ঘোড়ার ব্যবস্থা করা ইমরানের জন্য সহজ ছিল না। কারণ, তাকে পাদ্রীর দেহরক্ষীদের ঘোড়া চুরি করতে হবে। আর এটা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ কাজ।
রহীমকে তখনো বন্দীশালায় নিক্ষেপ করা হয়নি। ইন্টেলিজেন্স হিংস্র প্রকৃতির দুজন অফিসারের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে তাকে। কারণ, গোয়েন্দা ধরা পড়লে প্রথমে তার থেকে তথ্য আদায় করা হয়। তারপর চলে অকথ্য নির্যাতন। যেহেতু গোয়েন্দারা একাধিক লোক থাকে, তাই অন্য সহযোগীদের খুঁজে বের করার জন্য স্বীকারোক্তি আদায় করা হয় যে, তার অন্য সাথীরা কোথায়? এখানে এসে সে কি কি তথ্য সগ্রহ করেছে ইত্যাদি।
রহীমকেও উপরোক্ত প্রশ্নগুলো করা হয়। রহীম জবাব দেয়, এখানে আমি একা। আমার কাছে কোন তথ্য নেই। ব্যবসায়ীর কন্যা আইলসনের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে সে বলে, আমরা পরস্পর ভালবাসতাম। একজন বৃদ্ধ অফিসারের সাথে আইলসনকে জোর করে বিবাহ দিতে চাওয়ায় আমরা দুজনে পালাতে বাধ্য হয়েছিলাম।
জান, তুমি কিভাবে ধরা পড়েছ?
না- রহীম জবাব দেয়। আমি এতটুকুই জানি যে, আমি ধরা পড়েছি।
তুমি আরো অনেক কিছু জান- এক অফিসার বলল- যা যা জান, সব বলে দাও, আমরা তোমাকে কোন কষ্ট দেব না।
আমি শুধু এতটুকুই জানি যে, আমি আমার কর্তব্য ভুলে গেছি- রহীম বলল- এই অপরাধের শাস্তি আমি সন্তুষ্টচিত্তে বরণ করে নেব।
তোমার হৃদয়ে এখনো কি আইলসনের ভালবাসা আছে?
আছে- রহীমের সোজা উত্তর- এবং চিরকাল থাকবে। আমি তাকে কায়রো নিয়ে যাচ্ছিলাম। মুসলমান বানিয়ে তাকে বিয়ে করার কথা ছিল।
আমি যদি বলি, মেয়েটা তোমার সাথে প্রতারণা করেছে, তাহলে কি তুমি বিশ্বাস করবে?
না- রহীম বলল- যে মেয়ে আমার জন্য নিজের বাড়ি-ঘর, পিতা-মাতা, স্বজন ত্যাগ করেছিল, সে প্রতারক হতে পারে না। অন্য কেউ তার সঙ্গে প্রতারণা করে থাকবে হয়ত।
আচ্ছা, আমরা যদি আইলসনকে তোমার হাতে তুলে দেই, তাহলে কি বলবে, তোমার কজন সঙ্গী আছে এবং তারা কোথায় আছে? তুমি এখান থেকে কি কি তথ্য সংগ্রহ করেছ?
রহীমের মস্তক অবনত হয়ে যায়। সে অবস্থায় কেটে যায় কিছু সময়। এক অফিসার যখন তার মাথাটা ধরে উপরে তোলে, তখন তার দুচোখ বেয়ে অশ্রু ঝরছে। অফিসারদের বারবার প্রশ্ন করার পরও রহীম নির্বাক। অফিসার ভাবল, ছেলেটির ভেতরটায় হ্যাঁ এবং না-এর দ্বন্দ্বে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারছে না। তবে তার ভাব-গতিতে বুঝা যাচ্ছে, আইলসনের প্রতি তার ভালবাসা এখনো প্রগাঢ় এবং এ প্রেম তার হৃদয়ের অনেক গভীরে প্রোথিত।
দেখ, সময় নষ্ট করে লাভ নেই, সব প্রশ্নের উত্তর তোমাকে দিতেই হবে এক অফিসার বলল- কিন্তু ততক্ষণ পর্যন্ত তোমার হাড়গোড় সব গুড়ো হয়ে যাবে। তখন তুমি না বেঁচে থাকবে, না মরতে পারবে। উত্তরটা যদি আগেভাগেই দিয়ে দাও, তাহলে আইলসনকেও পাবে আর শাস্তি থেকেও রক্ষা পাবে। এটা বন্দীশালা নয়- এক অফিসারের কক্ষ। তুমি যদি চিন্তা করার সময় চাও, তাহলে হয়ত এই রাতটুকু তোমাকে সময় দেয়া যেতে পারে।
রহীম কোন কথাই বলছে না। মুখ তুলে শুধু প্রত্যেক অফিসারের দিকে এক নজর করে তাকায়। অফিসারদের এমন কোন আশংকা নেই যে, রহীম এই কক্ষ থেকে পালিয়ে যেতে পারবে। সামরিক এলাকা, বারান্দায় পাহারা আছে, আছে টহল প্রহরাও। কক্ষ থেকে বের হতে পারলেও পালিয়ে যাবার সুযোগ নেই। এক অফিসার আরেক অফিসরকে লক্ষ্য করে বলল, তোমরা অহেতুক সময় নষ্ট করছ, ওকে পাতাল কক্ষে নিয়ে চল। লোহার উত্তপ্ত শলাকার ছ্যাকা দাও, দেখবে কথা কিভাবে বের হয়। এরপরও যদি মুখ না খুলে, তাহলে পানাহার বন্ধ করে ফেলে রাখ।
আমার অভিজ্ঞতা ভিন্ন!- দ্বিতীয় অফিসার বলল- এ কথা ভুলে যেও না, লোকটা মুসলমান। এ যাবত তোমরা কজন শত্রু গোয়েন্দার নিকট থেকে তথ্য উদ্ধার করতে পেরেছ? তোমরা হয়ত জান না- এরা জীবন দিতে রাজী, মুখ খুলতে রাজী নায়। তুমি লক্ষ্য করেছ কিনা, লোকটা বলেছিল, সে সমস্ত নির্যাতন-নিপীড়ন তার পাপের শাস্তি মনে করে বরণ করে নেবে? লোকটাকে কট্টর মুসলমান বলে মনে হচ্ছে। দেখবে, পাতাল কক্ষে নিলেও সে বলবে, আমি কিছু জানি না। আমাদের উদ্দেশ্য তো ওকে প্রাণে মেরে ফেলা নয়; আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে, যে কোন প্রকারেই তথ্য সংগ্রহ করা এবং তার অন্য সঙ্গীদের ঠিকানা নেয়া। আর এ কথা জানা যে, আমরা মিসর আক্রমণের যে পরিকল্পনা নিয়েছি, তা ওরা জেনে ফেলেছে কিনা।
এ তথ্য জানা ওর বাপেরও সাধ্য নেই- দ্বিতীয় অফিসার বলল আমাদের হাইকমান্ডের অফিসারদের ব্যতীত আর কেউ এই পরিকল্পনা সম্পর্কে জানে না। তাছাড়া লোকটি ব্যবসায়ীর মেয়ের প্রেমেই ডুবে ছিল। দুনিয়ার কোন খবরই ওর ছিল না। ও তো এটাও জানে না যে, আইলসনই ওকে ধরিয়ে দিয়েছে। লোকটা এখনও আইলসনে প্রেম সরোবরে হাবুডুবু খাচ্ছে।
আমি আইলসনকেই ব্যবহার করতে চাই- এক অফিসার বলল লোকটাকে আজ রাতটা এই কক্ষেই থাকতে দেব। আমি আশা করি, দিনের পর দিন পরিশ্রম করেও আমরা যে তথ্য উদ্ঘাটন করতে পারব না, আইলসনের ন্যায় রূপসী মেয়ে তার থেকে কয়েক মিনিটেই বের করে ফেলতে পারবে।
কিন্তু মেয়েটার উপর কি ভরসা রাখা যায়?
তোমাদের কি এখনো সন্দেহ আছে? দ্বিতীয় অফিসার বলল- তুমি বোধ হয় পুরো ঘটনা শোননি। আইলসন ফিরে এসে ঘটনার যে বিবরণ দিয়েছে, তা সম্পূর্ণ তুমি শোননি। এখন জিজ্ঞাসাবাদের দায়িত্ব যেহেতু আমাদের দুজনের উপর, সেজন্য পুরো ঘটনা তোমার জানা থাকা দরকার। আইলসন লোকটাকে মনে-প্রাণে ভালবাসত। কিন্তু আসল পরিচয়টা তার জানা ছিল না। আইলসন জানত, লোকটা খৃস্টান, নাম আইলীমোর। আইলসনকে তার পিতা কামান্ডার ওয়েস্ট মেকাটের সঙ্গে বিয়ে দিতে চেয়েছিল। মূলত ঘুষ হিসাবেই মেয়েটাকে তার হাতে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এক পর্যায়ে মেয়েটা এই গোয়েন্দার হাত ধরে পালিয়ে যায়। পথে কথায় কথায় সে আইলসনের কাছে নিজের আসল পরিচয় প্রকাশ করে দেয়। সে অকপটে বলে দেয়, আমি খৃস্টান নই- মুসলমান। নাম আইনীমোর নয় রহীম হারা এবং সে গোয়েন্দা। আইলসনের হৃদয়ে মুসলমান নামের প্রতি কি পরিমাণ ভীতি ও ঘৃণা শৈশব থেকেই বদ্ধমূল হয়ে আছে, তা লোকটি জানত না। জানত না মেয়েটা কত ধার্মিক খৃস্টান। শেষ পর্যন্ত আইলসন নিশ্চিত হয় যে, এই মুসলমানটা তাকে ধোকা দিয়েছে এবং কায়রো নিয়ে গিয়ে তাকে নষ্ট করবে। হয়ত কারো কাছে তাকে বিক্রি করে ফেলবে। আমরা আমাদের শিশুদের মন-মস্তিষ্কে মুসলমান সম্পর্কে যে ঘৃণা সৃষ্টি করে রেখেছি, তা যে কোন খৃস্টান ছেলে-মেয়ে-ই মনে রাখবে।
