রহীমের উদ্দেশ্যে গেলেও তাকে পেত না ইমরান। নিজ ঠিকানায় ছিলও না সে। ছিল না আক্রার কোথাও। ইমরান যখন তার কর্তব্য নিয়ে অস্থির, সে সময় আইলসন রহীমকে ব্যস্ত করে রেখেছে অন্য ব্যাকুলতায়।
সে রাতে খৃস্টানদের নাচ-গান ও ভোজসভার আয়োজন ছিল। যে বয়সী অফিসার আইলসনকে বিয়ে করতে চাচ্ছিল, সে মেয়েটিকে তার সঙ্গে নৃত্য করার আহ্বান জানায়। কিন্তু আইলসন তার আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে অন্য যুবক অফিসারদের সঙ্গে নৃত্য করে। অফিসার আইলসনের পিতার কাছে নালিশ করে। পিতাও সেই আসরে উপস্থিত ছিল। পিতা মেয়েকে শাসিয়ে দেয় যে, তুমি তোমার পাণিপ্রার্থীকে অপমান কর না, যাও তার সঙ্গে গিয়ে নাচ। আইলসন রাগ করে আসর ত্যাগ করে চলে যায় এবং পিতাকে সিদ্ধান্ত জানিয়ে আসে যে, আমি এই বুড়োটাকে বিয়ে করব না।
ক্ষুণ্ণমনে কিছুক্ষণ চুপ থেকে আইলসনের পিতা ও বুড়ো অফিসার আইলসনের পেছন পেছন ছুটে। মেয়েটি এতক্ষণে অনেক দূর চলে গেছে। দুজন ঘরে গিয়ে দেখতে পায়, মেয়ে ঘরে নেই। তালাশ করে মেয়েকে রহীমের কক্ষে পায়। সে মেয়েকে জিজ্ঞেস করে, তুমি এখানে কি করছ? মেয়ে বিরক্ত হয়ে ক্ষুব্ধ কণ্ঠে জবাব দেয়, আমি যথায় ইচ্ছে যাব; আপনি তাতে মাথা ঘামাচ্ছেন কেন! আইলসনের কথায় তার পাণিপ্রার্থী বুড়ো অফিসারের মনে সন্দেহ জাগে। ব্যবসায়ী তার মেয়েকে ঘরে নিয়ে যায়। অফিসার রহীমকে জিজ্ঞেস করে, ঐ মেয়েটি এখানে কেন এসেছিল? রহীম উত্তর দেয়, এসেছে তো আপনার কী? ও এখানে অতীতেও এসেছে, ভবিষ্যতেও আসবে? অফিসার রহীমকে ধমকি দিয়ে বলে, তুই এখান থেকে চলে যাবি; অন্যথায় আমি তোকে জ্যান্ত রাখব না। রহীমের দেহেও যৌবনের রক্ত প্রবাহমান। সেও মুখের উপর জবাব দেয়। কথা কাটাকাটি হয় দুজনের মধ্যে। আইলসনের পিতা এসে দুজনকে শান্ত করে। শেষে অফিসার ব্যবসায়ীকে উদ্দেশ করে আদেশের সুরে বলে, আমি এই লোকটাকে এখানে আর এক দণ্ডও দেখতে চাই না।
পরদিন রহীমকে ডেকে নিয়ে ব্যবসায়ী বলল, তোমার আর এখানে চাকুরী করা হবে না। তুমি নিজের পথ দেখ। সেনাবাহিনীর এতবড় একজন অফিসারকে অসন্তুষ্ট করে আমি আমার ব্যবসা লাটে উঠাতে চাই না। আর দেরী না করে তুমি এখান থেকে চলে যাও। অফিসার ইচ্ছে করলে তোমাকে বিনা দোষেও কয়েদখানায় পাঠাতে পারতেন।
কী উদ্দেশ্যে এই খৃস্টান এলাকায় আসা, ভুলে গেছে রহীম। খৃস্টান মেয়ে আইলসনই এখন জীবনের কেন্দ্রবিন্দু, চাওয়া-পাওয়া তার। যতসব মান-মর্যাদা আইলসনকে নিয়ে ঘুরপাক খাচ্ছে। অফিসার তাকে ধমকি দিল, এই অপমানের বাস্তব জবাব দিতে চাইছে সে। প্রতিশোধ গ্রহণে বদ্ধপরিকর রহীম।
ব্যবসায়ী প্রতিদিনের মতো দোকানে চলে যায়। রহীম যায় তার মালিকের ঘরে। দেখা করে আইলসনের সঙ্গে। তারা উভয়ে শলাপরামর্শ করে এখান থেকে পালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। পালানোর সময় ঠিক করা হয় সন্ধ্যায়।
রাতে যখন ইমরান রেজার নিকট বসে তাদের ভবিষ্যৎ কর্মসূচী ঠিক করছিল এবং জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হলেও কর্তব্য পালনের অঙ্গীকার করছিল, তখন রহীম আইলসনের অপেক্ষায় শহরের বাইরে এক নির্জন এলাকায় অপেক্ষমান। আইলসন রহীমকে বলে দিয়েছিল, সে তার বাবার ঘোড়া নিয়ে এখানে এসে উপস্থিত হবে, পরে একসাথে দুজনে ঘোড়া নিয়ে পালিয়ে যাবে। অধীর অপেক্ষমান রহীম চিন্তা করছিল, আইলসন তার বাবার অগোচরে কি করে ঘোড়া নিয়ে আসবে।
আইলসন ঘোড়া চুরি করে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়। আইলসনকে দেখে রহীম বিশ্বাসই করতে পারছিল না যে, সে এত সহজেই এসে পড়বে। ক্ষীপ্রগতিতে ছুটে এসে নির্ধারিত স্থানে দাঁড়িয়ে যায় ঘোড়াসহ আইলসন। রহীম ঘোড়ার পিঠে আইলসনের পেছনে এক লাফে চড়ে বসে। ঘোড়া চলতে শুরু করে। বেশ কিছুদূর চলার পর ঘোড়ার গতি কিছুটা কমিয়ে দেয় আইলসন। পরে আবার বাড়িয়ে দেয়। অল্প সময়ের মধ্যেই তারা আক্রা। অতিক্রম করে বেশ দূরে চলে যায়।
***
মধ্যরাত নাগাদ রহীম ও আইলসন এমন এক স্থানে এসে ঘোড়া থামায়, যেখানে পানি আছে। উদ্দেশ্য ঘোড়াকে পানি পান করাবেন এবং নিজেরাও কিছুটা বিশ্রাম করবে। রহীমের জানা আছে, সামনে বহুদূর পর্যন্ত পানি পাওয়া যাবে না। এ ব্যাপারে তারা নিশ্চিত যে, এখন আর তাদের নাগাল কেউ পাবে না। রহীম আইলসনকে বলল, কিছুক্ষণ বিশ্রাম করে নাও; শেষ রাতের আঁধারীতে আবার আমরা রওনা হয়ে যাব।
তুমি কি বাইতুল মুকাদ্দাসের পথ চেন? জিজ্ঞেস করে আইলসন।
আক্রা থেকে পালিয়ে আসার আগে তারা স্থির করেনি তারা কোথায় গিয়ে উঠবে। বাইতুল মোকাদ্দাসের কথা উল্লেখ করায় রহীম বলল, বাইতুল মোকাদ্দাস কেন? আমি তোমাকে সেখানে নিয়ে যাব, যেখানে তোমাকে ধাওয়া করার কেউ সাহস পাবে না।
কোথায় সেই জায়গা? আইলসন জিজ্ঞেস করে।
মিসর। রহীম উত্তর দেয়।
মিসর?- একরাশ বিস্ময়ের সাথে প্রশ্ন করে আইলসন- ও তো মুসলমানের দেশ। ওরা আমাদেরকে জ্যান্ত রাখবে না।
মুসলমানদেরকে তুমি চিন না আইলসন!- রহীম বলল- মুসলমান বড় হৃদয়বান; তুমি গিয়েই দেখতে পাবে।
না- ভয়ার্ত কণ্ঠে আইলসন বলল- মুসলমান নাম শুনলে আমার ভয় লাগে। শিশুকাল থেকেই আমি জানি, মুসলমান এক ঘৃণ্য ও হিংস্র জাতি। আমাদের এলাকায় মায়েরা শিশুদেরকে মুসলমানের ভয় দেখিয়ে ঘুম পাড়ায়। আমি মুসলমানকে ঘৃণা করি।
