হ্যাঁ, তুমি অনুসন্ধান শুরু করে দাও- সুলতান আইউবী বললেন- আর ঐসব গুপ্তধনের কথা মন থেকে ঝেড়ে ফেল। আমি জানি, জাতির কল্যাণ সাধন এবং খৃস্টানদের সঙ্গে চূড়ান্ত যুদ্ধ লড়ার জন্য অর্থের প্রয়োজন আছে। কিন্তু আমি কারো নিকট সাহায্য চাইব না। মোহতারাম নুরুদ্দীন জঙ্গী আমাকে সাহায্য করবেন বলে ওয়াদা দিয়েছেন। আমি তার এ সাহায্য গ্রহণ করব না। আর্থিক সাহায্য মায়ের পেটের ভাইও যদি করে, তবু তা মানবিক উৎকর্ষ, শ্রম ও দ্বীনদারীর জন্য ক্ষতিকর। তারপরও মানুষ গুপ্তধনের সন্ধানে দিশেহারার মত ঘুরে ফিরছে। শোন আলী! মিসরের মাটি বন্ধ্যা হয়ে যায়নি। পরিশ্রম কর; এ মাটিতেই সোনা ফলবে। দেশের জনগণকে বুঝাও, তাদের প্রতি সরকারের কর্তব্য কি। তাহলে তারা নিজেদেরকে প্রজা ভাবা ছেড়ে দেবে। তাদেরও কি কি কর্তব্য আছে, তাও তাদেরকে অবহিত কর। দেশের জনগণ যদি কর্তব্য সম্পর্কে উদাসীন হয়ে পড়ে, তাহলে দেশের উন্নতি হতে পারে না। তোমরা যে ভূখণ্ডের সংরক্ষণে রক্ত ঝরাবে না, যে দেশের মর্যাদার জন্য ঘাম ঝরাবে না; সে ভূখণ্ড সে দেশ তোমাদের পাওনা আদায় করবে না। তারপর দেশের শাসকগোষ্ঠী বিদেশের ধনভাণ্ডারের অনুসন্ধানে নেমে পড়বে আর জনগণ বিভক্ত-বিশৃঙ্খল হয়ে কাফেরদের গোলামে পরিণত হবে।
***
মিসরের গবর্নর সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী যে ধনভাণ্ডারে হাত দেয়া অপছন্দ করছেন, সেসব যে দুর্গম পাহাড়ী এলাকায় রক্ষিত, সে পর্যন্ত পৌঁছে গেছে তারই এক জেনারেলের প্রেরিত পঞ্চাশ ব্যক্তির বাহিনী। মারকুনী, ইসমাইল, কুদুমী এবং অপর এক খৃষ্টান পৌঁছে গেছে সন্ধ্যায়। তাদের অন্য সঙ্গীরা- যাদেরকে ভিন্ন ভিন্ন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলে প্রেরণ করা হয়েছিল গন্তব্যে পৌঁছতে শুরু করেছে সে রাতেই। মধ্যরাত পর্যন্ত পৌঁছে যায় পঞ্চাশজনের সব কজন।
জায়গাটা এমন যে, এর পাশ দিয়ে কোন পথিক কখনো পথ অতিক্রম করেনি। অত্যন্ত ভয়ানক জায়গা। সীমান্ত থেকে দূরে হওয়ার কারণে এখানে কখনো কোন সীমান্ত বাহিনীর নজরও পড়েনি।
মারকুনী রাতারাতি সবাইকে ভেতরে পৌঁছিয়ে দেয়, যাতে বাইরে থেকে। কেউ দেখে না ফেলে। সে সঙ্গীদের বলে দেয়, তোমরা যতক্ষণ পর্যন্ত ইচ্ছা ঘুমাতে পার; ঘুম থেকে উঠে এখান থেকে পায়ে হেঁটে সম্মুখে অগ্রসর হতে হবে। নিজে কুদুমীকে নিয়ে তাঁবুতে ঢুকে পড়ে।
একটি পাহাড়ের পাদদেশে ঘুমিয়ে পড়ে সকলে। পরদিন সকালে যখন তারা জাগ্রত হয়, তখন ভোরের রক্তিম সূর্য টিলার উপরে উঠে গেছে। এই অভিযানে সঙ্গে সরঞ্জাম, যন্ত্র ও অস্ত্রপাতি কি কি সঙ্গে নিতে হবে, মারকুনী আগেই তা বলে দিয়েছিল। সরঞ্জামাদির মধ্যে আছে শক্ত ও মোটা রশি, কোদাল ও বেলচা ইত্যাদি। অস্ত্রের মধ্যে তীর-ধনুক ও তরবারী। পথের দুর্গমতা সম্পর্কেও সকলকে অবহিত করা হয়েছে। মারকুনীর এক সঙ্গী যে. দেয়াল অতিক্রম করতে গিয়ে নীচে পড়ে প্রাণ হারিয়েছিল, সেই দেয়াল সম্পর্কেও ধারণা দিয়ে সবাইকে মানসিকভাবে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। নারীকণ্ঠের কান্নার আওয়াজ ইত্যাদি সব বিষয়ে কাফেলার প্রত্যেককে পূর্ব ধারণা দিয়ে রেখেছে মারকুনী। এখান থেকে উটে সওয়ার হয়ে অগ্রসর হওয়া যাবে না। যেতে হবে পায়ে হেঁটে। তাই উটগুলো বেঁধে রেখে দেখাশোনার জন্য মাত্র এক ব্যক্তিকে রেখে দেয়া হয়েছে। কুদুমীকেও এপথে নেয়া যাবে না। মারকুনীর আশা, খুঁজলে অন্য কোন নিরাপদ পথ পাওয়া যাবে, যে পথে কুদুমীকে নিয়ে ভেতরে ঢুকে যেতে পারবে সে। কুদুমীর হেফাজতের জন্যও একজন লোকের প্রয়োজন। এ-কাজের জন্য কেবল ইসমাইলই উপযুক্ত ব্যক্তি।
মারকুনী ইসমাইলকে বলল, তুমি কুদুমীকে নিয়ে এখানেই থাক। তবে মনে রাখবে, কুদুমীর মর্যাদার তুলনায় তুমি কিছুই নও। তুমি তার আরাম ও হেফাজতের দায়িত্ব পালন করবে। আমি শিগগির ফিরে আসব। এসে তোমাদের দুজনকে নিয়ে যাব।
মারকুনী দলবল নিয়ে রওনা হয়ে যায়। এ-পথ তার চেনা। নির্ভয়ে নিশ্চিন্তে এগিয়ে চলে মারকুনী। দলের অন্যরা যতই সামনে অগ্রসর হচ্ছে, ততই ভয় চেপে বসছে তাদের মনে। পাহাড়ী এলাকা সম্পর্কে তারা সবাই সম্যক অবহিত। কিন্তু এমন এলাকা, এ ধরনের পাহাড় তারা আগে কখনো দেখেনি। যে জায়গাটায় নারী কণ্ঠের কান্নার শব্দ শোনা যায়, সেখানে পৌঁছে হঠাৎ সবাই হতচকিত হয়ে এদিক-ওদিক তাকাতে শুরু করে। তারা নিশ্চিত, কতগুলো নারী একযোগে কান্নাকাটি করছে। ভয়ে গা ছম ছম করে ওঠে সকলের। সর্বাঙ্গ কাটা দিয়ে উঠে তাদের। কিন্তু এ অভিযানের জন্য তাদেরকে যে পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে, তার শক্তি এতই বেশী যে, এই ভীতিকর অবস্থা তার কাছে চাপা পড়ে যাচ্ছে। তাছাড়া তারা তো খৃস্টানদের বেতনভোগী কর্মচারী। মারকুনী তাদের অফিসার। তারা পুরস্কারের লোভ ও কুমের চাপে এগিয়ে চলছে সম্মুখপানে। কান্নার শব্দ শুনে তারা যখন হঠাৎ মকে উঠে, তখন মারকুনী তাদের বলে, এগুলো নারী বা প্রেতাত্মা কিছুই নয় এটা বাতাসের শব্দ। তারপরও তাদের ভয় কাটেনি। পরস্পর চোখাচোখি করে? সাহসের ভান দেখিয়ে এগুতে থাকে।
সূর্য ডুবে যাচ্ছে। কাফেলা সেই প্রশস্ত ও সুগভীর খাদের নিকট পৌঁছে মানদীপ্ত দাস্তান গেছে, মারকুনী যেটি একবার অতিক্রম করেছিল। প্রাকৃতিক সরু দেয়াল বেয়ে এখন তাদের এ খাদ পার হতে হবে। দলের সদস্যদের নিয়ে মারকুনী সমস্যায় পড়ে যায়। দেয়ালে পা রাখতে কেউ সাহস পাচ্ছে না। মারকুনী সকলের সামনে। দেয়ালে পা রেখে এগুতে শুরু করে সে। তার দেখাদেখি এক এক করে অন্যরাও দেয়ালে উঠে যায়। এক পা দুপা করে অগ্রসর হতে শুরু করে তারা সূর্য ডুবে গেছে। আলো না থাকায় খাদের গভীরতা কারো চোখে পড়ছে না। মারকুনীর সঙ্গীদের জন্য এটা ভালই হল।
