এটি গুহা নয়- সুড়ঙ্গপথ। হতে পারে প্রাকৃতিক, কিংবা কোন ফেরাউনের তৈরি। কয়েকটি মোড় আছে সুড়ঙ্গটির। ভেতরে ঘুটঘুঁটে অন্ধকার। সম্মুখে কথা বলার শব্দ কানে আসছে তার। মারকুনী এগিয়ে যায় সামনের দিকে। বেশ কিছুদূর অগ্রসর হওয়ার পর একস্থানে আলো চোখে পড়ে। সেই আলোতে তিনজন মানুষকে দৌড়াচ্ছে দেখে সে। এটি সুড়ঙ্গের অপর মুখ। লোকগুলোকে হত্যা করতে চাইছে না মারকুনী। মিশন তার সফল হতে চলেছে।
ভেতর থেকে বেরিয়ে যায় পলায়নপর লোক তিনজন। বেরিয়ে পড়ে মারকুনীও। দৌড়াতে গিয়ে হোঁচট খেয়ে পড়ে যায় একজন। কাছে গিয়ে দেখে মারকুনী। একজন বৃদ্ধ, আগেরবার তার সঙ্গী নীচে পড়ে যাওয়ার পর যাকে দেখেছিল, সে।
সুড়ঙ্গের বাইরে বালুকাময় ও পাথুরে টিলা, বড় বড় পাথরখণ্ড। একদিকে কালো পাহাড় উপরে চলে গেছে অনেক দূর পর্যন্ত। মারকুনী বৃদ্ধকে হাতে ধরে তুলে দাঁড় করায়। তাকে তার পলায়নপর সঙ্গীদ্বয়কে ফিরিয়ে আনতে বলে ইঙ্গিতে।
মারকুনীর ইঙ্গিত বুঝে ফেলে বৃদ্ধ। ডাক দেয় সঙ্গীদের। তারা দাঁড়িয়ে যায়। বৃদ্ধ তাদেরকে ফিরে আসতে বলে। তারা ফিরে আসে।
বৃদ্ধ মারকুনীর সঙ্গে মিসরী ভাষায় কথা বলে। সে বলল, আমি তোমার ভাষা বুঝি ও বলতে পারি। আমাকে খুন করে তুমি কিছুই পাবে না।
মারকুনীও মিসরী ভাষা জানে। সে বৃদ্ধকে বলল, আমি তোমাকে হত্যা করতে চাই না। তোমার সঙ্গীদেরও খুন করব না। আমাকে এখান থেকে বের হওয়ার পথটা দেখিয়ে দাও।
তুমি কি এখান থেকে বের হতে চাও? জিজ্ঞেস করে বৃদ্ধ।
হ্যাঁ- মারকুনী জবাব দেয়- আমি তোমাদের রাজত্ব থেকে বেরিয়ে যেতে চাই।
বৃদ্ধ তার সঙ্গীদেরকে কি যেন বলল। তারা অত্যন্ত ভীত-সন্ত্রস্ত। বৃদ্ধ মারকুনীকে বলল, এদের সঙ্গে যাও, এরা তোমাকে সোজাপথ দেখিয়ে দেবে।
তুমিও সঙ্গে চল- মারকুনী বলল- এরা আমাকে ভুল পথে নিয়ে যাবে।
বৃদ্ধ মারকুনীকে সঙ্গে নিয়ে হাঁটা দেয়। কতগুলো টিলার মধ্যদিয়ে হেঁটে তারা অপর একটি টিলার উপর উঠে যায়। তারপর আঁকাবাঁকা পথ অতিক্রম করে এক খোলা ময়দানে গিয়ে উপনীত হয়। ভেতরে যাওয়া-আসার সোজাপথ পেয়ে যায় মারকুনী।
বৃদ্ধ মারকুনীকে বলল, তুমি এবার চলে যাও। অন্যথায় খোদার গজব তোমাকে ভস্মীভূত করে ফেলবে। কিন্তু মারকুনী তো এমনিতেই চলে যেতে আসেনি। তার অভিযানের অগ্রযাত্রা শুরু হল মাত্র। এই বিজন পাহাড়ী এলাকায় যাওয়া-আসার সোজা পথ পেল মাত্র। ভয় দেখিয়ে তিনজনকে সঙ্গে নিয়ে নেয় সে। তারপর এই বলে যে-পথে এসেছিল, সে-পথে ফিরিয়ে নিয়ে যায় যে, আমার কিছু লোক ভেতরে আটকা পড়ে আছে, তাদেরকেও বের করে আনতে হবে।
মারকুনীর হাতে খাপখোলা তরবারী। তার ভয়ে তিনজনই তটস্থ। তারা মারকুনীর সঙ্গে ফেরত রওনা হয়।
পথটা ভালভাবে চিনে নেয় মারকুনী। বাক-মোড় সব রপ্ত করে নেয়। বৃদ্ধ ও তার সঙ্গীদের নিয়ে সুড়ঙ্গপথের একমুখ দিয়ে প্রবেশ করে অন্যমুখ দিয়ে বেরিয়ে যায়।
বৃদ্ধ মারকুনীকে সে স্থান দিয়ে নিয়ে যায়, যেখানে মারকুনীর সঙ্গীকে ভুনা করে কেটে কেটে ভক্ষণ করা হয়েছিল। সেখানে কয়েকটি উলঙ্গ মানুষের লাশ পড়ে আছে। বেশকটি শিশুর লাশও আছে। মারকুনীর সঙ্গীরা শিশুদেরকে হত্যা করে ফেলেছে। বৃদ্ধ এই গণহত্যা বোধ হয় আগে দেখেনি। তাই অকস্মাৎ চমকে উঠে থেমে যায়। ধৈর্য সংবরণ করে মারকুনীকে জিজ্ঞেস করে, এই নিরপরাধ লোকগুলোকে খুন করে তোমরা কী পেয়েছ?
তোমরা আমার একজন সঙ্গীকে আগুনে সিদ্ধ করে খেয়েছিলে। সে তোমাদের কী ক্ষতি করেছিল? প্রশ্ন করে মারকুনী।
সে অপরাধ জগতের মানুষ ছিল- বৃদ্ধ জবাব দেয়- আমাদের এই পবিত্র সাম্রাজ্যে এসে সে একে নাপাক করেছিল।
তোমরা এখানে কেন থাক?- মারকুনী জিজ্ঞেস করে- ফেরাউন র্যামন্স দ্বিতীয়-এর সমাধি কোথায়?
এ দুটি প্রশ্নের জবাব আমি তোমাকে দেব না। বৃদ্ধ জবাব দেয়।
ইত্যবসরে মারকুনীর সঙ্গীদের কয়েকজন এখানে এসে সমবেত হয়। মারকুনী তাদেরকে বলল, এদের মহিলাদেরকে নিয়ে আস। আক্রমণের আগেই মারকুনী সঙ্গীদের বলে রেখেছিল, কোন নারীকে হত্যা করবে না, উত্যক্তও করবে না। তাদেরকে পণ হিসেবে আটকে রাখবে।
মারকুনীর সঙ্গীরা দশ-এগারজন মহিলাকে সামনে নিয়ে আসে। তাদের দুতিনজন বৃদ্ধা। দুতিনজন কিশোরী। অন্যরা যুবতী। সবাই উলঙ্গ। গায়ের রং ফর্সা। বেশ সুন্দরী। মাথার চুল কোমর পর্যন্ত লম্বা। সোনার তারের ন্যায় চিক চিক করছে সকলের চুল।
আমরা যদি তোমাদের এই মেয়েগুলোকে তোমাদের চোখের সামনে অপমান করে হত্যা করি, তা কি তোমাদের কাছে ভাল লাগবে? বৃদ্ধের প্রতি তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে মারকুনী।
তার আগে তোমরা আমাকে হত্যা করে ফেল। বলল বৃদ্ধ।
না, তা করব না। তোমার সামনেই এদের সম্ভ্রমহানি করে হত্যা করব। বলল মারকুনী।
শোন! বৃদ্ধ বলল- তোমাদের মহিলারা কাপড়ে আবৃত থাকে। তাদের তোমরা পোশাকের তলে লুকিয়ে রাখ। কিন্তু তারা অশ্লীলতা পরিহার করে না। তোমরা নারীর খাতিরে রাজ্য বিসর্জন দাও। তোমরা নারীকে নাচাও, তাদেরকে দিয়ে পাপ করাও। আর আমাদের মহিলারা কাপড় পরিধান করে না- উলঙ্গ থাকে। কিন্তু অশ্লীলতা করে না। আমাদের কোন পুরুষ অন্য পুরুষের স্ত্রীর প্রতি সেই দৃষ্টিতে তাকায় না, যে দৃষ্টিতে তোমরা আমাদের নারীদের প্রতি দৃষ্টিপাত করেছ। আমি তো তোমাদের এই কুদৃষ্টিপাতকেও সহ্য করতে পারি না। তোমরা পবিত্র খোদা রামন্স-এর ধনভাণ্ডার লুট করে নিয়ে যাও, তবু আমার কন্যাদের ইজ্জতের উপর হাত দিও না।
