মারকুনী দেয়াল অতিক্রম করে ওপার পৌঁছে গেছে। হঠাৎ এমন একটি আর্তচীৎকার তার কানে আসে, যা ধীরে ধীরে নীচের দিকে তলিয়ে যাচ্ছে। খানিক পর ভেসে আসে আরো একটি ভয়ংকর চীৎকার শব্দ। এটিও নীচের দিকে চলে গিয়ে হাল্কা ধপাস শব্দের সঙ্গে নীরব হয়ে যায়। এরূপ পাঁচটি চিৎকার ধ্বনি শুনতে পায় মারকুনী।
মারকুনীর কাফেলার সদস্যরা দেয়াল অতিক্রম করে ওপার গিয়ে সমবেত হয়। গুনে দেখা গেল, পাঁচজন কম। মারকুনী জানায়, সামনে আর বড় কোন সমস্যা নেই। আমরা গন্তব্যের কাছাকাছি চলে এসেছি। আর একটু অগ্রসর হলে সোজা পথ পেয়ে যাব।
গভীর রাত। মারকুনী তার সঙ্গীদের নিয়ে সে স্থানে পৌঁছে যায়, যার নীচে বিস্তৃত সবুজ-শ্যামল ভূখণ্ড। মারকুনী সবাইকে সেখান থেকে সামান্য দূরে লুকিয়ে রাখে। দুব্যক্তিকে নিজের সঙ্গে নিয়ে অন্যদের বলে, সঙ্গে যা আছে খেয়ে শুয়ে পড়। আমি সময়মত তোমাদেরকে জাগিয়ে দেব।
সঙ্গীদ্বয়কে নিয়ে স্থান পর্যবেক্ষণে নেমে পড়ে মারকুনী। নীচে বরের নীরবতা। ঘোর অন্ধকার। কোথাও এক ফোঁটা আলোও চোখে পড়ছে না। আর সামনে অগ্রসর হতে ভয় পাচ্ছে মারকুনী। রাত পোহাবার আগে আক্রমণ চালাবে না বলে সিদ্ধান্ত নেয় সে। ফিরে যায় ঘুমন্ত সঙ্গীদের নিকট।
***
কুদুমী ও ইসমাইল রয়ে গেছে পিছনে। এমন নিরিবিলি পরিবেশ ভাল লাগে না কুদুমীর। কোলাহলপূর্ণ মদ আর নাচ-গানের আসরের হৈ-হুঁল্লোড় তার প্রিয়। কিন্তু মারকুনী তাকে এই ভয়ংকর নির্জন এলাকায় নিয়ে এল এবং এই একটি মানুষের সঙ্গে এখানে রেখে গেল!
ইসমাইল কুদুমীকে জানে। কুদুমী ইসমাইলকে চিনে না। ইসমাইল অপরাধ জগতের মানুষ। তবে তার দৈহিক গঠন ও আলাপ-ব্যবহারে কুদুমীর কাছে তাকে এক অসাধারণ ব্যক্তিত্ব বলে মনে হল। ইসমাইলের কাছে ঘেঁষতে চায় কুদুমী। কিন্তু পাত্তা দিচ্ছে না ইসমাইল।
সন্ধ্যার পর ইসমাইল ভুনা গোশত গরম করে কুদুমীকে খেতে দেয়। মদের গ্লাস সামনে রেখে বলে, খেয়ে শুয়ে পড়। প্রয়োজন হলে আমাকে আমার তাঁবু থেকে ডেকে নিও।
ইসমাইল কুদুমীর তাঁবু থেকে বেরিয়ে যায়। কুদুমী খাবার খায়, মদ পান করে। ইসমাইলের পরামর্শ মোতাবেক এখন তার শুয়ে পড়া দরকার। কিন্তু একা একা ভাল লাগছে না তার। মনটা ছটফট করছে। নিজের রূপ-লাবণ্যে গর্ব আছে কুদুমীর। ইসমাইল তার কাছে ঘেঁষার চেষ্টা করবে, এটাই ছিল স্বাভাবিক। এমন একটা আশাও মনে মনে পোষণ করে কুদুমী। কিন্তু ইসমাইল সম্পূর্ণ উদাসীন। রূপসী কুদুমীকে নিয়ে কোন ভাবনাই যেন নেই তার।
কুদুমীর চোখে ঘুম আসছে না। নিজের তাঁবু থেকে বের হয় সে। চলে যায় ইসমাইলের তাঁবুতে। ইসমাইল এখনো সজাগ। কুদুমীর আগমন টের পেয়ে বাতি জ্বালায় সে। জিজ্ঞেস করে কেন এসেছ? কুদুমী বলল, একা একা ভাল লাগছে না, তাই এলাম। বলতে বলতে ইসমাইলের কাছে ঘেঁষে বসে পড়ে মেয়েটি। জিজ্ঞেস করে
তুমি বোধ হয় মুসলমান?
ধর্ম নিয়ে তোমার কৌতূহল কিসের?- ইসমাইল জবাব দেয়- তোমার সব সম্পর্ক তো মানুষের সাথে। মানুষের জন্যই তোমার জীবন, তোমার মরণ! নামটা আমার ইসলামী ইসমাইল। কিন্তু আমার কোন ধর্ম নেই।
এ্যা!- মুখে মুচকি হাসি টেনে বিস্ময়ের সাথে কুদুমী বলল- তুমি ইসমাইল! আহমার দরবেশের খাস লোক।
প্রসঙ্গ এড়িয়ে যায় ইসমাইল।
মরকুনী সম্পর্কে কথা তোলে কুদুমী। বলে, লোকটা নিজের নাম বলেছে সোলায়মান সেকান্দার। কিন্তু তাকে মুসলমান বলে মনে হয় না!
লোকটা মিসরী নয়- ইসমাইল বলল- সুদানীও নয়। নামও তার সোলায়মান সেকান্দার নয়।
তাহলে তিনি কে?- কুদুমী জিজ্ঞেস করে- তার আসল নাম কি?
তার আসল নাম আমি জানি; কিন্তু তোমাকে বলতে পারব না ইসমাইল বলল- এই ভেদ লুকিয়ে রাখার জন্য আমি তার নিকট থেকে বিনিময় পেয়ে থাকি। তার সম্পর্কে তোমার কৌতূহল না থাকাই উচিত যে, সে কে। তুমি উপযুক্ত পারিশ্রমিকের বিনিময়ে তার মনোরঞ্জনের জন্য এখানে এসেছ। এটা তোমার পেশা। সে তোমাকে গুপ্তধনের ভাগও দেবে বলে ওয়াদা করেছে নিশ্চয়।
সে তো আমার প্রাপ্য- কুদুমী বলল- তিনি আমাকে যে বিনিময় দিয়েছেন, এই ভয়ংকর বিয়াবানে আসার বিনিময় হিসেবে তা নিতান্তই কম। তোমার ধারণাই সঠিক যে, আমি গুপ্তধনের ভাগ পাওয়ার ওয়াদা নিয়েই এসেছি।
তোমার কি বিশ্বাস হয় যে, সে তোমাকে গুপ্তধনের ভাগ দেবেঃ ইসমাইল জিজ্ঞেস করে- তোমার কি বিশ্বাস হয়, সে তার সেই কাঙ্খিত গুপ্তধনের সন্ধান পেয়ে যাবে, তুমি যার ভাগ নিতে এসেছ?
আমি এতই দামী মেয়ে যে, মানুষ আমাকে ধন-ভাণ্ডারের বিনিময়েও কিনতে প্রস্তুত- গর্বের সুরে কুদুমী বলল- এই লোকটি তো আমার উপযুক্ত মূল্য আদায়ই করতে পারবে না। আমি আমীরজাদা আর শাহজাদাদের গোলাম বানিয়ে রাখি।
কয়দিন?-ইসমাইল মুচকি হেসে বলল- বড়জোর আর দুবছর। তারপর তোমার দাম এতই কমে যাবে যে, তুমি অলিগলিতে পাগলের ন্যায় ছুটতে থাকবে, কেউ তোমাকে জিজ্ঞেসও করবে না। যাদের কাছে ধনভাণ্ডার আছে, তারা আরেক কুদুমীকে জোগাড় করে নেবে। কাজেই এত গর্ব কর না কুদুমী।
কেন করব না?–কুদুমী বলল- এই লোকটি- যিনি নিজের নাম সোলায়মান সেকান্দর বলে জানিয়েছেন- আমার রূপের জাদুতে এমনভাবে ফেঁসে গেছেন যে, আমাকে একাধিকবার কসম খেয়ে বলেছেন, তিনি শুধু আমারই জন্য গুপ্তধন উদ্ধার করতে যাচ্ছেন। তিনি আমাকে ইস্কান্দারিয়া নিয়ে যাবেন। সেখানে সমুদ্রের পাড়ে আমার জন্য প্রাসাদ নির্মাণ করবেন। তারপর আমি আর নর্তকী থাকব না। কেন, তোমার কি তাতে সন্দেহ আছে?
