সান্ত্রীর উপস্থিতিতেঘোড়া খুলে নেয়া সম্ভব নয়। ইমরান তাকে কথায় মাতিয়ে তোলে। এক পর্যায়ে তার পেছনে গিয়ে দুবাহু দ্বারা তার ঘাড়টা ঝাঁপটে ধরে। সান্ত্রীর দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। ইমরান বাঁহাতে তাকে শক্ত করে ধরে ডান হাতে কোমর থেকে খঞ্জরসম ছোট তরবারীটা বের করে সান্ত্রীর পেটে আঘাত করে। মারা যায় সান্ত্রী।
ইমরান রেজাকে ডেকে নিয়ে আসে। দুটি ঘোড়া খুলে নিয়ে জিন বাঁধে। তারপর দুজন দুটিতে চড়ে ছুটে চলে।
গীর্জার অন্য সান্ত্রীরা কোথাও ঘুমিয়ে আছে। ইমরান ও রেজা এগিয়ে যায়। শহর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার একাধিক পথ আছে। তারা একটি পথ ধরে এগুতে থাকে। বেরিয়ে যায় শহর থেকে। আচমকা তারা কতগুলো লোকের বেষ্টনীতে পড়ে যায়। হাঁক আসে- থাম, তোমরা কারা?
আমরা এলাকার বাসিন্দা- ইমরান বলল- তোমাদের ন্যায় আমরাও কর্তব্য পালন করছি।
তিন-চারটি প্রদীপ জ্বলে ওঠে, যার আলোতে ইমরান ও রেজা দেখতে পায়, একটি অশ্বারোহী বাহিনী এদিক-ওদিক ছড়িয়ে আছে। এবার তাদের স্মরণে আসে, আরে, শহর তো সীল করে দেয়া হয়েছে! ইমরানের গায়ের পোশাকে নিহত সান্ত্রীর রক্তের দাগ। সেদিকে খেয়াল নেই তার। প্রদীপের আলোতে খৃস্টান সেনাদের চোখ পড়ে যায় সেদিকে। তারা জিজ্ঞেস করে, তোমার শরীরে রক্তের দাগ কেন? ইমরান বুঝে ফেলে অবস্থা বেগতিক। কথা বাড়িয়ে ঝামেলা করলেই ক্ষতি। তার চেয়ে পালাবার চেষ্টা করা ভাল।
হাতে ধরা লাগামটা ঝটকা একটা টান দিয়ে ঘোড়া হাঁকিয়ে দেয় ইমরান। রেজাও তার অনুসরণ করে। বেষ্টনী ভেদ করে বেরিয়ে যেতে চেষ্টা করে। খানিকটা বিলম্ব করে ফেলেছে তারা।
ইমরান বেষ্টনী ভেদ করে বেরিয়ে যেতে সক্ষম হয়। তার পেছনে ছুটছে তিন অশ্বারোহী। রেজা শক্রর হাতে ধরা পড়ে যায়। রেজার উচ্চকণ্ঠের ধ্বনি ইমরান শুনতে পায়- থামবে না ইমরান, ছুটে যাও- আল্লাহ হাফেজ।
অনেক দূর পর্যন্ত ইমরান এই শব্দ শুনতে থাকে। ইমরানের ঘোড়াটা বেশ উন্নতজাতের- দ্রুতগামী। তার ডান-বা দিয়ে তীর অতিক্রম করতে শুরু করে। পথ তার চেনা। কার্ক অভিমুখে দ্রুতবেগে ছুটে চলে ইমরান। ধাওয়াকারীদের সাথে তার ব্যবধান বাড়তে থাকে।
পরদিন ভোরবেলা। সূর্য উদিত না হলেও ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। ততক্ষণে চলনশক্তি হারিয়ে ফেলেছে ইমরানের ঘোড়া। কিন্তু পানির সন্ধান করার সুযোগ তার নেই। সামনের এলাকা বালুকাময় প্রান্তর। ঘোড়া হাঁটছে ধীরলয়ে।
ইমরান মরু এলাকায় প্রবেশ করেছে মাত্র, এমন সময় দুটি তীর এসে বিদ্ধ হয় তার সম্মুখে। এর অর্থ হল থেমে যাও। ইমরান দাঁড়িয়ে যায়। লোকগুলো ইমরানের বাহিনীরই সদস্য। দেখে হালে পানি আসে তার।
ইমরানকে কমান্ডারের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। কমান্ডার তার কথা শুনে তাকে একটি তাজাদম ঘোড়া ও দুজন সিপাহী দিয়ে কার্ক অভিমুখে রওনা করিয়ে দেয়। ইমরান নুরুদ্দীন জঙ্গীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে কায়রো যাবে। আক্রা থেকে যে তথ্য নিয়ে এসেছে, তা জঙ্গীর নিকট পৌঁছিয়ে যেতে চায় সে।
***
ইমরান যখন কার্ক দুর্গে নুরুদ্দীন জঙ্গীর সামনে বসে তার কাহিনী বিবৃত করছিল, তখন সুলতান জঙ্গী তার প্রতি এমনভাবে তাকিয়ে থাকেন, যেন তিনি এ সুদর্শন যুবকটিকে হৃদয়ের মণিকোঠায় স্থান করে দিতে চাইছেন। সুলতান জঙ্গী বসা থেকে দাঁড়িয়ে ব্যাকুলচিত্তে ইমরানকে বুকে জড়িয়ে ধরেন এবং গণ্ডদ্বয়ে চুম্বন করেন। তিনি খাপ থেকে তরবারীটা বের করে আবার সেটি খাপে ঢুকিয়ে দুঠোঁটে স্পর্শ করে চুমো খান। তিনি তরবারীটা দুহাতের তালুতে নিয়ে ইমরানকে উদ্দেশ করে বললেন, যে সময়টায় খৃস্টানরা হিংস্র চিলের ন্যায় মুসলমানদের চাঁদ-তারার উপর ছোঁ মেরে চলেছে, তখন একজন মুসলমান তার একজন মুসলিম ভাইকে তরবারী অপেক্ষা ভাল আর কী উপহার দিতে পারে! তুমি বাগদাদে বল, দামেস্কে বল, অন্য যে কোন জায়গায় বল, আমি তোমাকে একটি মহল উপহার দিতে পারি। তুমি যে কৃতিত্ব প্রদর্শন করেছ, তার বিনিময়ে তুমি বিপুল অর্থ পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য। কিন্তু প্রিয় বন্ধু আমার! আমি তোমাকে প্রাসাদ পুরস্কার দেব না। সম্পদের স্তূপ দিয়েও আমি তোমাকে পুরস্কৃত করব না। কারণ, এ দুটি বস্তুই মুসলমানদেরকে অন্ধ ও পঙ্গু করে দিয়েছে। এই নাও, এটি আমার পক্ষ থেকে তোমাকে দিলাম। এটি আমার তরবারী। মনে রাখবে, এই তরবারী প্রবল প্রতাপশালী বহু খৃস্টানের রক্তপান করেছে। এই তরবারী অনেক দুর্গে ইসলামের পতাকা উড্ডীন। করেছে। আমার এই তরবারী ইসলামের প্রহরী।
ইমরান নুরুদ্দীন জঙ্গীর সম্মুখে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে। জঙ্গীর হাত থেকে তরবারীটা নিয়ে তাতে চুমো খায়, চোখে লাগায়। তারপর অস্ত্রটা কোমরের সঙ্গে বেঁধে নেয়। আনন্দের অতিশয্যে কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে আসে ইমরানের। মুখ দিয়ে কথা আনতে পারছে না, দুচোখ বেয়ে ঝরঝর করে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে তার।
আর তুমি নিজের মর্যাদা জেনে নাও দোস্ত!- জঙ্গী বললেন- একজন গুপ্তচর শত্রুর বিশাল বাহিনীকে যেমন পরাস্ত করতে সক্ষম, তেমনি একজন গাদ্দার পারে নিজের জাতিকে পরাজয়ের গ্লানির মুখে ঠেলে দিতে। তুমি দুশমনকে পরাজিত করে ফেলেছ ইমরান। তুমি যে সংবাদ নিয়ে এসেছ, তা দুশমনের পরাজয়েরই সংবাদ। খৃস্টানরা মিসর-ফিলিস্তিনের কূলে ভিড়তে পারবে না ইনশাআল্লাহ। তাদের নৌ-বহর ফিরে যেতে পারবে না। এই বিজয় তোমার। এর উপযুক্ত প্রতিদান তোমাকে আল্লাহ প্রদান করবেন।
