তেমনি এক দুঃসংবাদে সুলতান আইউবীর সদা হাস্যোজ্জ্বল চেহারায় বেদনার ছাপ দেখে আলী বিন সুফিয়ান বললেন, আমীরে মোহতারাম! আপনার চেহারা মলিন হয়ে গেলে মনে হয় যেন সমগ্র ইসলামী দুনিয়া বিমর্ষ হয়ে পড়েছে। ইসলামের ইজ্জত জীবনের কুরবানী কামনা করছে। একদিন আমাদের দুজনকেও হয়ত শহীদ হতে হবে। দুজন গোয়েন্দা হারিয়ে গেছে, তাতে কী হয়েছে? তাদের জায়গায় অন্য দুজন পাঠিয়ে দেব। এই ধারা তো আর বন্ধ হয়ে যাবে না।
গোয়েন্দা মারফত শত্রুর সংবাদ সংগ্রহের ধারা রুদ্ধ হয়ে যাবে, আমি সেই আশংকা করছি না আলী!- ম্লান মুখে হাসি টেনে সুলতান আইউবী বললেন- একজন গোয়েন্দার শাহাদাত আমার মনে এই ভাবনাটা জাগিয়ে তোলে যে, একদিকে এই নিবেদিতপ্রাণ মুমিন আমাদের চোখের আড়ালে জন্মভূমি থেকে অনেক দূরে স্ত্রী-সন্তান, ভাই-বোন ও পিতা-মাতার সান্নিধ্য থেকে বঞ্চিত থেকে দুশমনের দেশে একা দায়িত্ব পালন করছে ও জীবনদান করছে, অন্যদিকে একজন ঈমান-বিক্রেতা গাদ্দার নিজের বিলাস-ভবনে রাজার হালে বাস করছে, বিলাসিতা করছে এবং ইসলামের মূল উপড়ে ফেলতে শত্রুর হাতকে শক্তিশালী করছে।
আচ্ছা, সালার, নায়েব সালার ও সকল কমান্ডারকে একটা নিয়ম করে ওয়াজ-নসীহত করলে কেমন হয়?- আলী বিন সুফিয়ান বললেন- আপনি মাসে অন্তত একবার ইসলামের মর্যাদা এবং ক্রুসেডারদের পরিকল্পনা সম্পর্কে তাদেরকে ওয়াজ করুন। আমার ধারণা, দুশমনের প্রতি যাদের আকর্ষণ আছে, আপনি যদি তাদেরকে বুঝাতে চেষ্টা করেন যে, তাদের দুশমন কে এবং তাদের লক্ষ্য কী; তাহলে তাদের মনমানসিকতায় পরিবর্তন এসে যাবে।
না- সুলতান আইউবী বললেন- একজন মানুষ যখন ঈমান বিক্রির পেশা অবলম্বন করে, তুমি তার সম্মুখে কুরআন রেখে দিলে সে পবিত্র কিতাবখানা ধরে একদিকে সরিয়ে রাখবে। একদিকে কতগুলো শব্দসম্ভার অপরদিকে অর্থ-বৈভব, নারী আর মদ। এমতাবস্থায় মানুষ শব্দসম্ভার দ্বারা প্রভাবিত হবে না। শব্দ-ভাষা মানুষকে নেশা দিতে পারে না, পারে না রাজত্বদান করতে। আমাদের জাতির গাদ্দাররা শিশু নয়, অজ্ঞ-অশিক্ষিতও নয়। তারা সবাই শাসক, সেনাবাহিনী ও সরকারের উঁচুপদের লোক। তারা সাধারণ সৈনিক নয়। দুশমনের সঙ্গে মাখামাখি শাসকরাই করে থাকে। সৈনিকরা লড়ে আর মরে। আমি কাউকে ওয়াজ করব না, ভাষণ দেব না। ঘন ঘন ভাষণদানকারী শাসকরা মূলত দুর্বলমনা ও অসৎ হয়ে থাকে। তারা দেশবাসীর হৃদয় ভাষা ও ভাষণ দ্বারা জয় করার চেষ্টা করে। ঘন ঘন ভাষণ শাসকগোষ্ঠীর দুর্বলতার প্রমাণ বহন করে। আমি ফৌজ ও কওমকে একথা বলব না যে, আমরা বিজয়ী, আমরা সুখী। আমি পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটাব। তারপর পরিস্থিতিই বলবে, আমরা ধনী না গরীব, বিজয়ী না পরাজিত। ফৌজ ও জনগণ আমার নিকট খাবার চাইবে। আমি মুখের ভাষায় তাদের পেট ভরাব না। আমি গাদ্দারদের শাস্তি দেব। তাদেরকে বেঁচে থাকার অধিকার থেকে বঞ্চিত করব। শোন আলী বিন সুফিয়ান! তুমি আমাকে বক্তৃতার জালে আবদ্ধ কর না। আমার যদি বলার অভ্যাস বেড়ে ওঠে, তাহলে আমি মিথ্যা বলতেও শুরু করব।
মিসরে বিদ্রোহের যে আশংকা দানা বেঁধেছিল, তাকে দমন করা হয়েছে। প্রশাসনের উচ্চপদের কয়েকজন কর্মকর্তাকে গ্রেফতার করে শাস্তি প্রদান করা হয়েছে। দুজন সুলতান আইউবীর নিকট এসে আত্মসমর্পণ করে অপরাধ স্বীকার করেছে এবং ক্ষমা নিয়ে নিয়েছে। সুলতান আইউবীর কথা যথার্থ বলে প্রমাণিত হয়েছে যে, দেশে যারা গাদ্দারী ও অস্থিতিশীলতার জন্ম দেয়, তারা স্বার্থপূজারী শাসক হয়ে থাকে। তারাই ফৌজ ও কওমকে বিভ্রান্ত করে সুখের স্বপ্ন দেখায় এবং বিদ্রোহের জন্য প্ররোচিত করে। ১১৭৪ সাল পর্যন্ত মিসরে বিদ্রোহের নাম-চিহ্নও ছিল না। খৃস্টানরা গুপ্তচরবৃত্তি ও নাশকতামূলক কাজে লিপ্ত ছিল এই যা। সুলতান আইউবী খৃস্টান অধিকৃত এলাকাগুলোতে গুপ্তচর নিয়োগ করে রেখেছিলেন।
আক্রা ফিলিস্তিনের একটি এলাকা। খৃস্টানদের প্রধান পাদ্রী-খৃস্টানরা যাকে কুশের মোহাফেজ বলে বিশ্বাস করে এখানে অবস্থান করেন। এখান থেকেই খৃস্টান কমান্ডাররা দিক-নির্দেশনা ও উৎসাহ-উদ্দীপনা লাভ করে থাকে। এক কথায়, আক্রা খৃস্টান হাইকমান্ডের হেডকোয়ার্টার। নুরুদ্দীন জঙ্গী যখন কার্ক দুর্গ জয় করেন, তখন খৃস্টানরা এই আক্রাকে কেন্দ্র বানিয়ে সুলতান আইউবী ও নুরুদ্দীন জঙ্গীর হাত থেকে বাইতুল মোকাদ্দাসকে রক্ষা করার পরিকল্পনা তৈরি ও কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। সেখানকার পরিস্থিতি এবং দুশমনের পরিকল্পনা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে সুলতান জঙ্গীকে অথবা কায়রোতে সুলতান আইউবীর নিকট পৌঁছানোর জন্য তিনজন গোয়েন্দা প্রেরণ করা হয়েছিল। অতিশয় নির্ভীক ও বিচক্ষণ গুপ্তচর ইমরান তাদের কমান্ডার।
তিন গোয়েন্দা অতি অনায়াসে ঢুকে যায় আক্রা। সুলতান আইউবী যখন শোবক দুর্গ ও শহর জয় করেন, তখন সেখান থেকে অসংখ্য খৃস্টান ও ইহুদী কার্ক পালিয়ে গিয়েছিল। মুসলমানরা যখন কার্কও জয় করে ফেলে, তখন সেখান থেকেও অমুসলিমরা পালিয়ে বিভিন্ন স্থানে চলে যায়।
এই দুটি বিজিত অঞ্চলের আশপাশের এলাকার ইহুদী-খৃস্টানরাও পালিয়ে যায়। আলী বিন সুফিয়ানের পরামর্শে তার কয়েকজন গুপ্তচর নির্যাতিত ও বাস্তুহারা খৃস্টানের বেশ ধারণ করে খৃস্টানদের এলাকায় চলে গিয়েছিল। তাদের তিনজনকে দায়িত্ব দেয়া হয়, তারা আক্রা থেকে খৃস্টানদের যুদ্ধ বিষয়ক তথ্য সংগ্রহ করে কায়রো প্রেরণ করবে। সেখানকার খৃস্টান বাহিনীর গতিবিধির উপর দৃষ্টি রাখবে, অমুসলিম নাগরিকদের মধ্যে মুসলিম সৈন্যদের ব্যাপারে আতংক সৃষ্টি করবে এবং এই তথ্যও সংগ্রহ করবে যে, সেখানে কী ধরনের নাশকতা পরিচালনা করা যায়।
