সিঁড়িগুলোর উপরে এখানে-ওখানে ছড়িয়ে আছে মানব-মস্তিষ্কের খুলি ও কংকাল। ঢাল-বর্শাও পড়ে আছে সেগুলোর আশপাশে। এগুলো সমাধির পাহারাদারদের হাড়-কংকাল। প্রহরার জন্য তাদেরকে জীবন্ত ভেতরে দাঁড় করিয়ে রেখেই সমাধির মুখটা এভাবে ভারী পাথর দ্বারা সীল করে দেয়া হয়েছিল।
সিঁড়িগুলো তাদেরকে অনেক নীচে এক স্থানে নিয়ে যায়। এখানে একটি প্রশস্ত কক্ষ। এখানকার মাটি পাথুরে। অসংখ্য কারিগর দীর্ঘ সময় ব্যয় করে কক্ষটির দেয়াল ও ছাদ এমন নিপুণভাবে খোদাই করেছে, যেন এটি এই বিংশ শতাব্দীর আধুনিক মডেলের প্রাসাদ। অত্যন্ত আকর্ষণীয় একটি নৌকা স্থাপন করে রাখা আছে কক্ষটির এক জায়গায়। নৌকাটির মধ্যেও পড়ে আছে অনেকগুলো হাড়গোড়-কংকাল-খুলি। এরা ছিল এই নৌকার মাঝি-মাল্লা।
কারিগরদের নিপুণ হাতে খোদাইকরা একটি অন্ধকার পথ অন্য একটি কক্ষে নিয়ে যায় মারকুনী ও তার সঙ্গীদের। এই কক্ষে দাঁড়িয়ে আছে একটি সুসজ্জিত ঘোড়াগাড়ী। গাড়ীটির সম্মুখে আটটি ঘোড়ার বিক্ষিপ্ত কংকাল। সামনের আসনে মানব-হাড়ের স্তূপ। অন্যত্র পড়ে আছে আরো কয়েকটি মানব-কংকাল।
এই কক্ষ অতিক্রম করে আরো একটু অগ্রসর হওয়ার পর পাওয়া গেল আরো একটি কক্ষ, ঠিক যেন শীষমহল। কক্ষটির ছাদ বেশ উঁচু। কক্ষের একটি দেয়াল ঘেঁষে উপর দিকে উঠে গেছে কতক সিঁড়ি। সিঁড়ির উপর পাথর নির্মিত একটি চেয়ার। এই চেয়ারে বসে আছে র্যামন্স-এর একটি মূর্তি। মূর্তিটিও পাথরের তৈরি।
সিঁড়ির উপর ইতস্তত কতগুলো মানব-কংকাল ও খুলি ছড়িয়ে আছে এখানেও। একটি খুলির সঙ্গে একটি মুক্তার হার চোখে পড়ে কুদুমীর। নীল বর্ণের একটি হীরাও আছে সঙ্গে। পার্শ্বে পড়ে আছে মহিলাদের কানে ব্যবহার্য কয়েকটি সোনার অলংকার ও কয়েকটি আংটি। অন্যান্য কংকালের গায়েও অনুরূপ নানা ধরনের অলংকার দেখতে পায় কুদুমী।
মারকুনী একটি হার তুলে হাতে নেয়। দেড় হাজার বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরও হিরা ও মুক্তাগুলো এখনো ঝকঝক করছে। এতটুকুও মন্দা পড়েনি তাতে। প্রদীপের আলোয় হিরাগুলো নানা বর্ণের কিরণ ছড়াচ্ছে। মারকুনী হারটা কুদুমীর গলায় পরিয়ে দিতে উদ্যত হয়। কুদুমী চিৎকারকরে সরে ইসমাইলের পেছনে গিয়ে দাঁড়ায়। খিলখিল করে হাসি দিয়ে মারকুনী বলে, আমি বলেছিলাম না, তোমাকে আমি রানী ক্লিওপেট্রা বানিয়ে দেব। ভয় কর না কুদুমী। এসব হার-অলংকার তোমারই।
না- কেঁপে উঠে কুদুমী- না, আমি এসব খুলি ও হাড়-কংকালের মধ্যে আমার পরিণাম দেখতে পেয়েছি। এরাও আমারই ন্যায় রূপসী ছিল। এটা ঐ খোদার প্রিয়ার হার, যিনি এখানে কোথাও মৃত পড়ে আছেন। আমি সেই লোকদের আঞ্জাম দেখে ফেলেছি, অহংকার যাদেরকে খোদায় পরিণত করেছিল।
কুদুমী এতই ভয় পেয়ে যায় যে, সে ইসমাইলকে ধরে টানাটানি শুরু করে দিয়ে বলে, আমাকে তুমি এখান থেকে নিয়ে চল, নিয়ে যাও আমাকে এখান থেকে। আমি এখন কংকাল ছাড়া কিছুই নয়।
কুদুমীর গলায় একটি হার ছিল। হারটা খুলে সে সেটি একটি কংকালের উপর ছুঁড়ে মারে। হাতের আঙ্গুল থেকে মহামূল্যবান আংটিগুলো খুলে ফেলে দেয়। তারপর চিৎকার করে বলে ওঠে, আমি আমার পরিণতি দেখে ফেলেছি। ইসমাইল তুমি আমাকে এখান থেকে নিয়ে চল।
ইত্যবসরে মারকুনী অন্য একটি কক্ষে চলে যায়। এই সুযোগে কুদুমীকে আত্মসংবরণ করার পরামর্শ দিয়ে ইসমাইল বলল, এতকিছুর পর এ মুহূর্তে আমরা এখান থেকে চলে গেলে সমুদয় সম্পদ এই দুখৃস্টান তুলে নিয়ে যাবে।
আরো একটি পথ চোখে পড়ে ইসমাইলের। প্রদীপ তার হাতে। কুদুমীকে নিয়ে সেদিকে এগিয়ে যায় ইসমাইল। আরো একটি প্রশস্ত কক্ষে প্রবেশ করে তারা। কক্ষের মধ্যখানে একটি চবুতরায় একটি বাক্স রাখা আছে। বাক্সের ভেতর একটি মানুষের লাশ। লাশের মুখমণ্ডলের দিকটা ভোলা। এ-ই সেই ফেরাউন র্যামন্স দ্বিতীয়, যাকে মানুষ খোদা বলে বিশ্বাস করত ও সেজদা করত। লাশটা মমি করা। চেহারাটা সম্পূর্ণ অক্ষত। চোখ দুটো খোলা।
ইসমাইল র্যামন্স-এর মুখমণ্ডলের দিকে তাকিয়ে থাকে দীর্ঘক্ষণ পর্যন্ত। তাকায় কুদুমীও। তারপর চোখাচোখি করে দুজন।
এদিক-ওদিক চোখ বুলায় ইসমাইল ও কুদুমী। এখানেও হাড়ের কংকাল দেখতে পায় তারা। অত্যন্ত আকর্ষণীয় কয়েকটি বাক্সও দেখতে পায়। একটি বাক্সের ঢাকনা খোলা। বাক্সটার ভেতর উঁকি দিয়ে দেখে তারা। কতগুলো সোনার অলংকার, হিরা-জহরত পড়ে আছে তাতে। একটি মানুষের বাহুর হাড় ও একটি হাতের হান্ডিও ছড়িয়ে আছে তার মধ্যে। মাথার খুলি ও অন্যান্য হাড়-কংকাল পড়ে আছে বাইরে বাক্স সংলগ্ন।
হায়রে মানুষ!- দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ইসমাইল বলল- লোকটা মারা যাওয়ার আগে অলংকার হিরা-জহরত তুলে নেয়ার চেষ্টা করেছিল। তার আশা ছিল, সে এখান থেকে জীবন নিয়ে বেরিয়ে যেতে পারবে। কিন্তু তার আগেই লোকটা স্বর্ণালংকারেরই উপর মুখ থুবড়ে পড়ে মারা গেল! বৃদ্ধ ঠিকই বলেছিল যে, লালসা-ই মানুষের বড় শত্রু। ইসমাইল বাক্সটার প্রতি হাত বাড়িয়ে বলল, কুদুমী! তুমিও লোভে পড়েই এসেছ। আমি তোমাকে কিছু দিয়ে দেব।
না ইসমাইল!- ইসমাইলের বাক্সর প্রতি বাড়িয়ে দেয়া হাতটা ধরে ফিরিয়ে আনে কুদুমী- আমার লালসা মরে গেছে। কুদুমী মৃত্যুবরণ করেছে।
