মুসলমানদের হাতে সর্বস্বহারা খৃস্টানের বেশে আক্রা ঢুকে পড়ে তিন গোয়েন্দা। নির্যাতিত খৃস্টান হিসেবে উদ্বাস্তু শিবিরে আশ্রয় পেয়ে যায় তারা। তিনজনই প্রশিক্ষিত ও অত্যন্ত বিচক্ষণ। ইমরান সোজা বড় পাদ্রীর নিকট চলে যায়। নিজেকে এমন একটি এলাকার শরণার্থী বলে পরিচয় দেয়, যেটি খৃস্টানদের ভূখণ্ড হওয়া সত্ত্বেও মুসলমানরা দখল করে নিয়েছে। ইমরান এমনভাবে কথা বলে, যেন তার মাথায় ধর্মীয় উন্মাদনা চেপে বসেছে এবং খোদার সন্ধানে ব্যাকুল হয়ে ঘুরে ফিরছে। সে পাদ্রীকে জানায়, তার স্ত্রী সন্তানরা সবাই মুসলমানদের হাতে মারা গেছে। কিন্তু তাদের জন্য তার কোন দুঃখ নেই। অস্থিরচিত্ত ইমরান প্রবল আগ্রহ প্রকাশ করে যে, সে গীর্জার সেবা করতে চায়। সে শুনেছে, খোদা ও রূহানী শান্তি গীর্জায় পাওয়া যায়। পাদ্রী জিজ্ঞেস করলে বলে, জগন্থর।
আর আমি মুসলমান তো হয়েই গিয়েছিলাম। ইমরান পাদ্রীকে বলল মুসলমানদের একজন মৌলভী বলেছিল, খোদা মসজিদে আছেন। আমার স্ত্রী ও সন্তানদের অভিযোগ ছিল, আমি কোন কাজ করি না- কেবল খোদা আর রূহানী শান্তি খুঁজে বেড়াই। আমি খোদার অস্তিত্বে বিশ্বাস করি। তিনি খোদা ই ছিলেন, যিনি আমার স্ত্রীকে মুসলমানদের হাতে হত্যা করিয়ে নিজের আশ্রয়ে নিয়ে নিয়েছেন। কারণ, আমি তাকে ভাত-কাপড় দিতে পারতাম না। তিনি খোদা-ই ছিলেন, যিনি আমার সন্তানদেরকেও তুলে নিয়েছেন। কারণ, সন্তান মা ছাড়া বাঁচতে পারে না। আর আমি তো তাদের খবরই নিতাম না। আমি মুসলমান হতে চেয়েছিলাম। কিন্তু মুসলমানরা আমার নিষ্পাপ সন্তানদেরকে হত্যা করে ফেলল। তারা আমার উপর অনেক অত্যাচার করে। তাতেই আমি বুঝে ফেলি, খোদা মুসলমানদের বুকে নেই, আছেন অন্য কোথাও।
বলতে বলতে সীমাহীন আবেগপ্রবণ হয়ে উঠে ইমরান। হঠাৎ পাদ্রীর গলা জড়িয়ে ধরে দাঁতে দাঁত পিষে বলে, পবিত্র পিতা, বলুন! আমি পাগল হয়ে যাইনি তো? আমি আত্মহত্যা করব পবিত্র পিতা! তারপর পরজগতে আপনাকে টেনে খোদার সামনে নিয়ে যাব এবং বলব, এই লোক ধর্মগুরু ছিল না। ছিল একজন ভণ্ড। ধর্মের নামে মানুষকে ধোকা দিত।
ইমরানের মানসিক অবস্থা এমন রূপ ধারণ করে যে, ক্রুশের প্রধান মোহাফেজ সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েন। তিনি ইমরানের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, তুমি আমার নির্যাতিত সন্তান। খোদা তোমার নিজেরই বুকে আছেন। খোদার পুত্রের এবাদতখানায় তুমি তাকে দেখতে পাবে। এই ধর্মে এই রূপেই তুমি খোদাকে পেয়ে যাবে। এখন তুমি চলে যাও। প্রতিদিন সকালে আমার কাছে এস। আমি তোমাকে খোদা দেখাব।
আমি কোথাও যাব না পবিত্র পিতা! ইমরান বলল- আমার কোন ঘর নেই। জগতে কেউ নেই আমার। আপনি আমাকে আপনার কাছেই থাকতে দিন। আমি আপনার এবং খোদার পুত্রের গীর্জার এত অধিক সেবা করব যে, তত সেবা আপনিও করেননি।
ইমরান প্রশিক্ষণ পেয়েছিল আলী বিন সুফিয়ানের নিকট থেকে। তাকে এবং তার সঙ্গীদেরকে যেহেতু খৃস্টানদের গোপন তথ্য সংগ্রহ করার জন্য তৈরি করা হয়েছিল, সেহেতু তাদেরকে খৃস্টবাদ ও খৃস্টানদের গীর্জার আদব-কায়দা সম্পর্কে শুধু শিক্ষাই দেয়া হয়নি, রীতিমত রিহার্সেলও করান হয়েছে। ইমরান সেই মহড়াকে এমন চমৎকারভাবে বাস্তবের রূপ দেয় যে, আক্রার বড় পাদ্রী এবং তার সাঙ্গপাঙ্গরা প্রভাবিত হয়ে পড়ে এবং তাকে গীর্জায় থাকতে দেয়। ইমরান এত চমৎকারভাবে পাদ্রীর সেবা করতে শুরু করে যে, অল্প কদিনে সে পাদ্রীর খাস খাদেমে পরিণত হয়ে যায়। প্রশিক্ষণ ও বিচক্ষণতা-বুদ্ধিমত্তার বলে ইমরান পাদ্রীর অন্তর জয় করে নেয়। পাদ্রী স্বীকার করে নেন যে, লোকটি। অসাধারণ বুদ্ধিমান ও জ্ঞানী। কিন্তু আবেগ তার উপর এত প্রবলভাবে চেপে বসেছে যে, তার বুদ্ধি-মেধা লোপ পেতে শুরু করেছে। পাদ্রী ইমরানকে দীক্ষা দিতে শুরু করেন।
***
ইমরানের এক সঙ্গী খৃস্টান এক ব্যবসায়ীর নিকট গিয়ে বলে, আমি কার্ক থেকে পালিয়ে আসা খৃস্টান। ওখানে আমার গোটা পরিবার মুসলমানদের হাতে মারা গেছে। লোকটি তার দুঃখের কাহিনী এমন আবেগময় ভঙ্গিতে বর্ণনা করে যে, তাতে প্রভাবিত হয়ে ব্যবসায়ী তাকে নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী হিসেবে রেখে দেয়।
ইমরানের এই সঙ্গী গোয়েন্দার নাম রহীম হাঙ্গুরা। সুদানী মুসলমান। ইমরানের মতই বিচক্ষণ, সাহসী ও সুদর্শন।
রহীম এখন খৃস্টান ব্যবসায়ীর দোকানের কর্মচারী। রহীম লক্ষ্য করে, অনেক খৃস্টান অফিসার তার দোকানে আসছে এবং সওদাপাতি ক্রয় করছে। বুদ্ধিমত্তা ও প্রশিক্ষণের জোরে রহীম ব্যবসায়ীর বিশ্বস্ত কর্মচারীতে পরিণত হয়।
কয়েকদিন অতিবাহিত হওয়ার পর ব্যবসায়ী তাকে দিয়ে বাসার কাজও করাতে শুরু করে। আইলীমুর নামক খৃস্টান ব্যবসায়ীর বাসায়ও আনাগোনা শুরু হয়ে যায় রহীমের। বাসার লোকদের উপরও প্রভাব বিস্তার করে ফেলে রহীম হাঙ্গুরা। ব্যবসায়ীর স্ত্রী, যুবতী কন্যা ও পুত্রদের কাছে রহীম নিজের বিপদের কাহিনী এমনভাবে বিবৃত করে যে, শুনে তাদের প্রত্যেকের চোখে পানি এসে যায়। রহীম তাদেরকে জানায়, আমার ঘরও আপনাদের ঘরের ন্যায় বিলাসবহুল ছিল। ছিল উন্নত জাতের ঘোড়া। ব্যবসায়ীর স্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে রহীম বলে, আমার ছিল আপনার এই কন্যারই মত অতিশয় রূপসী যুবতী বোন। প্রয়োজনীয় চাকর-চাকরানী ছাড়াও ছিল এমন অনেক কর্মচারী, যাদেরকে শুধু বিপদগ্রস্থ বলে আশ্রয় দেয়া হয়েছিল। রহীম চোখের পানি মুছতে মুছতে কাঁদ কাঁদ কণ্ঠে বলে, আর আজ আমি অন্যের ঘরে নোকরী করছি।
