মিসর ও মুসলমান নাম শুনে আইলসন সত্যি সত্যিই ভয় পেয়ে যায়। সে রহীমের আরো কাছে এসে বসে। বলে, তুমি আমাকে বাইতুল মোকাদ্দাস নিয়ে চল। ওখানে গিয়ে আমরা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হব। কোন্দিকে বাইতুল মোকাদ্দাস? আমি দিকটা ভুলে গেছি।
আমি মিসরের দিকে যাচ্ছি। রহীম বলল।
আইলসন বিগড়ে যায় এবং কাঁদতে শুরু করে।
তুমি কি মুসলমানদেরকে ঘৃণা কর? জিজ্ঞেস করে রহীম।
অনেক। জবাব দেয় আইলসন।
আর আমাকে কি ভালবাস?
অনেক। উত্তর দেয় আইলসন।
যদি বলি, আমি মুসলমান, তাহলে তুমি কি করবে?
আমি হাসব- আইলসন জবাব দেয়- তোমার রসিকতা আমার কাছে বেশ ভাল লাগছে।
আমি রসিকতা করছি না আইলসন।- গম্ভীর কণ্ঠে রহীম বলল- আমি সত্যি সত্যিই বলছি, আমি মুসলমান। তোমার ভালবাসাই আমাকে এত ত্যাগ স্বীকার করতে বাধ্য করেছে! আমি সন্তুষ্টচিত্তেই তোমার জন্য এই কুরবানী বরণ করে নিয়েছি।
কিরূপ কুরবানী? আইলসন জিজ্ঞেস করে- তুমি তো পূর্ব থেকেই আশ্রয়হীন; এখন না আমরা ঘর বাঁধব, সংসার করব!—
না, আইলসন!- রহীম বলল- আমি এখন আশ্রয়হীন হয়েছি। তুমি নিজের ঘর থেকে পালিয়েছ। আমাকে বিবাহ করে নতুন করে সংসার করবে। কিন্তু আমার আর কোন ঠিকানা হবে না। আমি কর্তব্য থেকে পালিয়ে আসা মানুষ, আমি আমার বাহিনীর দলত্যাগী সৈনিক। আমি গোয়েন্দা। আক্রায় গোয়েন্দাগিরি করতে এসেছিলাম। কিন্তু তোমার প্রেমের বেদীতে বলি দিয়েছি আমার সব দায়িত্ব-কর্তব্য।
তুমি আমাকে ভয় দেখাচ্ছ- মুখে হাসি টেনে আইলসন বলল- চল, শুয়ে পড়ি; রাত পোহাবার আগেই আমি তোমাকে জাগিয়ে তুলব।
আমি তোমাকে ভয় দেখাচ্ছি না আইলসন। বলল রহীম- আমার নাম রহীম হাঙ্গুরা। আইলসন! আমি তোমাকে ধোঁকার মধ্যে ফেলে রাখতে চাই না। তোমাকে আমি নিশ্চয়তা দিচ্ছি যে, আমি তোমাকে যেখানেই রাখব, শান্তিতে রাখব। আমি তোমাকে তোমার পিতার ঘরের রাজত্ব দিতে পারব না ঠিক, তবে তোমাকে আমি কষ্ট পেতে দেব না। তোমার জীবন শান্তিতেই কাটবে।
আমাকে কি মুসলমান হতে হবে? জিজ্ঞেস করে আইলসন।
তাতে অসুবিধা কি? রহীম জবাব দেয়- তুমি ওসব ভেব না। শুয়ে পড়। আমাদের সফর অনেক দীর্ঘ। সামনে কথা বলার প্রচুর সময় পাব।
রহীম শুয়ে পড়ে। শুয়ে পড়ে আইলসনও। কিছুক্ষণের মধ্যেই আইলসন রহীমের নাক ডাকার শব্দ শুনতে পায়। আইলসনের চোখে ঘুম আসছে না। গভীর চিন্তায় হারিয়ে যায় সে।
***
রহীমের যখন ঘুম ভাঙ্গে, তখন ভোর হয়ে গেছে। সজাগ হওয়া মাত্র ধড়মড় করে উঠে বসে। এতক্ষণ পর্যন্ত তার ঘুমানো ঠিক হয়নি, কথাও এমন ছিল না। চোখ খুলে এদিক-ওদিক তাকায় রহীম। কিন্তু একি! ঘোড়াও নেই, আইলসনও নেই।
রহীম বসা থেকে উঠে দাঁড়ায়। আশপাশে ঘুরে একটি টিলার উপর দাঁড়িয়ে দূরপথে দৃষ্টিপাত করে। বিরান মরুভূমি ছাড়া আর কিছুই তার চোখে পড়ছে না। আইলসনের নাম ধরে সজোরে ডাক দেয় রহীম। কোন জবাব নেই। একঝাঁক চিন্তা এসে চেপে ধরে রহীমকে। ভাবনার সাগরে তলিয়ে যায় সে।
রহীমের মনে সন্দেহ জাগে, হয়ত কেউ পশ্চাতে তাদের ধাওয়া করেছিল। এসে আইনসনকে ঘুমন্ত অবস্থায় তুলে নিয়ে গেছে। কিন্তু তা-ই যদি হবে, তাহলে রহীমকে জীবিত রেখে যাওয়ার কথা নয়। কেউ আসলে তো তাকে হত্যা করে ফেলত কিংবা অপহরণের দায়ে গ্রেফতার করে নিয়ে যেত। আইলসনকে তারা এত সঙ্গোপনে তুলে নিয়ে যাবে, অথচ সে টের পাবে না এটা তার কাছে বিস্ময়কর ঠেকে! আবার এও হতে পারে যে, আইলসন নিজেই পালিয়ে গেছে। মুসলমান পরিচয় দেয়ার কারণে মেয়েটি হয়ত তাকে ত্যাগ করে চলে গেছে।
আইলসনকে কেউ তুলে নিয়ে যাক কিংবা সে নিজেই চলে যাক, একটি প্রশ্ন রহীমকে অস্থির করে তুলেছে যে, এখন সে যাবে কোথায়? আক্রা ফিরে যাওয়া তো আশংকামুক্ত নয়। কায়রো গেলেও ভয়। কারণ, রহীম তার কর্তব্য থেকে পালিয়ে এসেছে। কমান্ডার ইমরানকে তো আর বলে আসেনি যে, সে চলে যাচ্ছে। ভাবতে ভাবতে একটি অজুহাত ঠিক করে নেই রহীম। সিদ্ধান্ত নেয়, এখন সে কায়রোর পরিবর্তে কার্কে চলে যাবে। গিয়ে বলবে, ওখানকার খৃস্টানরা টের পেয়ে গেছে যে, আমি মুসলমান এবং গুপ্তচর। তাই অনেক কষ্টে সেখান থেকে পালিয়ে এসেছি। ইমরান বা রেজাকে সংবাদ বলে আসার সুযোগও পাইনি। বেশ চমৎকার বাহানা। রহীম নিশ্চিত, এই কাহিনী বিবৃত করলে কেউ বলবে না যে, প্রমাণ দাও, সাক্ষী আন।
রহীম কয়েক ঢোক পানি পান করে কার্ক অভিমুখে রওনা হয়। আইলসনের উধাও হয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা তাকে অস্থির করে ফিরছে। যার জন্য সব ত্যাগ করা- দায়িত্ব, ঈমান, সহকর্মী সমস্ত- তাকে হারানোর বেদনা কম নয়। মেয়েটির কি হল, কোথায় গেল, জীবনে হয়ত আর তা জানাই হবে না- এই অনুতাপে পুড়ে মরছে রহীম।
তিন মাইল পথ অতিক্রম করেছে রহীম। হঠাৎ কয়েকটি ধাবমান ঘোড়ার ক্ষীণ আওয়াজ কানে আসে তার। পেছনের দিকে তাকায়। উড়ন্ত ধূলি-বালির একখণ্ড মেঘ ধেয়ে আসছে তার দিকে। এদিক-সেদিক তাকিয়ে পালাবার পথ খুঁজে রহীম। কিন্তু নেই। ঘোড়ায় চড়ে কে আসছে, জানে না সে। রহীম ঘোড়ার পথ ছেড়ে পার্শ্বপথ দিয়ে হেঁটে চলেছে। মনে তার প্রচণ্ড ভয়।
নিকটে চলে এসেছে ঘোড়াটি। দাঁড়িয়ে যায় ঠিক রহিমের পার্শ্ব ঘেঁষে। এবার রহীম থেমে যায়, ঘোড়ার আরোহীরা খৃস্টান। রহীম নিরস্ত্র। পালাবারও পথ নেই। আরোহীরা রহীমকে ঘিরে ফেলে। রহীম তাদের একজনকে চিনে ফেলে। লোকটা আইলসনের পাণিপ্রার্থী অফিসার। সে রহীমকে উদ্দেশ করে বলে, আমার আগে থেকেই সন্দেহ ছিল, তুমি খৃস্টান নও।
