মারকুনী অনুভব করল, লোকটা বড় পাকা। এ মুহূর্তে তাকে শত্রুতে পরিণত করা ঠিক হবে না। ইসমাইলের কাঁধে হাত রেখে এবং মুখে বন্ধুসুলভ হাসি টেনে বলল, তুমি অহেতুক ভুল বুঝাবুঝির শিকার হয়েছ। আসল কথা হল, আমি চাই না যে, এই বেশ্যা মেয়েটা তোমার আমার কারো মস্তিষ্কে জেঁকে বসুক। ও বড় চতুর মেয়ে। আমাদের দুজনের মধ্যে ভুল বুঝাবুঝি সৃষ্টি করে সব গুপ্তধন হাতিয়ে নেয়ার বুদ্ধি আঁটছে। তুমি আমাকে শত্রু মনে কর না। আহমার দরবেশ কি তোমাকে বলেননি যে, তিনি তোমার ব্যাপারে কী ভাবছেন?
গুপ্তধন পেয়ে যাব আশা করা যায় কি? জিজ্ঞেস করে ইসমাইল।
পেয়ে গেছি- মারকুনী জবাব দেয়- আমি তোমাদের দুজনকে নিতে এসেছি।
ইসমাইল গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে মারকুনীর প্রতি। তাকিয়ে আছে কুদুমীও। মনটা তার ক্ষুণ্ণ স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে। উট দেখাশোনা করার জন্য রেখে যাওয়া লোকটাকে ডাক দেয় মারকুনী। লোকটা ছুটে আসে। মারকুনী উটগুলোকে একটার পেছনে একটা বেঁধে নেয়ার নির্দেশ দেয় তাকে। গুটিয়ে নেয়া হয় তাঁবু দুটোও।
ইসমাইল ও কুদুমীকে নিয়ে আসে মারকুনী। মনোরম সবুজ-শ্যামল জায়গা দেখে, বিমুগ্ধ হয়ে পড়ে কুদুমী। উঁচু একটি পাহাড়ের পাদদেশে ছোট্ট একটি ঝিল। পাহাড়ের নীচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে পানি। দেখে মনটা ভরে যায় কুদুমীর।
মারকুনী গোত্রের উলঙ্গ বৃদ্ধ নেতার কাছে চলে যায়। কুদুমী ইসমাইলের সঙ্গে এদিক-ওদিক ঘুরতে শুরু করে। হঠাৎ ছোট্ট একটি শিশুর লাশ চোখে পড়ে কুদুমীর। শিশুটি উলঙ্গ। সারা গায়ে রক্ত- যেন রক্ত দিয়ে গোসল করেছে বাচ্চাটা। ভয়ে আঁৎকে উঠে মেয়েটি। সর্বাঙ্গ কাটা দিয়ে উঠে তার।
দুজন এগিয়ে যায় আরো সামনে। এবার এক স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে দুটি লাশ। এগুলো বয়স্ক মানুষের মৃতদেহ। উভয় লাশের গায়ে তীরবিদ্ধ। কুদুমীর ভয় আরো বেড়ে যায়। কাঁপতে শুরু করে সে।
দুজন এগিয়ে যায় আরো সম্মুখে- যেখান দিয়ে মারকুনীর লোকেরা উপর থেকে নীচে নেমেছিল সেখানে। খোলামেলা জায়গা। এখানে পড়ে আছে আরো কয়েকটি লাশ। পাঁচ-ছয়টি শিশুর লাশ। অন্যগুলো বড়দের। সবগুলো লাশের মুখ ও চোখ খোলা। গায়ে নির্যাতনের ভয়ানক আলামত। মিসরের রূপসী কন্যা কুদুমী এমন বীভৎস দৃশ্য স্বপ্নেও দেখেনি কখনো। ছোট একটি শিশুর লাশ দেখে ভয়ে চিৎকার করে উঠে সে।
মারকুনীর তিন-চারজন লোক চিৎকার শুনে দৌড়ে আসে। কুদুমী মাথা চক্কর খেয়ে লুটিয়ে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। ইসমাইল তাকে আগলে ধরে। মারকুনীর লোকদেরকে অবহিত করা হয় যে, মেয়েটি লাশ দেখে ভয় পেয়েছে। একজন পানি আনতে ছুটে যায়। কুদুমী অল্প সময়ের মধ্যেই সম্বিৎ ফিরে পায়। নিজেকে সামলে নিয়ে জিজ্ঞেস করে, এই লাশগুলো কাদের? এদেরকে হত্যা করা হল কেন?
ইসমাইলের ঘটনা জানা ছিল না। মারকুনীর এক লোক কুদুমীর প্রশ্নের জবাব দেয়। কুদুমী ইসমাইলের প্রতি তাকায়। পীতবর্ণ ধারণ করেছে তার মুখের রং। ইসমাইল বলল, এই লোকগুলো আমাদের চেয়ে ভাল। এরা গুপ্তধন পাহারা দিত। এরা মানুষ খেত, পোশাক পরত না ঠিক; কিন্তু আমানতদার ছিল। এরা যদি ফেরাউনের সমাধি খুঁড়ে ধনভাণ্ডার তুলে নিয়ে যেত, তাহলে কে ঠেকাত? আর আমরা? আমরা দস্যু, খুনী। অথচ আমরা নিজেদেরকে সভ্য দাবি করি। এসব মারকুনীর কারসাজি।
আমি সেই সম্পদ থেকে কিছুই নেব না, যার জন্য এই নিষ্পাপ শিশু ও নিরপরাধ লোকগুলোকে এমন নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে- কুদুমী বলল এদের কাছে কোন অস্ত্র দেখতে পাচ্ছি না। এরা নিরস্ত্র ছিল।
বৃদ্ধকে নিয়ে একটি পাথরখণ্ডের পেছনে চলে গেছে মারকুনী। বৃদ্ধ তাকে বলল, উপরে উঠে পড়; সেখানে ঐ যে বড় একটা পাথর দেখা যাচ্ছে, যদি তুমি পাথরটা সেখান থেকে সরাতে পার, তাহলে তুমি সেই জগতের দরজা দেখতে পাবে, যেখানে রামন্স-এর লাশের বাক্স ও তার ধনভাণ্ডার রাখা আছে। পাথরটা যেদিন এখানে স্থাপন করা হয়েছিল, সেদিন থেকে আজ পর্যন্ত কেউ তা নাড়ায়নি। পনেরশ বছর যাবত এই পাথরকে কেউ স্পর্শও করতে পারেনি। আমরা পনেরশ বছর পর্যন্ত এর রক্ষণাবেক্ষণ করছি। আমি তোমাকে রামন্স-এর মৃত্যুর কাহিনী এমনভাবে শোনাতে পারব, যেন তিনি এই গতকাল আমার চোখের সামনে মারা গেছেন। এই কাহিনী আমাকে আমার বাপ-দাদারা শুনিয়েছেন। দাদাকে শুনিয়েছেন, তার বাপ-দাদা। আমি আমার গোত্রের সব মানুষকে সেই কাহিনী শুনিয়েছি।
তোমার এসব কথা আমি পরে শুনব- বলেই মারকুনী পাথরটির উপর উঠে যায়। তার চেহারায় অস্থিরতার ছাপ। আর বিলম্ব সইছে না যেন তার। উপরের পাথরটা আলাদা স্থাপন করা কিংবা সেটি সরানো সম্ভব, তা তার বিশ্বাসই হচ্ছে না। এদিক-ওদিক খুটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে মারকুনী। কিন্তু পাথরটা যে আলাদা, তার কোন চিহ্ন পাওয়া গেল না। নীচে নেমে আসে মারকুনী।
আমি জানি, তুমি বিশ্বাস করবে না যে, এই পাথরটির দুটি অংশ আছে বৃদ্ধ বলল- উপরের যে অংশটি পেছনের পাহাড়ের সঙ্গে মিলিত, সেটি পাহাড়েরই অংশ বলে মনে হয়। কিন্তু বাস্তব তা নয়। এটি মানুষের হাতের কৃতিত্ব। এর গাঁথুনী কুদরতী বলে মনে হলেও মূলত এটি মানুষেরই কারিগরী। র্যামন্স নিজের তত্ত্বাবধানে এটি তৈরি করিয়েছেন। তার নীচে এবং পাহাড়ের বুকে যে জগত বিদ্যমান, তাও র্যামন্স তার জীবদ্দশায় তৈরি করিয়েছেন এবং বাইরের জগতের মানুষ থেকে কেয়ামত পর্যন্ত গোপন রাখার জন্য এই পাথর ও তার সমাধি তৈরি করিয়ে কারীগরদের বন্দী করে রাখেন। মৃত্যুবরণ করার পর তার লাশের বাক্স এই সমাধিতে রাখা হয়। একজন জীবন্ত মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় আসবাবপত্রও তাতে রাখা হয়। তারপর কারিগরদের বন্দীশালা থেকে বের করে এনে তাদের দ্বারা উপরে পাথরটা স্থাপন করিয়ে তাদেরকে মেরে ফেলা হয়। তারপর এখানকার বিভিন্ন গুহায় বারজন লোককে বাস করতে দেয়া হয়। তাদের মিসরের বারটি সুন্দরী নারী দেয়া হয়। তাদের দায়িত্ব এ এলাকার পাহারাদারী করা। আজ তুমি যাদেরকে হত্যা করেছ এবং এখনো যারা এখানে জীবিত আছে, তারা সবাই সেই বার দম্পতিরই বংশধর।
