তোমরা কি এখনো ফেরাউনদেরকে খোদা বলে বিশ্বাস কর? কুদুমী বৃদ্ধকে জিজ্ঞেস করে।
মানুষ বড় দুর্বল প্রাণী-বৃদ্ধ বলল- তারা নিত্য খোদা বদল করে থাকে। অনেক সময় মানুষ নিজেই খোদা সেজে বসে। এ মুহূর্তে আমার খোদা তোমরা। কারণ, আমার জীবন ও আমার কন্যাদের ইজ্জত এখন তোমাদের হাতে। এই ভেদ আমি তোমাদেরকে খোদা বিশ্বাস করে ফাঁস করেছি। কেননা, আমি মৃত্যুকে ভয় করি, আমার কন্যাদের সম্ভ্রমহানিকে ভয় করি। ফেরাউনও তোমাদেরই ন্যায় সেকালের জনগণের ঘাড়ে তরবারী রেখে বলেছিল, আমি খোদা! তখন নিরীহ মানুষমুলা বাধ্য হয়ে বলেছিল, হ্যাঁ, তুমিই আমাদের খোদা। ক্ষুধা-দারিদ্র মানুষকে বাস্তব জগত থেকে বহু দূরে নিয়ে নিক্ষেপ করে। মানুষের ভেতরকার মনুষ্যত্ব মরে যায়। আসল খোদা যাদেরকে আশরাফুল মাখলুকাত আখ্যা দিয়েছেন, তাদের দেহটাই শুধু রয়ে যায়। যার কারণে তখন পেটের জ্বালায় পড়ে মানুষ সেই মানুষের সামনে সেজদায় অবনত হয়ে পড়ে, যে তার জঠর জ্বালা ঠাণ্ডা করে। মানুষের এই দুর্বলতাই রাজার জন্ম দিয়েছে, ডাকাত-দস্যু সৃষ্টি করেছে, মানুষকে শাসক-শাসিত ও জালিম-মজলুমে পরিণত করেছে। হিরে-জহরত মানুষকে পাপী বানিয়েছে। এই যেমন ধর, (কুদুমীকে উদ্দেশ্য করে) তুমি কে? তুমি এদের কার স্ত্রী? এদের কাকে তুমি আপন বলতে পার? কুদুমী নর্তকী, তা জেনে ফেলেছে বৃদ্ধ।
বৃদ্ধের প্রশ্নে বিব্রত হয়ে পড়ে কুদুমী। নানা কারণে পূর্ব থেকেই মনটা তার বেচাইন। এবার যোগ হল নতুন মাত্রা। বৃদ্ধের প্রশ্ন ঘামিয়ে তুলল মেয়েটিকে। তাকে কিছু বলতে না দেখে বৃদ্ধ বলল, তুমি তোমার সুশ্রী চেহারা আর যৌবনের কারণে নিজেকে খোদা ভাবছ। আর তোমার খদ্দেররা তোমাকে ভাবছে খোদা। তোমরা আমাকে জংলী বা হিংস্র মনে কর না। আমার কাছে কাপড় আছে, যা মাঝে-মধ্যে পরিধান করে আমি কায়রো যাই, তোমাদের সভ্য জগতটা দেখি। তারপর ফিরে এসে খুলে ফেলি। তোমাদের জগতে আমি শাহজাহাদেরকে ঘোড়া গাড়ীতে চড়ে ভ্রমণ করতে দেখি। দেখি তোমার ন্যায় শাহজাদীদের। দেখি নর্তকী-গায়িকাদের। আর দেখি তাদেরকে, যারা ওদেরকে নাচায়-গাওয়ায়। আমি ফেরাউনদের আমলের অনেক কথা শুনেছি। আর এ-যুগের ফেরাউনদেরকেও দেখছি। আমি তাদের পরিণতিও দেখেছি। দেখতে পাচ্ছি তোমাদেরও পরিণতি, যা তোমরা নিজেরা দেখতে পাচ্ছ না। তোমরা সম্পদের লোভে এতগুলো নির্দোষ প্রাণীকে হত্যা করলে! এটা তোমাদের অপরাধ, যার শাস্তি থেকে তোমরা রেহাই পাবে না, যেমনটি রক্ষা পায়নি ফেরাউনরা। আমি আগামীদিন ভোরে তোমাদেরকে সমাধির ভেতরে নিয়ে যাব। তখন তোমরা ফেরাউনের পরিণতি দেখতে পাবে। র্যামন্স যদি খোদা হত, তাহলে তার এই পরিণতি হত না। খোদা তো তিনি, যিনি জগতের সবকিছুকে পরিণতি পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দেয়- নিজে পরিণতি ভোগ করে না। পাহাড়ের তলে কংকাল হয়ে পড়ে আছে যে মানুষটি, আমি তাকে কখনো খোদা বলে স্বীকার করিনি। আমি ও আমার গোত্র তাকে পাহারা দেই না। আমরা দুনিয়ার লোভ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য একটি বিশ্বাস স্থির করে নিয়েছি। আমরা সেই বিশ্বাসেরই রক্ষণাবেক্ষণ করছি শুধু।
থেমে থেমে কাঁপা কণ্ঠে কথা বলছে বৃদ্ধ। তার প্রতি বিমোহিতের ন্যায় অপলক তাকিয়ে আছে কুদুমী। বৃদ্ধের বক্তব্যে কুদুমী নিজের পরিণতি দেখতে পাচ্ছে। মারকুনীর মুখে অবজ্ঞার হাসি। লোকটা মদপান করছে। সে বৃদ্ধকে বলল, তুমি তোমার মহিলাদের নিকট চলে যাও। সকালে তাড়াতাড়ি ওঠে পড়বে। এসে আমাদেরকে ভেতরে নিয়ে যাবে।
বৃদ্ধ চলে যায়। মারকুনী কুদুমীকে বলে, চল, আমরা শুয়ে পড়ি।
আমি তোমার সঙ্গে যাব না। মারকুনীকে সঙ্গ দিতে অস্বীকৃতি জানায় কুদুমী।
মারকুনী কুদুমীর প্রতি গা এলিয়ে দেয়। কুদুমী সরে যায় পেছন দিকে। মারকুনী মেয়েটিকে ধমক দেয়। ইসমাইল দুজনের মাঝে এসে দাঁড়ায়। কিছু না বলে মারকুনীর চোখে চোখ রাখে সে। মারকুনী পেছনে সরে যায়। কেটে পড়ে ধীরে ধীরে। ইসমাইলের বুকে মাথা গুজিয়ে শিশুর ন্যায় কাঁদতে শুরু করে কুদুমী।
***
ভোরে ঘুম থেকে জাগ্রত হয় মারকুনী। বৃদ্ধকে খোঁজ করে। পাওয়া গেল। পাওয়া গেল না মহিলাদেরকেও। ডাকাডাকি করা হল, এদিকে-ওদিক ঘুরে দেখা হল। কিন্তু নেই- একজনও নেই। তবে মারকুনী তাদের তেমন প্রয়োজনও অনুভব করছে না। র্যামন্স-এর সমাধির মুখ তো এখন উন্মুক্ত। ভেতরে কোথায় কি আছে, বৃদ্ধ তার জানেই বা কি।
মারকুনী ইসমাইল, কুদুমী ও অপর সঙ্গীদের নিয়ে সেই পাথরের উপরের উঠে যায়, সেখানে সমাধির ভেতরে প্রবেশ করার পথ। মারকুনী ভেতরে নেমে পড়ে।
সুপ্রশস্ত এক গর্ত, যা সুড়ঙ্গের রূপ ধারণ করে চলে গেছে একদিকে। মারকুনীর হাতে প্রদীপ। কিছুদূর গিয়ে সুড়ঙ্গ বন্ধ হয়ে গেছে। সুড়ঙ্গের প্রান্তসীমায় কোদালের আঘাত হানে সে। আঘাত খেয়ে এমন এক শব্দের সৃষ্টি হয়, যেন পেছনের জায়গাটা ফোলা। এটি পাথরের দরজা। উপর্যুপরি আঘাত করা হয় তাতে। এক কিনারা দিয়ে ভেঙ্গে যায় দরজা। ফঁক দিয়ে ভেতরের খোলা জায়গা চোখে পড়ে মারকুনীর। আরো পিটিয়ে দরজাটা সম্পূর্ণ ভেঙ্গে সরিয়ে ফেলা হয়। ভেতর থেকে পনের-ষোলশ বছরের পুরনো দুর্গন্ধ বেরিয়ে আসে। অসহনীয় উৎকট দুর্গন্ধে সবাই পেছন দিকে সরে যায়। নাকে মুখে কাপড় চেপে ধরে সবাই। কিছুক্ষণ পর আবার তারা অগ্রসর হয়। প্রদীপ হাতে ভেতরে ঢুকে পড়ে। কয়েক পা সম্মুখে এগিয়ে গিয়ে কয়েকটি সিঁড়ি নেমে গেছে নীচের দিকে।
