ঠিক আছে, আমি তোমাকে ওয়াদা দিচ্ছি। তুমি আমাকে র্যামন্স-এর সমাধিটা দেখিয়ে দাও- মারকুনী বলল- আমি তোমাদের ইজ্জতের উপর হাত দেব না।
দস্যুর ওয়াদা বিশ্বাস করা যায় না- বৃদ্ধের দুঠোঁটে অবজ্ঞার হাসি যাদের অন্তরে লোভ থাকে, তাদের চোখে লজ্জা থাকে না। তারা যে মুখে ওয়াদা করে, সে মুখেই তা ভঙ্গ করে। তুমি তো সেই জগতের মানুষ, যেখানে সম্পদের জন্য নারীকে বলি দেয়া হয়। আর শোন দোস্ত! তুমি মিসরী নও। আমি তোমার চোখে নীল নদের পানি নয় সমুদ্রের চমক দেখতে পাচ্ছি। আমি তোমার দেহ থেকে সমুদ্রের ওপারের ঘ্রাণ পাচ্ছি, মিসরের নয়।
আমি র্যামন্স-এর সমাধির সন্ধানে এসেছি- ক্ষুব্ধ কণ্ঠে মারকুনী বলল বেশী কথা না বলে তুমি আমাকে সমাধিটা দেখিয়ে দাও।
তা দেখিয়ে দেব- বৃদ্ধ জবাব দেয়। তার আগে আমি তোমাকে একথা অবহিত করা জরুরী মনে করছি যে, সমাধির ভেতরে গিয়ে তোমরা জীবিত বের হয়ে আসতে পারবে না।
কেন, তোমার সৈনিকরা কি ভেতরে লুকিয়ে আছে যে, ওরা আমাদেরকে হত্যা করে ফেলবে? মারকুনী জিজ্ঞেস করে।
না- বৃদ্ধ জবাব দেয়- তোমাদেরকে হত্যা করার মত আমার কাছে কোন সৈন্য নেই। তোমার লোকেরাই তোমাকে হত্যা করে ফেলবে। তারপর তোমার লাশটা ওখান থেকে কেউ তুলেও আনবে না।
তুমি কি গায়েব জান?- মারকুনী জিজ্ঞেস করে- যে তুমি ভবিষ্যতের সংবাদ বলতে পার?
না- বৃদ্ধ জবাব দেয়- আমি অতীত দেখেছি। আর যে অতীতকে বিবেক ও অন্তরের চোখে দেখেছে, সে তার উপর ভিত্তি করে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে। আমি দেখতে পাচ্ছি, মৃত্যু তোমার দুচোখে এসে বসেছে।
মারকুনী খিলখিল করে হেসে ফেলে। বলে- বুড়ো! তুমি জংলী মানুষ। ওসব প্যাচাল বাদ দিয়ে বল, সমাধিটা কোথায়?
তোমার সামনে- বৃদ্ধ জবাব দেয়- ঐ তো উপরে। আমার সঙ্গে এস।
মারকুনী কি যেন চিন্তা করে। তারপর সঙ্গীদের বলে, এই মেয়েগুলোকে সসম্মানে রাখ। বৃদ্ধের সঙ্গে গল্প কর। ঐ লোক দুটোর সঙ্গেও দুর্ব্যবহার কর না। আমি কুদুমী ও ইসমাইলকে নিয়ে আসি।
মারকুনী নতুন আবিষ্কৃত সোজা পথে বেরিয়ে যায়।
***
বৃদ্ধের দেখান পথে বাইরে বেরিয়ে আসে মারকুনী। মিসর থেকে এসে কোন্ পথে এই ভয়ানক বিজন এলাকায় প্রবেশ করেছিল, তা মনে আছে তার। কুদুমী ও ইসমাইলকে কোথায় রেখে এসেছে, তাও আন্দাজ করতে পারছে সে। বের হয়ে সেদিকে ছুটে চলে মারকুনী।
অন্তত দুমাইল পথ অতিক্রম করে গন্তব্যে পৌঁছে যায় মারকুনী। মনে আনন্দের সীমা নেই তার। এখন সে যেখানে দাঁড়িয়ে, এখানেই ইসমাইল ও কুদুমীকে রেখে সে ভেতরে প্রবেশ করেছিল। কিন্তু একটি দৃশ্য দেখে হঠাৎ মারকুনীর মনের আনন্দ উবে যায়। বদলে যায় চেহারার রং। কুদুমী ও ইসমাইল একই তাঁবুতে একত্রিত বসা। এ দৃশ্য সহ্য হল না মারকুনীর। প্রচণ্ড ক্ষোভ ঝরে পড়ে ইসমাইলের প্রতি। বলে, আমি না তোমাকে বলেছিলাম, নিজের মর্যাদা রক্ষা করে থাকবে! ওর পাশে বসে তুমি কী করছ?
এই বিজন এলাকায় আমি একা বসে থাকব?- কুদুমী বলল- ও আসেনি, আমি নিজেই ওকে ডেকে এনেছি। ওর দোষ নেই।
আমি তোমাকে সঙ্গে করে শুধু এবং শুধুই নিজের জন্য এনেছি- ক্ষুব্ধ কণ্ঠে মারকুনী বলল- আমি তোমাকে বিনিময় দিয়েছি। কাজেই তোমাকে আমি অন্য পুরুষের সঙ্গে দেখতে চাই না, দেখতে পারি না। নিজের ঘরে শত পুরুষকে ডেকে আনতে পার; কিন্তু এখানে তুমি আমার কেনা দাসী।
গত রাতে ইসমাইল নিষ্ঠমনে কুদুমীর হৃদয়ে এমন ধারণা সৃষ্টি করেছিল, যা তার অন্তরে মারকুনীর বিরুদ্ধে সন্দেহ ও বিরাগের জন্ম দেয়। যার ফলে কুদুমী মারকুনীকে নিজের একজন খদ্দের ভাবতে শুরু করেছে। এবার মারকুনী যখন তাকে ক্রীতদাসী বলে অভিহিত করে বসল, তখন তার অন্তরে মারকুনীর প্রতি প্রচণ্ড ঘৃণা সৃষ্টি হয়ে গেল। কুদুমী ভাল ও মন্দ মানুষের পার্থক্য বুঝতে শুরু করেছে। অথচ ইসমাইল তাকে ঘুণাক্ষরেও বলেনি যে, আমি ভালমানুষ। বরং সে বলেছিল, আমি ভাড়াটিয়া অপরাধী, ভাড়াটিয়া খুনী।
কুদুমী মারকুনীকে তাড়িয়ে দিতে পারে না। কারণ, সে চুক্তিবদ্ধ। পাওনাটা বুঝে নিয়েই তবে এখানে এসেছে সে। ভবিষ্যতে গুপ্তধনের ভাগ পাওয়ারও কথা আছে। অবশ্য এখন তা সংশয়পূর্ণ মারকুনী ইসমাইলের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করবে, কুদুমী তা সহ্য করতে পারে না।
ইসমাইল কোন কথা বলছে না। অপলক নেত্রে তাকিয়ে আছে মারকুনীর প্রতি। কিছুক্ষণ পর উঠে মারকুনীর বাহু ধরে তুলে সামান্য আড়ালে নিয়ে গিয়ে ক্ষীণ কণ্ঠে বলল, আহমার দরবেশ বৈধ হয় তোমাকে আমার সম্পর্কে কিছু বলেনি! তুমি আমার সম্পর্কে কিছুই জান না। আমি তোমাকে ভালভাবেই জানি। তুমি আমার দেশ ও জাতির মূলোৎপাটন করতে এসেছ। আর আমি এত জঘন্য পাপী যে, ভাড়ায় তোমার সঙ্গ দিচ্ছি। তোমাকে আমি আমার রাজা স্বীকার করতে পারি না। আমি আমার পারিশ্রমিক কড়ায়-গণ্ডায় উসুল করব আর গুপ্তধন উদ্ধার হলে তার থেকেও উপযুক্ত ভাগ নেব।
তুমি এসব কথা আহমার দরবেশের কাছে বল গিয়ে- মারকুনী একজন সেনা কমান্ডারের ন্যায় বলল- এখানে তুমি আমার অধীন। গুপ্তধন যা উদ্ধার হবে, সব আমার নিয়ন্ত্রণে থাকবে। আমি যেখানে ইচ্ছা নিয়ে যাব।
শোন সুলায়মান সেকান্দার!- ইসমাইল পূর্বের ন্যায় ক্ষীণ ও হাসিমাখা কণ্ঠে বলল- আমি জানি, তুমি মারকুনী- সুলায়মান সেকান্দার নও। আমি একজন পেশাদার অপরাধী। তোমাকে আমি সাবধান করে দিচ্ছি যে, তোমার এসব কথা আমাকে অপরাধী থেকে মিসরী মুসলমানে পরিণত করবে। আমি তোমাকে আরো হুঁশিয়ার করে দিতে চাই যে, মুসলমান জাতীয় চেতনায় এতই অন্ধ যে, যদি কোন মুসলমানের লাশের মধ্যেও এই চেতনা জেগে ওঠে, তাহলে সেও উঠে দাঁড়িয়ে যায়। আমাকে তুমি অপরাধীই থাকতে দাও, তাতেই তোমার মঙ্গল।
