এখন বলুন, এই পাথরটা এখান থেকে সরাতে পারি কিভাবে? জিজ্ঞেস করে মারকুনী।
তোমার কি চোখ নেই? বৃদ্ধ জবাব দেয়- তোমার কি বিবেক নেই? পাথরের ঐ চূড়াটা দেখ, তার সঙ্গে কি রশি বাঁধতে পার না? তোমার লোকদের গায়ে যদি শক্তি থাকে, তাহলে সবাই মিলে রশিটা টান। তাতে হয়ত পাথরটা নীচে নেমে আসতে পারে।
মারকুনীর আর তর সইছে না। যত তাড়াতাড়ি সমাধির মুখটা উন্মুক্ত করে ফেলতে চাইছে। নিজের লোকদের ডাক দেয় সে। সঙ্গে নিয়ে আসা সরঞ্জামাদির মধ্যে রশিও আছে। মোটা একটা রশি হাতে নেয়। একজনকে উপরে উঠিয়ে রশির এক মাথা পাথরের চূড়ার সঙ্গে বাঁধতে বলে। তারপর রশির অন্য মাথায় ধরে নীচ থেকে টান দেয়ান জন্য সবাইকে নির্দেশ দেয়। নিজে উঠে যায় উপরে। নীচ থেকে সবাই সর্বশক্তি ব্যয় করে রশি ধরে হেইয়ো বলে টান দেয়। মারকুনী দেখতে পায়, রশির টানের সঙ্গে পাথরটা দুলছে। একবার এতটাই নড়ে উঠে, যে, তার ফাঁক দিয়ে মারকুনী সমাধির ভেতরটা দেখে ফেলে। মনোবল বেড়ে যায় তার। ধ্বনি দিতে শুরু করে সে। এবার আরো জোরে টান মারে তার লোকেরা। স্থান থেকে পাথরটা অনেকটা সরে যায়। মারকুনী তার সঙ্গীদের বিশ্রাম নিতে বলে। সূর্য কালো পাহাড়ের পেছনে চলে গেছে। সঙ্গে করে মদ নিয়ে এসেছিল মারকুনী। তার নির্দেশে মদ হাজির করে একজন। মারকুনী বলল, পান কর, শক্তি সঞ্চয় করে পাথরটাকে কংকরের ন্যায় নীচে ফেলে দাও।
সবাই মদের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে। মারকুনী ঘোষণা দেয়, আজ রাতে আমি তোমাদেরকে দুটি উট রান্না করে খাওয়াব।
অল্পক্ষণের মধ্যেই সকলের ক্লান্তি দূর হয়ে যায়। নতুন উদ্যম সৃষ্টি হয় সকলের মাঝে।
ইতিমধ্যে পশ্চিম দিগন্তেরও নীচে চলে গেছে সূর্য। অন্ধকার ছেয়ে যাওয়ার আগেই কয়েকটি প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখা হয়। সকলে রশি ধরে আরেকবার শক্তির পরীক্ষা দিতে শুরু করে।
মারকুনী উপরে দাঁড়িয়ে আছে। প্রদীপের কম্পমান আলোতে পাথরের উপরিভাগ সম্মুখে ঝুঁকে সরে যেতে দেখতে পায় সে। পূর্বাপেক্ষা আরো জোরে ধ্বনি তোলে সে- আনন্দ ধ্বনি। হঠাৎ ভয়ংকর এক শব্দ তুলে পাথরটা গড়িয়ে পড়ে এবং উল্টে নীচে পড়ে যায়। মারকুনীর লোকেরা যেখানে দাঁড়িয়ে আছে, সে জায়গাটা অপ্রশস্ত। তার পেছনেও বড় একটি পাথর। উপর থেকে পাথরটা এত তীব্রবেগে পড়ে যে, নীচ থেকে লোকগুলো সরবার সুযোগ পায়নি। নীচে আলোও কম। পাহাড় ও পাথরে ঘেরা এই জগতটা কয়েকটি সমস্বর চিৎকার ধ্বনিতে কেঁপে উঠেই আবার নীরব হয়ে যায়। মারকুনী হন্তদন্ত হয়ে নীচে নেমে আসে। একটি বাতি হাতে নিয়ে দেখে পতিত পাথরের নীচ থেকে রক্ত বইছে। কারো হাত দেখা যাচ্ছে, কারো পা, কারো মাথা। মস্তবড় পাথরটার চাপা খেয়ে থেতলে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেছে প্রত্যেকের দেহ।
মারকুনী কারো দৌড়ানোর শব্দ শুনতে পায়। ভাবে, কে যেন বেঁচে গেছে, সে-ই পালাচ্ছে। কান খাড়া করে এদিক-ওদিক তাকায় সে। নজর পড়ে পার্শ্বে অবস্থিত পাথরটির উপর। তার উপর চারজন লোক দাঁড়িয়ে। আবছা অন্ধকার। লোকগুলো কারা চেনা যাচ্ছে না। মারকুনী ধীরপায়ে গম্ভীর মুখে পাথরটির দিকে এগিয়ে যায়। একটি বাতি হাতে নিয়ে নিরীক্ষা করে দেখে। একজন বৃদ্ধ। অপরজন ইসমাইল। তৃতীয়জন মারকুনীর অন্য এক সঙ্গী। চতুর্থজন কুদুমী। কুদুমী যেন আপাদমস্ত ভীতির মূর্তপ্রতীক। এ মুহূর্তে একটি নিশ্চল পাথর যেন মেয়েটা। অন্যরাও সবাই নীরব-নিস্তব্ধ। ঘটনার আকস্মিকতায় থ খেয়ে আছে সবাই।
সবার আগে মুখ খুলে বৃদ্ধ। বলে, আমি তোমাকে সাবধান করেছিলাম যে, আমি তোমার চোখের মধ্যে মৃত্যু দেখতে পাচ্ছি। আমি আমার কর্তব্য বিসর্জন দিয়ে তোমাকে ভেদ বলে দিয়েছি। আমি জানতাম, এই ভেদ তোমার জন্য মৃত্যুর পরোয়ানা আর মৃত্যুই আমার কর্তব্য পালন করে দেবে। যা হোক, এখন কি তুমি ফিরে যাবে?
না- ক্ষীণ কণ্ঠে মারকুনী জবাব দেয়। আমি আমার মিশন সম্পন্ন করব; এই সঙ্গীরা আমার সাহায্য করবে। বলেই মারকুনী তার সঙ্গীদের জিজ্ঞেস করে, মনে হচ্ছে কে যেন রক্ষা পেয়ে পালিয়েছে। কে পালাল?
আমাকে জিজ্ঞেস কর- বৃদ্ধ বলল- তোমার চারজন লোক আমার দুব্যক্তির সঙ্গে পালিয়ে গেছে। কিন্তু আমার লোকেরা তাদেরকে বের হওয়ার পথ দেখাবে না। তাদেরকে ভেতরেই পথ হারিয়ে মরতে হবে। ভাল হত, যদি তারা অন্যদের সঙ্গে পাথরের নীচে এসে জীবন দিত। এ মৃত্যু সহজ ছিল। যা হোক, আজ রাতের জন্য কাজ বন্ধ করে দাও; আমি সকালে তোমাদেরকে ভেতরে নিয়ে যাব।
***
মারকুনীর মনে এই দুর্ঘটনার কোন প্রতিক্রিয়া পরিলক্ষিত হচ্ছে না। যেন কিছুই ঘটেনি। বৃদ্ধকে নিজের সঙ্গে বসিয়ে খানা খাওয়ায় মারকুনী। ইসমাইল বৃদ্ধকে একটি চাদর প্রদান করে। বৃদ্ধ চাদরটি গায়ে জড়িয়ে নেয়। কুদুমীর মুখে রা নেই।
তোমরা আমার এক সঙ্গীকে খেয়েছিলে- বৃদ্ধকে উদ্দেশ্য করে মারকুনী বলল- তার আগে কত মানুষ খেয়েছ?
যত পেয়েছি- বৃদ্ধ জবাব দেয়। আমাদের বংশধারায় নরমাংস খাওয়ার প্রচলন কবে থেকে শুরু হয়েছে, তা আমি বলতে পারব না। যে ইতিহাস আমার কানে দেয়া হয়েছে, তাতে পনেরশ বছরের আগের একটি ভবিষ্যদ্বাণীও আছে। কেউ বলেছিল, যারা খোদা রামন্স-এর সমাধির রক্ষণাবেক্ষণ করবে, বিজন পার্বত্য এলাকা তাদেরকে নিজের শীতল কোলে আগলে রাখবে, তারা পানি ও ছায়া থেকে বঞ্চিত হবে না, তারা দুনিয়ার মোহ, সোনা-রূপা ও মদ-নারীর মোহ থেকে মুক্ত থাকবে। ফলে তাদের শরীর আবৃত করার প্রয়োজন পড়বে না। তাদের অন্তরে পরস্পর ভালবাসা থাকবে। তাদের মধ্যে কোন লালসা থাকবে না। লালসাই মানুষকে খুনী, ডাকাত ও অসাধুতে পরিণত করে। মানুষ কখনো সম্পদের লালসার শিকার হয়, কখনো নারীর। লোভী মানুষের দ্বীন-ধর্ম, নীতি-নৈতিকতা বলতে কিছু থাকে না। লালসাই সব অনিষ্টের মূল। আমাদেরকে এই লালসার অভিশাপ থেকে মুক্ত করে দেয়া হয়েছে এবং বলা হয়েছে, একটি সময় আসবে, যখন রামন্স-এর রক্ষণাবেক্ষণকারীরা নরমাংস ভক্ষণ করবে। তারা এখান থেকে বাইরে বের হবে, মানুষ শিকার করে আনবে। কোন পশু পেলেও খেয়ে ফেলবে। অন্যথায় তাদের বংশধারা নিঃশেষ হয়ে যাবে।
