বিলম্ব না করে আমাকে কায়রোর উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে যাওয়া উচিত ইমরান বলল- দিন তো বেশী নেই। সময়ের অনেক আগেই আমীরে মেসেরের সংবাদটা পেয়ে যাওয়া দরকার।
তুমি এক্ষুণি রওনা হয়ে যাও- নুরুদ্দীন জঙ্গী বললেন- আমি তোমাকে উন্নতজাতের ঘোড়া দিচ্ছি।
সুলতান জঙ্গীর নির্দেশিত পথে ইমরান কায়রোর উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে যায়। এ-পথে বেশকটি সেনা চৌকি আছে। প্রতিটি চৌকিতে দূতদের ঘোড়া, পরিবর্তনের ব্যবস্থা আছে।
… আর সালাহুদ্দীনকে প্রথম কথাটা বলবে, সে যেন রহীম ও রেজার পরিবারকে নিজের পরিবারভুক্ত করে নেয়। বাইতুলমাল থেকে যেন তাদের পরিজনের ভরণ-পোষণের ব্যবস্থা করে।
নুরুদ্দীন জঙ্গী ইমরানকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি শুধু গুপ্তচরবৃত্তিই জান, নাকি যুদ্ধও বুঝ?
কিছু বুঝি না তা নয়- ইমরান জবাব দেয়- আপনি হুকুম করুন।
পয়গাম লেখার সময় নেই- নুরুদ্দীন জঙ্গী বললেন- তুমি সালাহুদ্দীনকে বলবে, কার্কের নিয়ন্ত্রণভার তার হাতে তুলে দিয়ে আমার বাগদাদ ফিরে যাওয়ার প্রয়োজন ছিল। একের পর এক খবর পাচ্ছি, সেখানে খৃস্টানদের নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড বেড়ে চলেছে এবং আমাদের ছোটখাট শাসকরা তাদের হাতে খেলছে। কিন্তু তোমার এই টাটকা সংবাদটা আমাকে এখানে থাকতে বাধ্য করছে। বছর চার-পাঁচেক আগে তোমরা রোম উপসাগরে খৃস্টানদের নৌ-বহরকে ডুবিয়ে দিয়েছিলে। তারা তোমাদের ফাঁদে আটকে গিয়েছিল। এবার তারা আসবে অধিক সতর্কতা অবলম্বন করে। সে জন্যই তারা ইস্কান্দারিয়ার উত্তর কূলকে বেছে নিয়েছে। তোমরা যদি সরাসরি সমুদ্রে তাদের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ কর, তা ভুল হবে। তোমাদের কাছে খৃস্টানদের সমান নৌ-শক্তি নেই। তাদের আছে বিশাল বিশাল জাহাজ। প্রতিটি জাহাজে পাল ছাড়াও আছে অসংখ্য দাঁড়। দাঁড় চালনার জন্য আছে বিপুলসংখ্যক মাল্লা। তোমাদের তা নেই। তোমাদের স্বতন্ত্র মাল্লা নেই। যারা মাল্লা, তারাই সৈনিক। নৌ-যুদ্ধে তারা একত্রে দুকাজ আঞ্জাম দিতে পারবে না। তাই আমার পরামর্শ, শত্রুকে কূল পর্যন্ত আসতে দাও। ওরা অগ্নিগোলা নিক্ষেপ করে নগরীতে আগুন ধরিয়ে দিতে পারে। তার মোকাবেলার ব্যবস্থা করতে হবে।
…ইমরান যে তথ্য নিয়ে এসেছে, দুশমন যদি সে মতেই আক্রমণ চালায়, তাহলে আমি থাকব দুশমনের পার্শ্বে। তাদের হিসেবে বাঁ-পার্শ্বে। ডান পার্শ্বকে তোমরা নিয়ন্ত্রণ করবে। তোমাদের দায়িত্বে আরেকটি কাজ এই থাকবে যে, খৃস্টানদের জাহাজগুলো যেন ফিরে যেতে না পারে। পিছুহটার চেষ্টা করলে আগুন ধরিয়ে দেবে। তোমাদের কাছে যদি নৌ কমান্ডো থাকে, তাহলে জানই তো তাদের দ্বারা কী কাজ নেয়া যাবে। আর সুদানের প্রতি সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে, আশা করি সে কথা বলতে হবে না। ওদিককার সীমান্ত উন্মুক্ত না থাকে যেন। আমার ধারণা, তোমাদের কাছে সৈন্য কম। সেই অভাব আমি পূরণ করার চেষ্টা করব। সবচেয়ে বড় প্রয়োজন গোপনীয়তা রক্ষা করা। গোপনীয়তার খাতিরে আমি পয়গাম লিখে পাঠালাম না। আল্লাহ বিজয় দান করলে আমি কার্কের দায়িত্বভার ফৌজের হাতে তুলে দিয়ে বাগদাদ চলে যাব।
নুরুদ্দীন জঙ্গীর এই পয়গাম হৃদয়ঙ্গম করে ইমরান কায়রোর উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে যায়।
১১৭৪ খৃস্টাব্দের গোড়ার দিকের কোন একদিন যখন আলী বিন সুফিয়ান সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীকে সংবাদ দিলেন যে, আক্ৰায় এক গোয়েন্দা শহীদ হয়েছে, একজন ধরা পড়েছে এবং তাদের কমান্ডার ইমরান ফিরে এসেছে; তখন সঙ্গে সঙ্গে সুলতান নির্জীব হয়ে যান। বেদনা-ভারাক্রান্ত মুখে আলী বিন সুফিয়ানের সঙ্গে দুচারটি কথা বলেই তিনি ইমরানকে ভেতরে ডেকে নেন এবং বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে তাকে বুকে জড়িয়ে ধরেন। বন্ধন ছেড়ে দিয়ে পুনরায় বসে ব্যাকুল কণ্ঠে বললেন, বল, তোমার এক সঙ্গী কিভাবে শহীদ হল, অপরজন কিভাবে ধরা পড়ল?
ইমরান পুরো ঘটনা সবিস্তার বর্ণনা দেয়। সুলতান আইউবী তন্ময় হয়ে ঘটনার বিবরণ শোনেন। তারপর ইমরান যখন তার আক্রা থেকে নিয়ে আসা মহামূল্যবান তথ্যের বিবরণ দেয়, শুনে সুলতান আইউবী চমকে ওঠেন। ইমরান আরো অবহিত করে যে, আমি নুরুদ্দীন জঙ্গীকেও বিষয়টি অবহিত করে এসেছি। ইমরান সুলতান আইউবীকে নুরুদ্দীন জঙ্গীর বার্তা শোনায়।
সুলতান আইউবী সর্বপ্রথম রহীম ও রেজার পরিবারের জন্য ভাতা চালু করে দেন। তারপর ইমরানকে অনেক বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন। ইমরান জানায়, খৃস্টানদের নৌ-বহর আগেকার তুলনায় বড় হবে। আক্রমণ হবে এক মাসের মধ্যে। ইউরোপ থেকে তাগড়া সৈন্য আসবে। তাদেরকে ইস্কান্দারিয়ার উত্তর কূলে অবতরণ করান হবে। অপর বাহিনী আসবে বাইতুল মোকাদ্দাস থেকে। এরা মিসরের দিকে এগিয়ে যাবে। ইস্কান্দারিয়ার উত্তর কূলে অবতরণ করা সৈন্যরা ইস্কান্দারিয়া দখল করে সে অঞ্চলকে তাদের আখড়ায় পরিণত করবে। তারপর উত্তরদিক থেকে মিসরের উপর আক্রমণ চালাবে। ইমরানের প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী খৃস্টানদের আশা, তারা সুলতান আইউবীর অজান্তেই অভিযানটা সেরে ফেলবে এবং নুরুদ্দীন জঙ্গীও তাকে কোন সাহায্য করতে পারবেন না। কেননা, পথে বাইতুল মোকাদ্দাসে অবস্থানরত বাহিনী প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে। বাস্তবিক সে এমনই এক ঝড় ছিল সে, সুলতান আইউবী আগাম খবর যদি না পেতেন, তাহলে খৃস্টানরা সুনিশ্চিতরূপেই মিসর দখল করে নিত।
