এ কারণে অনেক সম্রাটের উপরই পাদ্রীর আস্থা ছিল না। তাদের দু-মুখো নীতির জন্য তিনি বেজায় অস্থির। ইমরান ইচ্ছে করলে বলতে পারে, যে জাতি স্বার্থ উদ্ধারের জন্য তাদের মেয়েদেরকে যা-তা কাজে ব্যবহার করতে কুণ্ঠিত হয় না, সে জাতির সম্রাটরা একে অপরকে ধোকা দিবে তাতে বিচিত্র কী? ময়দানে পরাজিত হয়ে যে জাতি আন্ডারগ্রাউন্ড যুদ্ধে লিপ্ত হয়, সে জাতির চারিত্রিক অবস্থা তো এমন হওয়া স্বাভাবিক যে, তারা পরস্পর পরস্পরকে ধোঁকা দিয়েই বেড়াবে। কিন্তু ইমরান প্রসঙ্গটা এড়িয়ে। সে এ কথাটা সুলতান আইউবীকে বলার জন্য মুখস্ত করে রেখেছে যে, যদি ইসলামের সারিতে গাদ্দার না থাকত, তাহলে খৃস্টানদেরকে চূড়ান্তরূপে পরাজিত করে তাদের থেকে ইউরোপকেও ছিনিয়ে নেয়া সম্ভব হত। গাদ্দারীই মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ঘাতক। আক্রার পাদ্রী ও খৃস্টান সম্রাটগণ মুসলমানদের এই দুর্বলতায় অত্যন্ত আনন্দিত। এখানে অবস্থান করে ইমরান জানতে পারে, খৃস্টানরা মুসলমানদের চরিত্র ধ্বংসের অভিযান আরো জোরদার করেছে। সে মুসলমানদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের সেই শাসকদের নামও সংগ্রহ করে নেয়, যারা তলে তলে খৃষ্টানদের সঙ্গে জোট বেঁধেছে এবং খৃস্টানরা তাদেরকে ইউরোপের মদ, নারী ও অর্থ সরবরাহ করছে।
ইমরান ও রেজা দায়িত্ব নিয়ে ব্যস্ত। কিন্তু ধীরে ধীরে কর্তব্য থেকে সরে যাচ্ছে রহীম হাঙ্গুরা। এখন তার চেষ্টা, দোকান ছেড়ে কিভাবে ব্যবসায়ীর ঘরে কাজ নেয়া যায়। আইলসনের ভালবাসা তাকে অন্ধ করে চলেছে।
দিনকয়েক পর আইলসন রহীমকে জানায়, তার তিনগুণ বয়সী এক সেনা অফিসারের সঙ্গে তার বিবাহ হচ্ছে। বয়সের এত ব্যবধান না হলেও আইলসন রহীম ছাড়া অন্য কারো সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে রাজি নয়। মাকে সে জানিয়েও দিয়েছে যে, অফিসারকে সে বিয়ে করবে না। কিন্তু তার পিতা তা মানতে রাজি নয়। এই সেনাঅফিসারকে দিয়ে প্রচুর অর্থ উপার্জন করছে সে। তার সঙ্গে মেয়েকে বিয়ে দিতে বাধ্য। একদিন আইলসন তার গলার কুশটা খুলে রহীমের হাতে দিয়ে তার উপর নিজের হাত রেখে ক্রুশের শপথ করে বলল, আমি তোমাকে ছাড়া অন্য কাউকে বিয়ে করব না। রহীমও শপথ করে, আমিও তোমাকে ছাড়া আর কাউকে বিয়ে করব না।
***
একদিন চার-পাঁচজন সেনা অফিসার পাদ্রীর নিকট আগমন করেন। পাদ্রী তাদেরকে তার খাস কামরায় নিয়ে বসান। ইমরান তাদের মুখের ভাব দেখে বুঝে ফেলে, বিশেষ কোন কথা আছে নিশ্চয়ই। সে পাদ্রীর কক্ষে ঢুকে পড়ে। তাকে দেখামাত্র যে অফিসার কথা বলছিল, তিনি কথা বন্ধ করে দেন। পাদ্রী ইমরানকে বললেন, জনগন্থর! তুমি এ সময় কক্ষে ঢুকবে না; আমরা একটা জরুরী আলাপ করছি।
ইমরান বের হয়ে পাশের কক্ষে চলে যায় এবং দেয়ালের সঙ্গে কান লাগিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। অফিসার কথা বলছেন ক্ষীণ কণ্ঠে। তবু কাজের কথাগুলো ইমরান বুঝে ফেলে। মিটিং শেষ হওয়ার পর অফিসাররা যখন বের হতে শুরু করেন, তখন ইমরান সরে অন্যত্র চলে যায়। পাদ্রী বা অন্য কেউ তাকে দেখতে পায়নি।
গুরুত্বপূর্ণ আরো তথ্য পেয়ে গেছে ইমরান। সে সিদ্ধান্ত নেয়, এক্ষুণি সে পালিয়ে যাবে। অবিরাম পথ চলে কায়রো পৌঁছে সুলতান আইউবীকে সংবাদ দেবে যে, আপনি আক্রমণ প্রতিহত করার প্রস্তুতি গ্রহন করুন। কিন্তু পাদ্রী তাকে ডেকে নিয়ে এমন একটি কাজে জুড়িয়ে দেন যে, তৎক্ষণাৎ পালানো আর তার পক্ষে সম্ভব হল না। তাছাড়া যাওয়ার আগে তাকে রহীম ও রেজার নিকট থেকেও তথ্য নিতে হবে। এমনও হতে পারে, আজ সে যে তথ্য লাভ করল, তারাও তা পেয়ে থাকবে। এভাবে সকলের দ্বারা সত্যায়িত হলে তিনজন একত্রেই আক্রা থেকে বেরিয়ে যাবে। এর জন্য তাকে চারদিন অপেক্ষা করতে হবে। কিন্তু আর এক মুহূর্ত এখানে থাকতে চাচ্ছে না ইমরানের ব্যাকুল মন।
পরদিন রেজার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যায় ইমরান। রেজাকে সে তার আস্তাবলেই পেয়ে যায়। তাকে জিজ্ঞেস করে, নতুন কোন তথ্য পেয়েছ কি? রেজা জানায়, আমি অস্বাভাবিক একটা তৎপরতা লক্ষ্য করছি। উড়ো উড়ো শুনেছি, খৃস্টানরা জবাবী আক্রমণ স্থলপথে করবে না। মনে হচ্ছে, তারা সমুদ্রপথে হামলা চালাবে। এখন আমাদেরকে তাদের আক্রমণের বিস্তারিত পরিকল্পনা জানতে হবে।
ইমরান রেজাকে জানায়, খৃস্টানরা এই আক্রমণকে চূড়ান্ত অভিযানের রূপ দিতে চায়। নিজে যা কিছু শুনেছে, তা রেজাকে শুনিয়ে দেয় এবং বিস্তারিত জানার জন্য তাকে দায়িত্ব দেয়। বিস্তারিত তত জানাই আছে ইমরানের। কিন্তু রেজাকে বিষয়টা সত্যায়ন করাতে চাইছে সে। ইমরান রেজাকে জানায়, আমি দুএকদিনের মধ্যে এখান থেকে রওনা হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি। কর্তব্য আমার পালন হয়ে গেছে। বাহনের জন্য তিনটি ঘোড়া বা উটের প্রয়োজন। কোথাও হতে চুরি করে সংগ্রহ করতে হবে এগুলো।
রহীমের নিকটও যাওয়া আবশ্যক ইমরানের। চলে যাওয়ার প্রস্তুতি গ্রহণের কথা জানিয়ে দেয়া দরকার তাকেও। কিন্তু রাত অনেক হয়ে গেছে। তাছাড়া তার কাছে যেতেও চাচ্ছে না ইমরান। কারণ, ব্যবসায়ী রহীমকে থাকার জন্য যে জায়গা দিয়েছে, সেখানে যাওয়া ইমরানের জন্য ঠিক নয়। ইমরান গির্জায় চলে যায়।
