সন্দেহ নয়- আমার দৃঢ় বিশ্বাস, সে তোমার কাছে মস্তবড় মিথ্যে বলেছে- ইসমাইল বলল- আমি তো এসেছি এটা আমার চাকুরী। আহমার দরবেশের নির্দেশ আমাকে মান্য করতে হয়। তিনি আমাকে বললেন, যাও, আমি এসেছি। এটা আমার পেশা। আমি ভাড়াটিয়া, পাপী। বিনিময় পেয়ে আমি খুনও করতে পারি। কিন্তু আমি মিথ্যে বলতে পারি না। অপরাধ করতে গিয়ে আমি কখনো ধরা পড়িনি। আহমার দরবেশ আমকে বাঁচিয়ে রাখেন। আমার মধ্যে আরেকটি গুণ কিংবা দোষও বলতে পার আছে যে, আমি নারীকে শ্রদ্ধা করি। কেন করি তা জানি না। একজন নারী ড্র হোক কিংবা বেশ্যা হোক, আমি তাকে সম্মান করি। আমি নারীকে ধোকা দিতে পারি না। তোমাকে আমি ধোকার মধ্যে রাখব না। আমি তোমাকে একথা বলে দেয়া আমার নৈতিক কর্তব্য মনে করি যে, এ ধনভাণ্ডার তোমার মহল নির্মাণের লক্ষ্যে উদ্ধার করা হচ্ছে না। এই ধন ব্যবহৃত হবে মিসরের মূলোৎপাটনের কাজে। তারপর মিসরে ক্রুশের রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে, মসজিদগুলোকে গীর্জায় পরিণত করা হবে। যদি তা সম্ভব না হয়, তাহলে এই ধনভাণ্ডার মিসরের বাইরে চলে যাবে। আমি জানি, মিসর নিয়ে তোমার কোন কৌতূহল নেই। নেই আমারও। আমরা দুজনই পেশাদার। পাপ করা আমাদের পেশা। আমার তোমাকে শুধু দুটি কথা বলার ছিল, বলেছি। শোন, আবারও বলছি, প্রথম কথা- তোমার রূপ-যৌবন আর বেশি দিন টিকবে না। দ্বিতীয় কথা- এই লোকটি তোমাকে সঙ্গে করে এনেছে ফুর্তি করার জন্য। তার দৃষ্টিতে তুমি একটি বেশ্যা। সদয় হয়ে সে দুএকটি হীরক খণ্ড তোমার হাতে গুঁজে দিলেও দিতে পারে, তার বেশী নয়। সে যদি কারো জন্য প্রাসাদ নির্মাণ করেও, সে হবে অন্য কোন মোড়শী কন্যা- তুমি নও। তোমার চেহারায় আমি চুলের ন্যায় সরু দুটি রেখা দেখতে পাচ্ছি, যা আজ ভালই লাগছে। কিন্তু কদিন পর রেখা দুটো গম্ভীর হয়ে তোমাকে মূল্যহীন করে ফেলবে।
ইসমাইলের ঠোঁটে মুচকি হাসি। বলার ধরনটা এমন যে, তাতে না আছে তিরস্কার না আছে প্রতারণার আভাস। আছে হৃদ্যতা ও বাস্তবতা, যা কুদুমী এর আগে কখনো শুনেনি। কুদুমীর ধারণা, বরং আশা ছিল, ইসমাইল তাকে কাছে টেনে নেবে। প্রেম নিবেদন করবে। কিন্তু ইসমাইল তাকে সেই চোখে দেখলই না। বরং উল্টো তাকে এই বুঝ দেয়ার চেষ্টা করল যে, এই পাপের জগতে সে দুদিনের মেহমান মাত্র। কুদুমী বরাবরই নিজের রূপের প্রশংসা শুনতে অভ্যস্ত। নিজেকে তার ক্লিওপেট্রা মনে করত সে। কিন্তু আজ ইসমাইল তাকে এমন এক ধারণা দিল, যাকে সে ফেলতে পারছে না। ইসমাইলের বলার ধরনই এমন যে, তার বক্তব্য কুদুমীর মনের গভীরে গেঁথে যায়।
রাত কেটে যাচ্ছে। তবু কুদুমীর চোখে ঘুম আসছে না। ইসমাইলের সঙ্গে কথা বলে সময় কাটাতে ভাল লাগছে তার। ইসমাইলও তাকে নিরাশ করল না। রাতের শেষ প্রহর। এবার দুচোখের পাতা এক হয়ে আসে কুদুমীর।
বেশ বেলা হলে যখন কুদুমীর চোখ খুলল, তখন সে ইসমাইলের তাঁবুতে। ইসমাইল তাঁবুর বাইরে কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে। কুদুমী তাকে জাগিয়ে তুলে বলল, আমি একটি স্বপ্ন দেখেছি- বড় বিস্ময়কর স্বপ্ন। কী দেখলাম, পুরোপুরি মনে নেই। এতটুকু মনে আছে যে, কে যেন আমাকে বলছে, সোলায়মান সেকান্দারের ধনভাণ্ডারের চেয়ে ইসমাইলের কথাগুলোর মূল্য বেশী। বলেই কুদুমী হেসে ওঠে- এমন হাসি, যাতে নর্তকীর কৃত্রিমতা নেই আছে একটি নিষ্পাপ মেয়ের নির্মল সরলতা।
***
সূর্য এখনো উদিত হয়নি। পরিকল্পনা মোতাবেক মারকুনী তার সঙ্গীদেরকে উপযুক্ত জায়গায় লুকিয়ে রেখেছে। রাত পোহাবার পর এখন নীচের সবুজ-শ্যামল এলাকায় উলঙ্গ নারী-পুরুষের হাঁটা-চলা চোখে পড়তে শুরু করে। মারকুনী তার এক দুঃসাহসী ও নির্ভীক সৈনিককে নীচে অবতরণ করার জন্য প্রস্তুত করে রেখেছিল। আগের অভিযানে তার এক সঙ্গী যে ঢালু গড়িয়ে নীচে পড়ে, এই রহস্যময় লোকগুলোর সুস্বাদু খাবারে পরিণত হয়েছিল, সেই ঢালু বেয়ে নীচে নেমে যেতে হবে তাকে। লোকটি ঢালের। উপরে বসে নিজেকে নীচের দিকে গড়িয়ে দেয়। গড়াগড়ি খেতে খেতে নীচের সমতল ভূমিতে গিয়ে পড়ে সে। সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়িয়ে যায় এবং হাঁটতে শুরু করে। তিন-চারজন মানুষখেকো লোক তাকে দেখে ফেলে। তাকে ধরার জন্য তারা ছুটে আসে। আনন্দে চিৎকার করছে তারা। তারা যখন লোকটির নিকটে চলে আসে, অমনি উপর থেকে শাঁ করে চারটি তীর ধেয়ে আসে এবং তাদের প্রত্যেকের বুকে এসে বিদ্ধ হয়। ওদিক থেকে আরো দুজন উলঙ্গ পুরুষ দৌড়ে আসে। তারাও তীরের নিশানায় পরিণত হয়। মারকুনী উপরে একটি পাথরের সঙ্গে রশি বেঁধে রেখেছিল। রশির অপর মাথা নীচের দিকে ছেড়ে দিয়ে রশি বেয়ে প্রত্যেককে নীচে নেমে যেতে নির্দেশ দেয়।
রশি বেয়ে বেয়ে এক এক করে নীচে নেমে যায় মারকুনীর দলের সকলে। মারকুনী রশিটা খুলে নীচে ফেলে দেয় এবং নিজে গড়ানী খেয়ে নেমে যায়। এই ঢালু বেয়ে নীচে অবতরণ করা মারকুনীর পক্ষে ব্যাপার নয়। মারকুনীর নেতৃত্বে তরবারী উঁচিয়ে একদিকে ছুটে চলে বাহিনী। আরো কয়েকজন উলঙ্গ মানুষ সামনে পড়ে তাদের। তরবারীর আঘাতে টুকরো করে ফেলা হয় তাদেরকে। দূর থেকে দেখে পেছন দিকে পালিয়ে যায় কয়েকজন।
নীচের এই সবুজ-শ্যামল এলাকটা কয়েক ভাগে বিভক্ত। মারকুনী দেখতে পায় পলায়নপর সবগুলো মানুষ একই অংশে ঢুকে পড়েছে। সে তাদের পিছু নেয়। লোকগুলো চিৎকার করছে শুনতে পায় মারকুনী। চিৎকারের শব্দ অনুসরণ করে ধাওয়া করতে থাকে সে। দলের অন্যরা যাকে যেখানে পাচ্ছে, নির্বিচারে হত্যা করছে সবাইকে। পলায়নপর লোকগুলোর অনুসরণ করছে মারকুনী একা। কিছুদূর অগ্রসর হওয়ার পর লোকগুলো নজরে আসে মারকুনীর। তারা তিনজন। পালাবার পথ খুঁজছে তারা। মারকুনী ও তাদের মাঝে এখন সামান্য ব্যবধান। একদিকে একটি পাহাড় দেখতে পায় মারকুনী। পাহাড়ের পাদদেশে একস্থানে একটি গুহার মুখ। পলায়নপর লোকগুলো ঢুকে পড়ে এ-পথে। ঢুকে পড়ে মারকুনীও। মারকুনীর হাতে তরবারী।
