অত্যন্ত আবেগময় ভাষায় ও হৃদয়কাড়া ভঙ্গিতে কথাগুলো বলল রহীম। আইলসনের মুখ বন্ধ হয়ে যায়। এতকিছুর মাঝেও তার হৃদয়ে রহীমের ভালবাসা বিদ্যমান। তার চোখে চোখ রেখে ধীর অথচ হৃদয়গ্রাহী রহীমের কথাগুলো তার মন ছুঁয়ে যায়। আবেগপ্রবণ হয়ে উঠে রূপসী তরুণী আইলসন। তার দুচোখে পানি এসে যায়। তারপর অস্থিরতার সাথে রহীমের হাত দুটো চেপে ধরে এবং কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলে, তোমার প্রতি আমার কোন ঘৃণা নেই আইলীমোর। তুমি তোমার কর্তব্য ভুলে গিয়েছিলে, আমি ভুলিনি। আমি অপরাধী- আমি তোমাকে ধরিয়ে দিয়েছি। এই পাপের কঠিন শাস্তি আমাকে ভোগ করতে হবে। কয়েক দিনের মধ্যেই আমাকে মদ্যপ ঐ বৃদ্ধ কমান্ডারের হাতে তুলে দেয়া হবে। আমাকে আর তিরস্কার কর না আইলীমোর।
আমি আইলীমোর নই- আমি রহীম। রহীম বলল- আমি রহীম আবদুর রহীম- আমি দয়াময়ের গোলাম।
***
রাতের বেলা। গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন ইসলামী দুনিয়া। কিন্তু একদল মানুষ শত্রুর পরিবেশিত মদ আর নারী নিয়ে পড়ে আছে মাতালের ন্যায়। এরা মিল্লাতে ইসলামিয়ার গাদ্দার। অপরদিকে তাদের থেকে দূরে-বহুদূরে একজন মুসলমান ইহলীলা সাঙ্গ করছে ইসলামের জন্য গুপ্তচরবৃত্তি করতে গিয়ে। দুজন জান বাজি রেখে জাতির জন্য মূল্যবান উপহার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিয়ে আক্রা থেকে বেরিয়ে কায়রো পৌঁছার প্রাণপণ চেষ্টা করছে। এ এমন এক তথ্য, মিসরের ইজ্জত ও ইসলামের আব্রু নির্ভর করছে তার উপর। তাদের দৃষ্টিতে এই ভেদ আল্লাহর আমানত। তারা এখানে নিজ দায়িত্ব পালন করছে, নাকি আয়েশ করে ফিরছে, তা দেখবার মত কেউ নেই। কিন্তু তাদের বিশ্বাস, আল্লাহ তাদেরকে দেখচ্ছেন এবং তারা আল্লাহর নির্দেশ পালন করছে।
রহীম মুক্ত হয়ে আসতে পারবে কি পারবে না, রেজা আসবে কি আসবে না?- এই ভাবনায় ব্যাকুল হয়ে পড়েছে ইমরান। কী করবে সে? ওদের অপেক্ষা করবে, নাকি এক্ষুণি চলে যাবে? কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, যে ইসলামী দুনিয়ার জন্য অতিশয় মূল্যবান তথ্য সংগ্রহ করলাম, তা কি কায়রো পর্যন্ত পৌঁছাতে পারব? মাথাটা চক্কর দিয়ে ওঠে ইমরানের।
ইমরান আরো একটি কারণে শীঘ্র কায়রো কিংবা অন্তত কার্ক গিয়ে পৌঁছতে চায়। পাছে সুলতান আইউবী কিংবা নুরুদ্দীন জঙ্গী বা উভয়ে অন্য কোনদিকে আক্রমণ বা অগ্রযাত্রার পরিকল্পনা নিয়ে না ফেলেন। যদি এমনটা হয়ে যায়, তাহলে তাদেরকে বিরত রাখতে হবে। তাদের ফৌজ যদি অন্য কোন দিকে বেরিয়ে গিয়ে থাকে, তাহলে মিসরের মোহাফেজ তো আল্লাহ ছাড়া কেউ নেই। এসব ভাবনা ইমরানকে এমনভাবে বিচলিত করে তোলে যে, কোন দিশা না পেয়ে সে কক্ষের দরজা বন্ধ করে নামাযে দাঁড়িয়ে যায়।
ইমরান নফল নামায পড়ছে। সুপ্ত নগরীর নীরবতা ভেদ করে কোন একটা তৎপরতার শব্দ তার কানে ভেসে আসে। কারো ছুটে চলার আওয়াজও শোনা যায়। তাতে ইমরানের ব্যাকুলতা আরো বেড়ে যায়। দুচার রাকাত নামায আদায় করে ইমরান মহান আল্লাহর দরবারে হাত তুলে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে ইমরান দোয়া করে, হে আল্লাহ! দায়িত্ব পালন করা পর্যন্ত তুমি আমাকে বাঁচিয়ে রাখ। আমাকে তুমি এই আমানতটা যথাস্থানে পৌঁছিয়ে দেয়ার সুযোগ দাও, এরপর তোমার ইচ্ছা হলে আমাকে আমার বংশসহ নিয়ে নিও।
ইমরানের কক্ষের বন্ধ দরজায় করাঘাত পড়ে। ইমরান দরজা খুলে দেয়। বাইরে রেজা দণ্ডায়মান। রেজা ভেতরে ঢুকতেই ইমরান তাড়াতাড়ি দরজার ছিটকিনি লাগিয়ে দেয়।
রেজা হাঁপাচ্ছে। ইমরানকে ঘটনার বিবরণ দিয়ে জানায়, রহীম শহীদ হয়ে গেছে। সেই সাথে মারা গেছে একটি মেয়েও। রহীমের লাশটা এলাকার এক মুসলিম পরিবারের ঘরে রেখে এসেছে। সেই ঘরেরই কোন স্থানে তাকে দাফন করার কথা।
ইমরানের অস্থিরতা আরো বেড়ে যায়। চিন্তা তার রহীমকে নিয়ে নয়, দ্বীনের জন্য জীবন দেয়া-নেয়াই তো তাদের কাজ। ইমরান ভাবে, রহীমের জন্য এই মুসলিম পরিবারটা আবার বিপদে পড়ে না যায়। রেজা জানায়, সে ঘরে তিনজন পুরুষ আছে, অন্যরা মহিলা। তারা সঙ্গে সঙ্গে ঘরে এক কোণে মাটি খনন শুরু করে দিয়েছে। তারা বেশ সতর্ক। কোন সমস্যা হবে ইনশাআল্লাহ।
আক্রা থেকে বের হওয়া এই মুহূর্তে কঠিন ব্যাপার। সমস্ত শহর সীল করে দিয়েছে খৃস্টানরা। একটি খৃস্টান মেয়ের নিহত হওয়া এবং একটি শত্রু গোয়েন্দার পলায়ন মামুলি ব্যাপার নয়। বের হতে হবে রাতে। দুজন একত্রে বের হওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। সিদ্ধান্ত হয়, দুজনের কেউ ধরা পড়লে আর যা হোক এ তথ্য দেয়া যাবে না যে, রহীম মারা গেছে এবং তার লাশ অমুক জায়গায় আছে।
এখন প্রয়োজন শুরু ঘোড়ার। একস্থানে খৃস্টানদের আটটি ঘোড়া বাঁধা আছে। ইমরান রেজাকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। কিন্তু দূর থেকে দেখা গেল, এক প্রহরী টহল দিয়ে বেড়াচ্ছে। রেজাকে একস্থান লুকিয়ে রেখে ইমরান এগিয়ে যায়। চলে যায় সান্ত্রীর নিকটে। জিজ্ঞেস করে, কি ব্যাপার, আজ পাহারা কেন? সান্ত্রী ইমরানকে ভাল করেই চেনে। চেনে জনগন্থর নামে। বড় পাদ্রীর খাস খাদেম হিসেবে তাকে বেশ শ্রদ্ধাও করে। সে বলে, একজন মুসলমান গোয়েন্দা ধরা পড়েছিল। আজ সে একটি মেয়েকে খুন করে পালিয়ে গেছে। সে জন্য। নির্দেশ এসেছে সাবধান থাকতে।
