জানো, ঐ শাসকদের পতন কেন ঘটেছে তার একমাত্র কারণ, তাদের দৃষ্টি ঐ ধনভাণ্ডারের প্রতিই নিবদ্ধ ছিল। তারা প্রজাদের এই বুঝ দিয়েছিল যে, সম্পদ আছে তো সম্মান আছে। হাতে অর্থ নেই, তাহলে তোমাদের এবং তোমাদের সুন্দরী স্ত্রী-কন্যাদের মালিকও তারা, যাদের দৌলত আছে। আমার বন্ধুগণ! তোমরা সালাহুদ্দীন আইনবীকে সেই সারিতে দাঁড় করিও না। আমি জাতিকে এ বুঝ দিতে চাই যে, আসল সম্পদ হল জাতীয় মর্যাদা আর ঈমান। কিন্তু তা তখনই সম্ভব হবে, যখন আমি নিজে এবং তোমরা যারা সরকারের স্তম্ভ, অন্তর থেকে সম্পদের মোহ দূর করতে পারবে।
আমরা তো এই ধনভাণ্ডার অন্বেষণ ব্যক্তিগত স্বার্থে করতে চাই না- এক কমান্ডার বললেন- আমরা জাতীয় স্বার্থে এ অভিযানে হাত দিতে চাই।
আমি জানি, আমার এই অস্বীকৃতি তোমাদের কারো পছন্দ নয়- সুলতান আইউবী বললেন- আমার কথা বুঝতে হলে তোমাদের মস্তিষ্ক থেকে অন্যসব চিন্তা দূর করে ফেলতে হবে। আমার বিবেক আমাকে বলছে যে, যে সম্পদ বাহির থেকে আসে- হোক তা জাতীয় প্রয়োজনে- তা শাসকদের ঈমান নড়বড়ে করে দেয়। এ ইল সম্পদের অভিশাপ। আমার বুঝ হল, আমার নিকট যদি ঘোড়া ক্রয় করার জন্য অর্থ না থাকে, তাহলে আমি বাহিনীর সঙ্গে পায়ে হেঁটে বাইতুল মোকাদ্দাস গিয়ে পৌঁছব, তবু ঘোড়া কেনার জন্য কবর খুঁড়ে লাশের গায়ের অলংকার চুরি করে বিক্রি করতে পারব না। আমার লক্ষ্য বাইতুল মোকাদ্দাসকে খৃস্টানদের থেকে উদ্ধার করা; ঘোড়া ক্রয়ের জন্য অর্থ সগ্রহ করা নয়। তোমরা যখন গুপ্তধনের অনুসন্ধান শুরু করবে, তখন জনসাধারণের মধ্যে অনেকে যেখানে সেখানে কবর-চুরি করতে শুরু করবে। মিসরে এমন ঘটনা ঘটে আসছে। আর যখন ঐসব গুপ্তধন তোমাদের হাতে চলে আসবে, তখন তোমরা একজন অপরজনের শত্রুতে পরিণত না হলেও পরস্পরের মধ্যে সন্দেহপ্রবণতা সৃষ্টি হবে। নিঃসন্দেহে অর্থের প্রাচুর্য মানুষের পারস্পরিক ভালবাসা নষ্ট করে দেয়। বান্দার হক আদায় করার উৎসাহ নিঃশেষ করে দেয়। এই ধনৈশ্বর্যই মানুষকে খোদার আসনে বসিয়েছিল। আজ সেই খোদারা কোথায়? তারা তো আকাশে উঠে যায়নি, মাটির নীচেই দাফন হয়ে আছে। আমার বন্ধুগণ! আমি নতুন একটি অপরাধের বীজ বপন করতে চাই না। তোমরা এই ধনভাণ্ডারের চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেল। আরে, তোমাদের মধ্যে এই যে গাদ্দার তৈরি হয়ে আছে, তা তো এই সম্পদের-ই লীলা। তোমরা দুজন গাদ্দারকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান কর তো আরো চারজন তৈরি হয়ে যায়। তোমরা নিজ হাতে উপার্জিত-উৎপাদিত সম্পদ দ্বারা জীবন নির্বাহ করার চেষ্টা কর। তোমরা মুসলমান। নিজেদের ভাগ্য কাফেরদের হাতে তুলে দিও না। অন্যথায় সবাই গাদ্দার হয়ে যাবে। ফেরাউনরা মারা গেছে। ঐ মৃত দেহগুলোকে মাটির নীচেই চাপা পড়ে থাকতে দাও।
আপনার অনুমোদন ছাড়া আমরা এ জাতীয় কোন অভিযান শুরু করব না। বললেন একজন।
গিয়াস!- সুলতান আইউবী গিয়াস বিলবীসের প্রতি তাকিয়ে মুচকি হেসে বললেন- আজ হঠাৎ করে এই গুপ্তধনের কথা তোমার মাথায় আসল কিভাবে? আমি মিসর আসলাম চার বছর হয়ে গেল। এর আগে কোনদিন তো তুমি এমন প্রস্তাব পেশ করনি?
ইতিপূর্বে এই চিন্তা কখনো আমার মাথায় আসেওনি আমীর মোহতারাম!- গিয়াস বিলবীস বললেন- মাস দুয়েক আগে জাতীয় গ্রন্থাগারের কেরানী আমাকে বলল, পুরাতন কাগজপত্র থেকে কিছু কাগজ হারিয়ে গেছে। আমি সেই কাগজগুলোর ধরণ ও গুরুত্ব জিজ্ঞেস করলে সে বলল, কাগজগুলো এমন গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে, খুঁজে বের করতে হবে। তাতে ছিল কিছু নকশা ও ফেরাউনদের আমলের কিছু লেখাজোখা। অনেক পুরাতন ও ছেঁড়াফাড়া ছিল কাগজগুলো। কেরানী যখন ফেরাউনদের প্রসঙ্গ উল্লেখ করল, তখন আমার মনে খেয়াল চাপল যে, সেসব লেখা ও নকশাগুলোতে ফেরাউনদের গোপন সমাধি সম্পর্কে তথ্য থাকতে পারে। যে ফাইল থেকে কাগজগুলো গুম হয়েছিল, আমি তা দেখেছি। আমি বিষয়টিকে এই বলে গুরুত্ব দেইনি যে, ওসব লেখা-জোখা এ যুগে কে আর বুঝবে।
তোমার এ ধারণা সঠিক নয় গিয়াস!- সুলতান আইউবী বললেন মিসরে এমন অনেক লোক আছে, যারা এসব লেখা, নকশা ও ইশারা-ইঙ্গিত বুঝতে সক্ষম। এসব কাগজ ও নকশা চুরি হওয়া বিস্ময়কর ঘটনা নয়। এই চুরি গ্রন্থাগারের কোন লোভী কর্মকর্তা করে থাকবে। এ কাগজগুলোর প্রতি আমার কোন কৌতূহল নেই- আমার দৃষ্টি চোরের প্রতি। লোকটি তোমাদেরই বন্ধু-বান্ধবদের কেউ কিনা কে জানে। চোরটিকে খুঁজে বের করতে হবে। আলী! বিলম্ব না করে অভিযান শুরু কর।
আমার মনে হচ্ছে, কাগজগুলোর কিছু না কিছু গুরুত্ব অবশ্যই আছে আলী বিন সুফিয়ান বললেন- আমি মোহতারাম গিয়াস বিলবীসের সঙ্গে কথা বলেছি। বেশ কিছুদিন যাবত আমাদের সংবাদদাতা ও গোয়েন্দারা আমাদেরকে শহরে একটি রহস্যময় তৎপরতার সংবাদ দিয়ে আসছে। কুদুমী নাম্মী এক নর্তকী আছে। বিশেষ মহলে মেয়েটি সকলের কাছে পরিচিত, যাকে বিত্তশালীদের পানশালার প্রদীপ বলা চলে। আজ পাঁচদিন যাবত মেয়েটি নিখোঁজ রয়েছে। একটি নর্তকীর শহর থেকে উধাও হয়ে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ কোন ঘটনা নয়। কিন্তু কুদুমীকে আমি বিশেষ নজরে রেখেছি। আমি গোয়েন্দা মারফত জানতে পেরেছি যে, মেয়েটির কাছে অজ্ঞাতপরিচয় ও সন্দেহভাজন দুজন লোক যাওয়া-আসা করত। হঠাৎ একদিন তার ঘর থেকে বোরকা পরিহিত একজন মহিলাকে বের হয়ে যেতে দেখা গেছে। মহিলা অপরিচিত এক ব্যবসায়ীর সঙ্গে যাচ্ছিল। আমার সন্দেহ, কুদুমীই নিজের বেশ বদল করে বেরিয়ে গেছে। আমার আরেক দল গোয়েন্দা কিছু লোককে সন্দেহজনক অবস্থায় দক্ষিণ দিকে যেতে দেখেছে। আমার সন্দেহ, এসব তৎপরতা হারিয়ে যাওয়া কাগজের সঙ্গে সম্পৃক্ত। আমার আরো সন্দেহ হচ্ছে, এরা খৃস্টান সন্ত্রাসী চক্রই হবে। তবে আসল ঘটনা যাই হোক, আমি এসব তৎপরতার রহস্য উদ্ঘাটন করে ছাড়ব।
