সহিসী আমার পেশা, আপনাকে কে বলল? রেজা জবাব দেয়- আমি কার্কে অনেকগুলো ঘোড়ার মালিক ছিলাম। আমি নিজে ফৌজে ছিলাম না বটে; আমার দুটি গোড়া যুদ্ধে গিয়েছিল। এটা কালের চক্র স্যার! কালের চক্রেই আমি ঘোড়ার মালিক আজ আপনাদের আস্তাবলে সহিসীর চাকুরী করছি। তবে তার জন্য আমার দুঃখ নেই। আপনি যদি সালাহুদ্দীন আইউবীকে পরাজিত করতে পারেন, তাহলে জীবনের বাকী দিনগুলো আমি আপনার জুতা পরিষ্কার করে কাটিয়ে দেব।
পরাজয় সালাহুদ্দীন আউইবীর লিখন হয়ে গেছে ফ্রান্সিস। রেজাকে বললেন অফিসার।
কিন্তু কিভাবে?- সুযোগ পেয়ে প্রশ্নটা করে ফেলল রেজা আমাদের সম্রাটগণ যদি কার্ক ও শোবকের উপর আক্রমণ করে মুসলমানদেরকে সেই পদ্ধতিতে অবরুদ্ধ করে পরাজিত করার চেষ্টা করেন, যে পদ্ধতিতে তারা আমাদেরকে পরাজিত করেছিল, তাহলে আপনারা সফল হতে পারবেন না। সালাহুদ্দীন আইউবী ও নুরুদ্দীন জঙ্গী যুদ্ধের ওস্তাদ। আমি শুনেছি, তারা নাকি আমাদের বাহিনীকে দুর্গ থেকে দূরে প্রতিহত করার আয়োজন করে রেখেছে। ভাল হবে, যদি আক্রমণটা এমন একদিক থেকে করা হয়, যেদিক থেকে আক্রমণ আসতে পারে বলে আইউবী কল্পনাও করে না। আইউবী ও জঙ্গী দুর্গে বসে থাকুক, আপনারা মিসরের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ুন।
এমনই তো হবে- অর্থবহ মুচকি হেসে অফিসার বললেন- সমুদ্রে কোন দুর্গ থাকে না। মিসরের উপকূলেও কোন দুর্গ নেই। মিসরে এখন ক্রুশেরই রাজ প্রতিষ্ঠিত হবে ফ্রান্সিস।
প্রথম তথ্যটি সংগ্রহ করল রেজা। তারপর সেই অফিসারের নিকট থেকে আরো অনেক তথ্য জেনে নেয় সে। যুদ্ধের ভেদ বিস্তারিত প্রকাশ করে না কেউ। ইঙ্গিত থেকেই জেনে নিতে হয় অনেক কিছু। ই বললে ইদরীস বুঝতে হয়। একজন বিচক্ষণ ও দূরদর্শী গোয়েন্দার পক্ষে তা কোন ব্যাপারই নয়। একটি ইশারাকে নিজের যোগ্যতা বলে এক বিশাল কাহিনীর রূপ দিতে পারে অভিজ্ঞ গুপ্তচর।
***
রহীম ও রেজা প্রতি রোববার সকালবেলা গীর্জায় গিয়ে ইমরানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করছে এবং আগের দিনের রিপোর্ট প্রদান করছে। রহীম ইমরান অবহিত করে রেখেছিল যে, তার মালিকের মেয়ে আইলসন তাকে মনে-প্রাণে ভালবাসতে শুরু করেছে। ইমরান তাকে বলে দেয়, তুমি তার ভালবাসাকে প্রত্যাখ্যান কর না; অন্যথায় তুমি ওখানে থাকতে পারবে না। তবে সাবধান! তুমি আবার মেয়েটির ভালবাসায় হারিয়ে যেও না।
কিন্তু ঘটনা সেদিকেই গড়াচ্ছিল। রহীম আইলসনের রূপ-যৌবনে হারিয়ে যেতে শুরু করল। মেয়েটি রহীমকে এমনও বলে দিয়েছিল যে, তোমার-আমার বিয়ে হতে হলে আমাদেরকে আক্রা থেকে পালিয়ে অন্য কোথাও চলে যেতে হবে। কারণ, একজন সেনা অফিসার আমাকে পাওয়ার জন্য আমার বাবার সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়েছে। কিন্তু রহীম ইমরানকে এতকিছু অবহিত করেনি।
ইমরান এখন পাদ্রীর ঘনিষ্ঠ শিষ্য। পাদ্রীর ভেদ-রহস্য সবই রহীমের জানা হয়ে যায়। অবসর সময়ে ইমরানকে ধর্মের দীক্ষা প্রদান করছেন পাদ্রী। তিনি ইমরানকে সবক দিচ্ছেন যে, খৃস্টবাদের সবচেয়ে বড় কর্তব্য হল, ভূপৃষ্ঠ থেকে ইসলামের অস্তিত্ব মুছে ফেলা। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য খৃস্টানদের লড়াই করতে হবে এবং যে কোন পন্থা অবলম্বন করতে হবে। এটা জরুরী নয় যে, মুসলমানদেরকে মেরে ফেলতে হবে। প্রথমত তাদেরকে খৃস্টান বানাবার চেষ্টা করতে হবে। চেষ্টা করার পরও যাদেরকে খৃস্ট ধর্মে দীক্ষিত করা সম্ভব হবে না, তাদের মন-মস্তিষ্ক থেকে ইসলামকে সরিয়ে দিতে হবে। তার উপায় হল, তাদের মধ্যে অপকর্মের বীজ বপন করতে হবে। এ-কাজের জন্য মেয়েদেরকে ব্যবহার করতে হবে। আমাদের মেয়েরা মুসলিম মেয়েদের মধ্যে অপকর্ম ছড়িয়ে দেবে, মুসলিম যুবক ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের চরিত্র ধ্বংস করবে। যেহেতু ইহুদীরাও মুসলমানদের দুশমন এবং তারা তাদের মেয়েদেরকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করছে, সেহেতু মুসলমানদের চরিত্র ধ্বংসের জন্য ইহুদী মেয়েদেরকেও কাজে লাগাতে হবে। আমাদের লক্ষ্য থাকবে একটাই- মুসলমানদের নাম-চিহ্ন মুছে ফেলা। তারপর এর জন্য যে কোন পন্থা অবলম্বন করা। অন্যের দৃষ্টিতে হোক তা অবৈধ, নিপীড়নমূলক, লজ্জাকর।
ইমরান পাদ্রীর মুখ থেকে এসব কথা শুনছে আর স্বস্তি প্রকাশ করছে। পাদ্রীর আস্তানায় সামরিক ও প্রশাসনিক অফিসাররাও আসা-যাওয়া করছে। সে দিনগুলোতে যেহেতু খৃস্টানদের একের পর এক ময়দান থেকে পরাজিত হয়ে পালাতে হচ্ছিল, সে কারণে আক্ৰায় যে কারো মুখে একই প্রশ্ন বিরাজ করছিল যে, জবাবী হামলা কবে হবে। পাদ্রীর আস্তানায় ও এর বাইরে অন্য কোন আলোচনা নেই। ইমরান সেখান থেকে মূল্যবান তথ্য হাসিল করে চলেছে। সে এও জেনে ফেলেছে যে, খৃস্টান সম্রাটদের মধ্যে একতা নেই। প্রত্যেকের কাছে নিজ নিজ রাজত্বই মুখ্য। কিন্তু যেহেতু তাদের প্রত্যেকের ধর্ম এক, তাই ক্রুশের উপর হাত রেখে তারা ইসলাম নির্মূলের যুদ্ধ শুরু করে দিয়েছে। অন্যথায় ভেতরে ভেতরে তারা বিভক্ত। কেউ কেউ এমনও আছে, তারা একদিকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে, অন্যদিকে মুসলমানদের সঙ্গে সন্ধি করে যুদ্ধ থেকে বিরত থাকার চেষ্টা করছে। তারে মধ্যে উল্লেখযোগ্য একজন হলেন সিজার ম্যানুয়েল, যিনি এক ময়দানে নুরুদ্দীন জঙ্গীর সঙ্গে সন্ধি করে জরিমানা আদায় করেছেন এবং মুসলিম যুদ্ধবন্দীদের মুক্তি দিয়েছেন। এখন তিনি অন্যান্য সম্রাটদের উত্তেজিত করছেন, যেন সবাই মিলে সুলতান জঙ্গীর উপর আক্রমণ চালায়। তার পরামর্শ, আমাদের আক্রমণ অভিযানকে দুভাগে বিভক্ত করা হোক; একটি জঙ্গীর উপর অপরটি মিসরের উপর। সুলতান জঙ্গী তখন কার্কে অবস্থান করছিলেন।
