আইলসনের হৃদয়েও ধর্মপ্রীতি জেগে ওঠে এবং এই অনুরাগ মুসলমানের ভালবাসার উপর জয়ী হয়। রহীমের প্রতি ভালবাসার স্থলে সৃষ্টি হয় প্রবল ঘৃণা। আইলসন পেছনের সব ভুলে যায়। ভুলে যায় বৃদ্ধ অফিসারের সঙ্গে তার বিয়ে হওয়ার কথাও। তার ক্রুশের কর্তব্যের কথা স্মরণ এসে যায় যে, মুসলমানকে সর্বাবস্থায় শক্ৰজ্ঞান করবে এবং ইসলামের মূলোৎপাটনের জন্য কাজ করবে। বস্তুত আইলসন অত্যন্ত সাহসী ও বুদ্ধিমতী। সে রহীমকে বুঝতেই দেয়নি, ঘুমিয়ে পড়ার ভান করে সে পালিয়ে আসবে। রহীম ঘুমিয়ে পড়লে আইলসন সুযোগ বুঝে ঘোড় নিয়ে চলে আসে। আইলসনের পথঘাট জানা ছিল। সে আক্রা এসে পৌঁছে এবং পিতার কাছে তার অপরাধের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে রহীম সম্পর্কে অবহিত করে। তার পিতা তৎক্ষনাৎ এ খবর কমান্ডার ওয়েস্ট মেকাটকে ঘুম থেকে জাগিয়ে অবহিত করে। কমান্ডার তিনজন সিপাহী নিয়ে রহীমকে ধাওয়া করতে চলে যায়। রহীম পায়ে হেঁটে কতটুকুই আর যেতে পেরেছে- সে ধরা পড়ে যায়। ফলে এখন সে আমাদের হাতে বন্দী।
রহীম কি জানে, আইলসন তাকে ধোকা দিয়েছে?
না, আমি এখন আইলসনকে কাজে লাগাতে চাই। রহীমকে আমরা উন্নত খাবার পরিবেশন করব।
***
চাকর-বাকর ও আম-জনতার মুখে একই কথা, একই আলোচনা একজন মুসলমান গোয়েন্দা ধরা পড়েছে। ফ্রান্সিস নামে রেজাও তাদের একজন। সেও অন্যদের ন্যায় ধৃত মুসলমান গোয়েন্দাকে নিয়ে নানারকম মন্তব্য এবং অভিমত ব্যক্ত করছে- লোকটিকে জনসমক্ষে ফাঁসিতে ঝুলান উচিত কিংবা ঘোড়ার পেছনে বেঁধে ঘোড়া হাঁকিয়ে মেরে ফেলা দরকার।
রেজা জানে, রহীম এখনও সেই কক্ষেই আছে। অনেকেই ভেবে পায় পায় না, গোয়েন্দাকে এখনো বন্দীশালায় নিক্ষেপ করা হচ্ছে না কেন! বন্দীশালার এক কর্মচারী জানায়, কয়েদীর জন্য অফিসারদের ন্যায় খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং অফিসার নিজেই খাবার পরিবেশন করছে। এ কথা শুনে সবাই বিস্মিত হয়ে পরস্পর মুখ চাওয়া-চাওয়ি শুরু করে দেয়। রেজা কথায় কথায় বাবুর্চিখানার কর্মচারীকে আলগ নিয়ে যায় এবং জিজ্ঞেস করে, তুমি কি ঠাট্টা করছ যে, মুসলমান গোয়েন্দাকে অফিসারদের মানের খাবার দেয়া হয়েছে! তাই যদি হয়, তাহলে তো লোকটা গোয়েন্দা নয়!
অত্যন্ত ভয়ংকর গোয়েন্দা কর্মচারী বলল- আমি তদন্তকারী অফিসারের কথা শুনেছি। খানা খাওয়ার পর আবার তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। তিনি একটি মেয়ে সম্পর্কে আলোচনা করছিলেন। মেয়েটি গোয়েন্দাকে ফাঁদে ফেলে কথা বের করবে।
রহীমের খাওয়া শেষ হলে আইলসন তার কক্ষে প্রবেশ করে। অফিসাররা চলে গিয়েছিল আগেই। তারা আইলসনকে ডেকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দেয় তাকে কী করতে হবে এবং কয়েদীকে কি কি জিজ্ঞেস করতে হবে। আইলসনকে দেখে রহীম চমকে উঠে- বিষয়টা স্বপ্নের মত মনে হয় তার কাছে।
তুমি?- বিস্মিত কণ্ঠে আইলসনের প্রতি দৃষ্টিপাত করে জিজ্ঞেস করে রহীম তোমাকেও কি গ্রেফতার করে এখানে নিয়ে আসা হয়েছে? তুমি কি বন্দী?
হা- আইলসন জবাব দেয়- গতরাত থেকে আমি বন্দী।
ওখান থেকে তুমি কিভাবে উধাও হয়েছিলে?- রহীম জিজ্ঞেস করে তুমি নিজে নিজে পালিয়ে এসেছ, আমার বিশ্বাস হচ্ছে না।
তা বটে- আইলসন বলল- আমার জীবন-মরণ তোমার সাথে সম্পৃক্ত। তোমাকে ছেড়ে আমি পালাতে পারি না। তুমি ঘুমিয়ে পড়েছিলে। আমার চোখে ঘুম আসছিল না। আমি উঠে পায়চারি করতে শুরু করি। হাঁটতে হাঁটতে কিছুটা দূরে চলে যাই। হঠাৎ পেছন থেকে কে একজন আমার মুখ চেপে ধরে এবং আমাকে ঘোড়ার পিঠে তুলে নেয়। তারা ছিল দুজন। একজন আমার ঘোড়া ছিনিয়ে নেয় এবং অপরজন আমার মুখ চেপে রাখে, যার ফলে আমার আর্তচিৎকার তুমি শুনতে পাওনি। তারা আমাকে এখানে নিয়ে আসে।
তাদেরকে কে বলল যে, আমার নাম রহীম- আইলীমোর নয়?- রহীম জিজ্ঞেস করে- আর যারা তোমাকে ধরে নিয়ে আসল, তারা আমাকে ধরল না কেন? আমাকে কেন হত্যা করল না?
আমি তোমার এসব প্রশ্নের জবাব দিতে পারব না- আইলসন বলল আমি নিজেই আসামী।
তুমি মিথ্যা বলছ আইলসন।- রহীম বলল- তারা ভয় দেখিয়ে তোমাকে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিল আর তুমি ভয়ে বলে দিয়েছে আমি কে। তোমার প্রতি আমার কোন অভিযোগ নেই। তোমার কোন কষ্ট হোক আমি তা সহ্য করতে পারব না।
আমার কোন কষ্ট না হোক, তা-ই যদি তোমার কাম্য হয়, তাহলে তারা তোমাকে যা যা জিজ্ঞেস করছে, সব বলে দাও- আইলসন বলল- তারা আমার সঙ্গে ওয়াদা করেছে, তোমাকে তারা ছেড়ে দেবে।
কথা শেষ কর আইলসন- তাচ্ছিল্যের সাথে রহীম বলল- এ কথাও বল, আমি সব বলে দিলে তারা আমাকে মুক্ত করে দেবে আর তুমি আমাকে বিয়ে করে নেবে।
হ্যাঁ, বিয়ে তো হবেই- আইলসন বলল- শর্ত হল, তোমাকে খৃস্টধর্ম গ্রহণ করতে হবে।
তুমি কি এই আশা নিয়ে এসেছ যে, মুক্তির খাতিরে আমি আমার ধর্ম ত্যাগ করব?- রহীম বলল- আইলসন! আমি ফৌজের সাধারণ সৈনিক নই আমি একজন গোয়েন্দা। আমার বিবেক আছে। আমি ক্ষণিকের জন্য বিবেকের উপর তোমার প্রেম-ভালবাসাকে প্রাধান্য দিয়েছিলাম। এখন আমি আমার সেই পাপেরই শাস্তি ভোগ করছি। তুমি মিথ্যা বলছ। যে ক্রুশের নামে শপথ করেছ, তা-ই গলায় ঝুলিয়ে তুমি মিথ্যে কথা বলছ। ওখান থেকে তুমি নিজে পালিয়ে এসেছ, কথাটা কি মিথ্যে? তোমার হৃদয় মুসলমানদের ঘৃণায় পরিপূর্ণ। আমার আসল পরিচয় পেয়ে তুমি আমার প্রতি আর আস্থা রাখতে পারনি। আমাকে নিদ্রায় রেখে তুমি নিজে সম্পূর্ণ নিজ উদ্যোগে পালিয়ে এসেছ। এসে তুমি তোমার বুড়ো পাণিপ্রার্থীকে আমার পেছনে লেলিয়ে দিয়েছ। বল, বল আইলসন আমি কি মিথ্যা বলছি? বল, ঘটনাটি কি এরকম-ই নয়? আমার অন্তরেও তোমার জাতির প্রতি ঘৃণা আছে। তোমার জাতিকে আমি আমার শত্রু ভাবি। আমার জীবনটা আমি তোমার জাতির ধ্বংস-সাধনে কুরুবান করেছি। কিন্তু আমার হৃদয়ে তোমার ভালবাসা অক্ষুণ্ণ থাকবে আইলসন। তার প্রতি কখনো আমার ঘৃণা জন্মাবে না। তোমার খাতিরে কর্তব্য ভুলে গিয়ে আমি আমার ভবিষ্যৎ ধ্বংস করেছি। কিন্তু তুমি তুমি নাগিনীর ন্যায় আমাকে দংশন করছ। আর এটাই তোমার ধর্ম- এটাই তোমাদের চরিত্র।
