ইসমাইল পুনরায় বাক্সে হাত ঢুকিয়ে দেয়। হঠাৎ কুদুমী চিৎকার করে বলে ওঠে, নিজেকে রক্ষা কর ইসমাইল!
ইসমাইল ঝানু লোক। একদিকে লুটিয়ে পড়ে চক্কর কাটে সে। খানিক সরে গিয়ে উঠে দাঁড়ায়। দেখে, মারকুনী তরবারী উঁচিয়ে তার উপর আক্রমণ করতে উদ্যত। ইসমাইল সরে যাওয়ায় তরবারীর আঘাতটা গিয়ে পড়ে বাক্সর উপর। মারকুনী জোরালো কণ্ঠে বলে, এ ধনভাণ্ডার আমার।
ইত্যবসরে মারকুনীর সঙ্গীও এসে যায়। ইসমাইলের কাছে খঞ্জর আছে, যা দ্বারা তরবারীর মোকাবেলা করা যায় না। পার্শ্বেই একস্থানে একটা বর্শা। পড়ে আছে দেখতে পায় কুদুমী। মারকুনী ইসমাইলের উপর আঘাত হেনে চলেছে। ইসমাইল দক্ষতাবলে হাতের প্রদীপকে ঢাল বানিয়ে আক্রমণ প্রতিহত করে চলেছে। মারকুনীর সঙ্গীও তার সঙ্গে যোগ দেয়। ধনভাণ্ডার দেখে মাতাল হয়ে গেছে খৃস্টানদ্বয়। কুদুমী কী করছে, সেদিকে তাদের নজর নেই।
কুদুমী বর্শাটা কুড়িয়ে নেয়। অপেক্ষা করতে থাকে সুযোগের। একসময় মারকুনীর পিঠটা চলে আসে কুদুমীর সামনে। কুদুমী তার সর্বশক্তি ব্যয় করে হাতে বর্শাটা ছেদিয়ে দেয় মারকুনীর পাজরে। টেনে বের করে আঘাত হানে আবারো। মাটিতে লুটিয়ে পড়ে মারকুনী।
মারকুনীর সঙ্গী কুদুমীর উপর তরবারীর আঘাত হানতে উদ্যত হয়। এ সময় ইসমাইল খঞ্জরের আঘাত হানে তার উপর। লোকটির পাজর থেকে পেট পর্যন্ত ছিঁড়ে যায়। লুটিয়ে পড়ে সে-ও।
কুদুমী যে গুপ্তধনের ভাণ্ডার থেকে ভাগ নিতে এসেছিল, সঙ্গে নিয়ে আসা নিজের গলার হার, মূল্যবান আংটি ও নাক-কানের অলংকার সব সেখানে খুলে ছুঁড়ে ফেলে ইসমাইলের সঙ্গে বাইরে বেরিয়ে আসে। নির্মল বায়ু গায়ে লাগে কুদুমীর। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে সে। চলতে চলতে ইসমাইলকে বলে- বলতে পার, আমরা কোথা থেকে এসেছি? তুমি কি আমাকে চেন? বল তো আমি কে?
এসব প্রশ্ন তো আমারও- ইসমাইল বলল- আমরা অতীত জীবনের সব পাপ ভেতরে ছুঁড়ে ফেলে এসেছি।
এই বিজন পার্বত্য এলাকা থেকে বের হওয়ার পথ তাদের জানা আছে। তারা পাহাড়ী এলাকা থেকে বেরিয়ে আসে। অল্প কটি উট দাঁড়িয়ে আছে বাইরে। অন্যগুলো কোথায় গেছে, কি হয়েছে, কে বলবে। দুটি উটের পিঠে চড়ে বসে দুজন। কায়রো অভিমুখে রওনা হয় তারা।
***
পরদিন রাত দ্বিপ্রহর। গিয়াস বিলবীস ইসমাইল ও কুদুমীর মুখ থেকে ঘটনার ইতিবৃত্ত শুনে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর কথার তাৎপর্য এখন আমার বুঝে এসেছে। তিনি বলেছিলেন, এসব ধনভাণ্ডার থেকে তোমরা দূরে থাক।
গিয়াস বিলবীস নগরীর কোতোয়াল। ইসমাইল ও কুদুমী তাকে ভালভাবেই চিনত। তারা গুনাহের কাফফারা আদায় করতে চাচ্ছিল। পাহাড়ী এলাকা থেকে বের হয়ে তারা আহমার দরবেশের নিকট না গিয়ে সোজা চলে যায় গিয়াস বিলবীসের কাছে। কাহিনীর ইতিবৃত্ত শুনিয়ে তারা বলল, এই ঘটনার মূল নেপথ্য নায়ক আহমার দরবেশ।
গিয়াস বিলবীস সঙ্গে সঙ্গে আলী বিন সুফিয়ানকে ডেকে পাঠান। তাকে ঘটনা শুনান হল। আহমার সাধারণ কোন ব্যক্তি মন। তারা সুলতান আইউবীকে ঘুম থেকে ডেকে তোলেন এবং আহমার দরবেশকে গ্রেফতার করার অনুমতি প্রার্থনা করেন। সুলতান আইউবী অনুমতি প্রদান করেন। গিয়াস বিলবীস ও আলী বিন সুফিয়ান কয়েকজন সেনাসদস্য নিয়ে আহমার দরবেশের বাড়িতে হানা দেয়। সমস্ত ঘরে তল্লাশি নেয়া হয়। অন্য সবকিছুর মধ্যে হারিয়ে যাওয়া পুরনো সেই কাগজগুলোও পাওয়া গেল। আহমার দরবেশকে গ্রেফতার করা হল।
রাত পোহাবার সঙ্গে সঙ্গে আলী বিন সুফিয়ান ও গিয়াস বিলবীসের সঙ্গে এক প্লাটুন সৈন্য র্যামন্স-এর সমাধি অভিমুখে রওনা হয়ে যায়। সুলতান আইউবী নির্দেশ দেন, সমাধিটা আগে যেভাবে বন্ধ ছিল, ঠিক সেভাবেই বন্ধ করে রেখে আসবে। তিনি কাউকে ভেতরে ঢুকতে নিষেধ করে দেন। ইসমাইল তাদেরকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যায়।
সুলতান আইউবীর বাহিনী সমাধি এলাকায় গিয়ে উপনীত হয়। রক্তাক্ত এক কাহিনীর জীবন্ত এক গ্রন্থ যেন এলাকাটি। এখানে লাশ, ওখানে লাশ। এখানে রক্ত, ওখানে রক্ত। রক্তের ছোঁয়ায় ম্লান হয়ে গেছে এলাকার মনমুগ্ধকর সবুজের সমারোহ।
সুলতান আইউবীর সৈন্যরা সমাধির মুখটা পূর্বের ন্যায় সুবিশাল সেই পাথর দ্বারা বন্ধ করে দেয়। ফেরাউন রামন্স চোখের আড়ালে চলে যায় পুনর্বার। শুধু নতুন করে নিজের বুকে তুলে নেয় আরো দুটি পাপীর লাশ।
৩.৪ তিন গোয়েন্দা
তিন গোয়েন্দা
১১৭৪ খৃস্টবর্ষ মোতাবেক ৫৬৯ হিজরী ইসলামী দুনিয়ার জন্য কল্যাণকর প্রমাণিত হল না। বছরের শুরুতেই আলী বিন সুফিয়ান সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীকে সংবাদ শোনালেন যে, আক্ৰায় আপনার একজন গোয়েন্দা শহীদ হয়েছে এবং অপর একজন ধরা পড়েছে। এ সংবাদ নিয়ে এসেছিল তৃতীয় অন্য এক গুপ্তচর, যে এ দুজনের সঙ্গী ছিল। ফিরে আসা গোয়েন্দা অনেক মূল্যবান তথ্যও নিয়ে এসেছিল। কিন্তু এক গোয়েন্দার শাহাদাত ও একজনের গ্রেফতারী ব্যাকুল করে তোলে সুলতান আইউবীকে।
আলী বিন সুফিয়ান বুঝে ফেললেন যে, সুলতান মাত্রাতিরিক্ত অস্থির হয়ে পড়েছেন। আলী জানতেন, সুলতান আইউবী হাজারো সৈনিকের শাহাদাতবরণে কখনো অস্থিরতা কিংবা মনস্তাপ প্রকাশ করেন না। কিন্তু একজন কমান্ডো বা কোন গোয়েন্দার শাহাদাঁতের সংবাদ তাকে ব্যাকুল করে তোলে।
