ব্যবসায়ীর ষোড়শী কন্যা আইলসন। অতিশয় রূপসী। রহীমের বক্তব্যে অন্যদের তুলনায় বেশী প্রভাবিত হয় মেয়েটি। রহীমকে তার বোন সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। খুটিয়ে খুটিয়ে এ-কথা ও-কথা নানা বিষয় জানতে চায়। রহীম বলে, আমার বোনটি ঠিক তোমারই ন্যায় ছিল, যেন তুমিই। তোমাকে দেখার পর থেকে আমার তার কথা বেশী বেশী মনে পড়ছে। বোনটি মরে গেলেও দুঃখ করতাম না। দুঃখের বিষয় হল, ওকে মুসলমানরা তুলে নিয়ে গেছে। তুমি বুঝতে পারবে, ওর কী পরিণতি ঘটেছে! এখন আমার একটাই ভাবনা, বোনকে মুসলমানদের হাত থেকে কিভাবে উদ্ধার করব। বিষয়টি মনে পড়লে অনেক সময় আমি পাগলের মত হয়ে যাই, মন চায় বোনকে যেখান থেকে হারিয়েছি, সেখানে ছুটে যাই। কিন্তু আবার ভাবি, তাতে কী হবে? ওখানে গেলে বোন তো পাব না, পাব মৃত্যুকে। আমি আর বেঁচে থাকতে চাই না। বলতে বলতে কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে আসে রহীমের। দুচোখ তার বাম্পাচ্ছন্ন।
মা-মেয়ে বোধ হয় চিন্তা করেছে যে, এমন সুশ্রী যুবক ভরা যৌবনেই দুঃখ-বেদনায় জর্জরিত। তার আবেগময় অবস্থা-ই প্রমাণ করছে, তার দুঃখ যদি হাল্কা করা না যায়, তাহলে লোকটি পাগল হয়ে যেতে পারে কিংবা আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে পারে। ব্যবসায়ীর অবিবাহিত রূপসী কন্যা আইলসন হৃদয় দিয়ে রহীমের দুঃখ অনুভব করতে শুরু করে। রহীমের বেদনা নিজেকেও বেদনাহত করেছে বলে মনে হয় তার। প্রথম দিনেই রহীমের প্রতি আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ে আইলসন।
নিজের দুঃখের কাহিনী শুনিয়ে রহীম যখন ব্যবসায়ীর ঘর থেকে বের হয়, তখন এক বাহানায় আইলসন ছুটে এসে রহীমের পথ আগলে দাঁড়ায় এবং বলে, আপনি আমাদের বাসায় প্রতিদিন আসা-যাওয়া করবেন। মেয়েটি সান্তুনামূলক কিছু কথা বলে রহীমের দুঃখের বোঝা হাল্কা করার চেষ্টা করে।
রাতে ব্যবসায়ী ঘরে ফিরলে মা-মেয়ে দুজনই ছেলেটার প্রতি বিশেষভাবে লক্ষ্য রাখার কথা বলেন। রহীমের চেহারা-গঠন এমন যে, দেখতে তাকে কোন সম্ভ্রান্ত ও উচ্চ পরিবারের সন্তান বলে মনে হয়। ক্রটি যদিও কিছু আছে, সেটা ঢাকা পড়ে যাচ্ছে তার ব্যবহার আর চালচালনে। আলী বিন সুফিয়ানের প্রশিক্ষণের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করে চলেছে রহীম হাঙ্গুরা।
তিন-চারদিন পর। রহীম হাঙ্গুরা তার মালিকের কাছে উপবিষ্ট। এমন সময় সে তার এক সঙ্গীকে দেখতে পায়। তার নাম রেজা আলজাদা। রহীম উঠে গিয়ে তার সঙ্গে দেখা করে। দুজন পাশাপাশি হাঁটছে আর কথা বলছে। রহীম রেজাকে জিজ্ঞেস করে, তুমি কী করছ? রেজা জানায়, আমি এখনো কোন আশ্রয় পায়নি।
রেজা অভিজ্ঞ ঘোড়সওয়ার। ঘোড়া প্রতিপালনেও তার বেশ দক্ষতা আছে। রহীম তাকে নিজের মালিকের কাছে নিয়ে এসে ফ্রান্সিস নামে পরিচয় করিয়ে দেয়। বলে, এ আমার বন্ধু, আমারই ন্যায় মজলুম। একটা চাকরির প্রয়োজন। রহীম মালিককে এ-ও জানায় যে, তার বন্ধু ঘোড়া প্রতিপালনে খুবই অভিজ্ঞ। ব্যবসায়ী বলল, ঠিক আছে, আমার কাছে তো অনেক অফিসারের আসা-যাওয়া আছে; দেখি, তাদের মাধ্যমে ফ্রান্সিসকে একটা চাকরি জুটিয়ে দিতে পারি কিনা।
দু-তিনদিন পর এমন একটি আস্তাবলে রেজার চাকরি হয়ে যায়, যেখানে খৃস্টান ফৌজের বড় বড় অফিসারদের ঘোড়া থাকে।
খৃস্টানদের অনেক সেনা অফিসার আসা-যাওয়া করে রহীমের মালিকের কাছে। সেও যাওয়া-আসা করে তাদের কাছে। রহীম দেখতে পায়, তার মালিক অফিসারদেরকে মদ-হাশীশ ছাড়াও লুকিয়ে লুকিয়ে নারী সরবরাহ করছে। এই সূত্রেই সামরিক অফিসারদের মুঠোয় করে রেখেছে ব্যবসায়ী।
ব্যবসায়ীকে রহীম সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী ও নুরুদ্দীন জঙ্গীর বিরুদ্ধে উত্তেজিত করে চলেছে। সে আকাঙ্খ ব্যক্ত করে যে, খৃস্টান ফৌজ সমগ্র আরব ও মিসর দখল করে নিক, কোন মুসলমান জীবিত না থাকুন এবং পৃথিবীর বুক থেকে ইসলাম নিশ্চিহ্ন হয়ে যাক। এ জাতীয় প্রসঙ্গ উত্থাপিত হলে রহীম এমন ব্যাকুল ও আত্মহারা হয়ে উঠছে, যেন সে আক্রার মুসলমানগুলোকে চিবিয়ে খেয়ে ফেলবে। তাদের রক্ত পান করবে। ব্যবসায়ী তাকে সান্ত্বনা দিতে থাকেন যে, খৃস্টান ফৌজ তার এই খায়েশ পূরণ করবে। রহীম খৃস্টান বাহিনীর ঐসব অফিসারদেরকেও মন্দ বলতে শুরু করে, যারা আক্ৰায় বসে বসে আয়েশ করছে।
এসব আবেগময় কথাবার্তার পাশাপাশি রহীম বুদ্ধিমত্তার কথাও বলতে থাকে এবং মুসলমানদের পরাজিত করার জন্য এমন পরিকল্পনা গ্রহণের প্রস্তাব করে যে, ব্যবসায়ী তাকে অস্বাভাবিক বুদ্ধিমান বলে ভাবতে শুরু করে। রহীমের এই আবেগ ও বুদ্ধিমত্তার জন্যই ব্যবসায়ী তাকে খৃস্টানদের যুদ্ধ পরিকল্পনা সংক্রান্ত ভেদ জানাতে শুরু করে। সেনা অফিসারদের সঙ্গে উঠাবসা থাকার কারণে ব্যবসায়ী সামরিক বিষয়ে অনেক তথ্যই জানে।
ব্যবসায়ীর রূপসী কন্যা আইলসনের সখ্য গড়ে উঠে রহীমের সাথে। রহীমও নিজের মনে আসক্তি অনুভব করে আইলসনের প্রতি। রহীম মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে রাখে, দায়িত্ব পালন শেষে আইলসনকে সঙ্গে করে কায়রো যাবে। মেয়েটাকে বিয়ে করবে মুসলমান বানিয়ে। মন দেয়া-নেয়া চলছে দুজনের মধ্যে। কিন্তু দুজনের একজনও জানে না, খৃস্টান ফৌজের বড় এক অফিসার নজর রাখছে আইলসনের প্রতি।
রেজা আলজাদাও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত গুপ্তচর। তার আস্তাবলে ঘোড়া রাখেন, এমন একজন পদস্থ অফিসারের সঙ্গে মাঝে-মধ্যে আলাপ হয় তার। কথাবার্তা শুনে অফিসার আন্দাজ করে, ছেলেটা অসাধারণ, বেশ বুদ্ধিমান। মোটামুটি ঘনিষ্ঠতা গড়ে উঠে দুজনের মধ্যে। অফিসারের সঙ্গে আগ বাড়িয়েও কথা বলতে পারছে রেজা। একদিন রেজা অফিসারকে জিজ্ঞেস করে, সালাহুদ্দীন আইউবীকে আপনারা কবে নাগাদ পরাস্ত করবেন? তারপর সে অফিসারের আপন হয়ে আইউবীর সৈন্যদের কি কি গুণ আছে এবং খৃস্টান সৈন্যদের কি কি ত্রুটি আছে তার বিবরণ দেয়। একদিন অফিসারকে এমন কিছু কথাবার্তা শোনায়, যা একজন যুদ্ধাভিজ্ঞ লোক ছাড়া বলতে পারে না। অফিসার খানিক বিস্মিত কণ্ঠে বললেন, আচ্ছা, তুমি আসলে কে? ঘোড়া প্রতিপালন করা তো তোমার পেশা হতে পারে না!
