রহীমকে গ্রেফতার করা হল। হাত দুটো পিঠমোড়া করে বেঁধে লাশের ন্যায় তুলে নেয়া হল একটি ঘোড়ার পিঠে। আক্রা অভিমুখে ছুটে চলে ঘোড়া।
ঠিক এ সময় রহীমের সঙ্গে দেখা করতে যায় ইমরান। না পেয়ে রহীমের মালিকের এক কর্মচারীকে জিজ্ঞেস করে। কর্মচারী জানায়, তাকে চাকুরী থেকে তাড়িয়ে দেয়া হয়েছে।
ইমরান ভাবনায় পড়ে যায়। কী হল? রহীম গেলই বা কোথায়? এখান থেকে বিতাড়িত হয়ে আমার কাছে গেল না কেন? রেজার নিকটও তো যেতে পারত। কোন প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজে পায় না সে।
ইমরান গির্জায় ফিরে যায়। রহীমকে খুঁজে বের করতে হবে। তার মনে এই শংকাও জাগে, রহীম গ্রেফতার হল কিনা। তবে তো আমাদের ব্যাপারেও তথ্য দিয়ে ফেলবে। এতক্ষণ বলে ফেলেছেও হয়ত। ধরা পড়া কিংবা মারা যাওয়া চিন্তার বিষয় নয়- চিন্তা হল তারা যে তথ্য সংগ্রহ করতে এসেছিল এবং সগ্রহ করেছে, তা নিয়ে এখান থেকে বের হতে হবে।
সূর্য অস্ত যেতে এখনো বেশ দেরী। রেজা আস্তাবলের বাইরে একস্থানে দাঁড়িয়ে আছে। চারটি ঘোড়া আস্তাবলের গেটে এসে দাঁড়িয়ে যায়। এক আরোহী তার আসনের সম্মুখ থেকে লাশের ন্যায় কি একটা নীচে নামায়। দেখে রেজার গায়ের রক্ত শুকিয়ে যায়। এ তো রহীম! হাত দুটো পিঠমোড়া করে বাঁধা। আরোহীদের মধ্যে বড় এক অফিসারও রয়েছে। রেজা ভালভাবেই চিনে তাকে। অন্যরাও তার অচেনা নয়।
আরোহীরা রহীমকে নিয়ে যেতে উদ্যত হয়। এমন সময় রেজার প্রতি দৃষ্টি পড়ে অফিসারের। অফিসার রেজাকে ডাক দেয়, ফ্রান্সিস! রেজা ছুটে আসে। কিন্তু তার পা উঠছে না যেন। সে নিশ্চিত বুঝে ফেলে, আমিও ধরা পড়ে যাচ্ছি। ভীতপদে অফিসারের কাছে দাঁড়ায় রেজা- জ্বী স্যার।
এই ঘোড়াগুলোকে ভেতরে নিয়ে যাও- অফিসার শান্ত কণ্ঠে রেজাকে বলল- নিয়ে আমাদের সহিসদের হাতে বুঝিয়ে দাও। অফিসার রহীম সম্পর্কে নির্দেশ দেয়, ওকে ঐ কামরায় নিয়ে যাও।
ফ্রান্সিস নামে ডাকায় রেজার হালে পানি আসে যে, তাহলে রহীম আমার কথা বলেনি। রেজা এক অফিসারকে জিজ্ঞেস করে, ও কে? চুরি-টুরি করেছে বোধ হয়?
বেটা সালাহুদ্দীন আইউবীর গুপ্তচর- এক সৈনিক জবাব দেয় এবং তাচ্ছিল্যভরে বলে- এবার লোকটা পাতালের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে গোয়েন্দাগিরি করবে; তুমি যাও, ঘোড়াগুলো রেখে আস।
এ সময়ের মধ্যে কোন এক সুযোগে রেজা ও রহীমের চোখাচোখি হয়ে যায়। রহীম রেজাকে চোখের সাংকেতিক ভাষায় বলে দেয়, তোমার কোন ভয় নেই। রেজা নিশ্চিন্ত হয়ে যায়। তথাপি একজনের ধরা পড়া তো কোন প্রীতিকর ঘটনা নয়। রহীম ধরা পড়েছে। পরিণতি কী হবে, তা তো বলা যায় না। অন্য সঙ্গীদের ব্যাপারে রহীম এখনো কোন তথ্য দেয়নি, দেয়ার পর্যায় এখনো আসেনি। জিজ্ঞাসাবাদের পর দেখা যাবে কি হয়! তাছাড়া রহীমকে জীবন দিতেই হবে। মরতে হবে খৃস্টানদের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে ধুকে ধুকে।
রহীমকে কোন্ কক্ষে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, তা জানে রেজা। তারপর সেখান থেকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হবে, তাও তার জানা।
***
ইমরান গির্জা সংলগ্ন নিজ কক্ষে অস্থির মনে বসে বসে ভাবছে, রহীম কোথায় উধাও হয়ে গেল। কক্ষের দরজা খোলা। হঠাৎ শাঁ করে ভেতরে ঢুকেই দরজাটা বন্ধ করে দেয় এক ব্যক্তি। লোকটা রেজা। কোন ভূমিকা ছাড়াই ভয়জড়িত কণ্ঠে হাঁফাতে হাঁফাতে ফিসফিস করে বলে, রহীম ধরা পড়ে গেছে।
নিজে যা দেখেছে, ইমরানকে অবহিত করে রেজা। এ-ও জানায়, রেজা ইংগিতে বলে দিয়েছে, আমাদের কথা সে কিছু বলেনি।
এখনো বলেনি। ইন্টারোগেশন সেলে গিয়ে সব-ই বলে দিবে- ইমরান বলল- ও জায়গায় মুখ বন্ধ রাখা সহজ নয়।
ইমরান ও রেজা এখন কী করবে? এক্ষুণি বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবে, নাকি আরো এক-দুদিন অপেক্ষা করবে?
এমনি স্পর্শকাতর মুহূর্তে একটি ভুল করে ফেলে তারা। তারা আবেগের কাছে পরাজিত হয়ে যায়। কমান্ডো এবং গোয়েন্দাদের জন্য নির্দেশ হল, যে কোন পরিস্থিতিতে ধৈর্য ও সাহসিকতা বজায় রেখে ঠাণ্ডা মাথায় কাজ করতে হবে। তাড়াহুড়া ও আবেগ পরিহার করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কোন সহকর্মী যদি কোথাও এমনভাবে ফেঁসে যায় যে, তাকে উদ্ধার করতে গেলে নিজেদেরকেও ফেঁসে যাওয়ার আশংকা আছে, তাহলে তাকে সাহায্য করার প্রয়োজন নেই। কিন্তু রহীমের ঘটনায় আবেগপ্রবণ হয়ে যায় রেজা। বলল, আমি রহীমের ন্যায় সুদর্শন ও সাহসী বন্ধুকে বন্দীদশা থেকে মুক্ত করে আনার চেষ্টা করব।
সম্ভব হবে না। ইমরান বলল। সে রেজাকে এই ঝুঁকিপূর্ণ প্রত্যয় থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করে।
শোন ইমরান! রহীমকে যেখানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, আমি সেখানেই থাকি। কাজেই ওকে সেখান থেকে বের করে আনা সম্ভব কিনা দেখতে তো পারি- রেজা বলল- সেখানকার প্রত্যেকের সঙ্গে আমার এতটুকু বন্ধুত্ব আছে যে, আমি তথ্য নিতে পারব, রহীম কোথায় আছে। যদি আমি তার পর্যন্ত পৌঁছে যেতে পারি, তাহলে নিশ্চিত রহীম মুক্তি পেয়ে যাবে। অন্যথায় এর বেশী আর কী হবে, আমিও না হয় তার পথের পথিক হয়ে গেলাম! এমতাবস্থায় আমি যদি ধরা খেয়ে যাই, তাহলে তুমি চলে যেও। তথ্য তো সব তোমার কাছে। আমি রহীমকে রেখে যেতে পারব না।
রহীমকে মুক্ত করে আনা যদিও রেজার পক্ষে সম্ভব ছিল না; কিন্তু রেজার আবেগপ্রবণতায় ইমরানও সম্মত হয় এবং বাস্তবতাকে ভুলে যায়। রেজা ইমরানকে এই বলে ফিরে যায়, সে রাতে খোঁজ নিয়ে জানবে রহীমকে মুক্ত করার কোন সুযোগ আছে কিনা। যদি কোন সুযোগ বের করতে না পারে, তাহলে তারা রাতের মধ্যে চলে যাবে। ইমরানের দায়িত্ব ঘোড়ার ব্যবস্থা করা।
