নুরুদ্দীন জঙ্গীও ঠিক এ ধরনেরই সমস্যার সম্মুখীন। ইসলামী দুনিয়া ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যে বিভক্ত। শাসকরা ভোগ-বিলাসিতায় মত্ত। তারা প্রত্যেকে খৃস্টানদের করতলগত। ইসলাম ও মুসলমানের মর্যাদার কোনই পরোয়া নেই তাদের।
সুলতান আইউবী তার সিনিয়র কমান্ডারদেরকে ডেকে মূল বাহিনীকে তিন ভাগে ভাগ করে ফেলেন। এক অংশকে সুদানের সীমান্ত অভিমুখে রওনা হয়ে যেতে বললেন। তার কমান্ডারকে নির্দেশ দেন, সীমান্তের বেশ দূরে তবু স্থাপন করবে; কিন্তু বাহিনীকে বিভিন্ন স্থানে এমনভাবে সক্রিয় ও তৎপর রাখবে, যেন ধূলিবালি উড়তে থাকে, যাতে শত্রুরা মনে করে, তোমাদের সৈন্য অনেক। একটি বিশেষ নির্দেশ প্রদান করলেন যে, কখনোই যেন বাহিনী বেকার না থাকে।
