সুলতান আইউবী বললেন, খৃস্টানদের কাছে আছে মদ আর সুন্দরী নারী। আর আমাদের আছে এ দুয়ের মোহ। জাতির অন্তর থেকে মদ-নারী-সম্পদের এই লোভ দূর করতে হবে। তার জন্য ঈমানের পরিপক্কতা প্রয়োজন।
আমীরে মোহরাতাম!- ঊর্ধ্বতন এক কমান্ডার বললেন- আমাদের সম্পদেরও প্রয়োজন আছে। ব্যয় নির্বাহ আমাদের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়েছে। অর্থের অভাবে অনেক কাজে আমাদের বেশ সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।
আমি তোমাদের এ সমস্যার সমাধান করব- সুলতান আইউবী বললেন সব সময়ের জন্য তোমাদেরকে একটি সত্য মেনে নিতে হবে যে, মুসলমানদের কাছে সম্পদ, সৈন্য ও অস্ত্রের অভাব অতীতেও ছিল, এখনও আছে। এর ব্যতিক্রম কখনো ঘটেনি। আমাদের প্রিয়নবী (সাঃ) তার জীবনের প্রথম যুদ্ধটিতে লড়েছিলেন মাত্র তিনশ তেরজন প্রায় নিরস্ত্র সৈন্য নিয়ে। সে যুদ্ধে কাফেরদের সৈন্য ছিল এক হাজার। তারা সবাই ছিল অস্ত্রসজ্জিত। পরবর্তীতে যখন সেখানে কাফেরদের সঙ্গে মুসলমানদের যুদ্ধ হয়েছে, এ অনুপাতেই হয়েছে। তাছাড়া মুসলমানদের কাছে মোটের উপর সম্পদের অভাব কখনো ছিল না। কিন্তু সে সম্পদ কুক্ষিগত হয়ে ছিল গুটিকতক লোকের হাতে। এখনও আমাদেরও ঠিক একই অবস্থা। ছোট ছোট যেসব প্রদেশের মালিক মুসলমান, তাদের কাছে বিপুল সম্পদের স্তূপ পড়ে আছে।
সম্পদের স্তূপ এ অঞ্চলেও পড়ে আছে সালারে আজম!- গিয়াস বিলবীস বললেন- আপনি যদি অনুমতি দেন, তাহলে আমরা একটি নতুন অভিযান শুরু করতে পারি। আপনি জানেন যে, মিসর গুপ্তধনের জায়গা। অতীতে এখানে যখন যে ফেরাউনই মারা গেছে, নিজের সম্পদ-ধনভাণ্ডার সঙ্গে করে মাটির নীচে নিয়ে গেছে। ঐ সকল সম্পদ কার ছিল? ছিল গরীব মানুষগুলোর, যাদেরকে অভুক্ত রেখে তাদের থেকে সেজদা আদায় করা হত। সে যুগের মানুষ ফেরাউনদেরকে খোদা বলে মান্য করত শুধু এ কারণে যে, তাদের পেটে খাবার ছিল না, পরনে কাপড় ছিল না। তাদের ভাগ্য ছিল ফেরাউনদের হাতে। তাদের জীবন-মৃত্যু দু-ই ফেরাউনরা নিজ হাতে তুলে নিয়েছিল। মানুষদের। দ্বারা মাটি খুঁড়ে পাহাড় কেটে ফেরাউনরা পাতালে তাদের সমাধি তৈরি করেছিল, যা ছিল ঠিক প্রাসাদের ন্যায়। মানুষের ধনভাণ্ডারকে তারা তার মধ্যে লুকিয়ে রেখেছে। মহামান্য সুলতান যদি অনুমতি দেন, তাহলে আমরা ফেরাউনদের সেই সমাধির অনুসন্ধান শুরু করে দেই এবং ধনভাণ্ডার উদ্ধার করে দেশ ও জাতির স্বার্থে ব্যবহার করি।
উনি ঠিকই বলেছেন আমীরে মোহতারাম।- গিয়াস বিলবীসের পক্ষে মজলিস থেকে একাধিক আওয়াজ উঠে।
আমরা এর আগে বিষয়টা কখনো ভেবে দেখেনি। বললেন একজন।
এই অভিযানে আমরা সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করতে পারি। বললেন আরেকজন।
জনসাধারণের মধ্য থেকে নতুন একটি বাহিনী গঠন করে এ অভিযান শুরু করা যায়। বললেন আরেকজন।
হ্যাঁ, হ্যাঁ, এ কাজে বেতন দিয়ে অসামরিক লোকদের ব্যবহার করা যেতে পারে। সমর্থন জানায় অন্যজন।
একরকম শোরগোল পড়ে যায় মজলিসে। প্রত্যেকে কিছু না কিছু বলছেন। চুপচাপ বসে আছেন শুধু একজন- সুলতান আইউবী। দীর্ঘক্ষণ পর সভাসদগণ টের পান যে, তাদের আমীর ও সেনাপতি কথা বলছেন না। হঠাৎ নীরবতা ছেয়ে যায় মজলিসে। এখন কেউ-ই কথা বলছেন না, নিস্তব্ধ বসে আছেন সবাই। সুলতান আইউবী সকলের প্রতি একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে মুখ খুললেন। বললেন
আমি গিয়াস বিলবীসের এই প্রস্তাব অনুমোদন করি না।
সবাই নিশুপ-নিস্তব্ধ। পিনপতন নীরবতা বিরাজ করছে হলময়। সুলতান আইউবীর কথার উপর কথা বলবে এমন সাহস কারো নেই। সুলতান বললেন
আমি চাই না, আমার মৃত্যুর পর ইতিহাস বলুক সালাহুদ্দীন আইউবী কবর-চোর ছিল, কবর-ডাকাত ছিল। ইতিহাস আমাকে অপদস্থ করলে তা তোমাদের জন্যও অপমান বলে গণ্য হবে। ভবিষ্যৎ বংশধর বলবে সালাহুদ্দীন আইউবীর মন্ত্রী-উপদেষ্টাগণও কবর-চোর ছিল। ইতিহাসের এমন তথ্য খৃষ্টানদের জন্য এক উপাদেয় খোরাকে পরিণত হবে। তারা তোমাদের কুরবানী ও ইসলামী চেতনাকে ডাকাতী ও দস্যুতা আখ্যা দিয়ে তোমাদেরকে তোমাদের-ই বংশধরের মাঝে অপমানিত করবে। আর তাতে শুধু তোমরা-ই নও, আমাদের ইতিহাসও কলংকিত হয়ে পড়বে।
গোস্তাখী মাফ করুন আমীরে মোহতারাম!- আলী বিন সুফিয়ান বললেন-অতীতে অল্প কদিনের জন্য মিসর খৃষ্টানদের কজায় এসেছিল। ক্ষমতা পেয়ে তারা সর্বপ্রথম এখানকার গুপ্তভাণ্ডারসমূহ অন্বেষণ শুরু করেছিল। কায়রো উপকণ্ঠে আমরা যে পরিত্যক্ত ভগ্ন প্রাসাদগুলো থেকে খৃষ্টান সন্ত্রাসী ও ফেদায়ীদের একটি চক্রকে গ্রেফতার করেছিলাম, সেটিও কোন এক ফেরাউনের সমাধি ছিল। খৃষ্টানরা সেখান থেকে সব ধনভাণ্ডার নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু খৃস্টানদের শাসনক্ষমতা বেশীদিন টিকে থাকেনি। না হলে তারা মিসরের সব গুপ্তধন উদ্ধার করে নিয়ে যেত। মাননীয় গিয়াস বিলবীস ঠিকই বলেছেন যে, এই ধনভাণ্ডারের যদি কোন মালিক থেকে থাকে, তাহলে সে আর যে হোক ফেরাউন নয়। এসব সম্পদের মালিক ছিল দেশের জনগণ। আমি আপনাকে এ পরামর্শ দেয়ার সাহস করি যে, এসব গুপ্তধন উদ্ধার করে জনগণের কল্যাণে ব্যবহার করা হোক।
আর আমি তোমাকে জ্ঞাত করতে চাই- সুলতান আইউবী বললেন এসব ধনভাণ্ডার যখন তোমাদের হাতে আসবে, তখন তোমরাও ফেরাউন হয়ে যাবে। মানুষকে এত দুঃসাহস কে দিল যে, মানুষ নিজেকে খোদা দাবি করবে? সম্পদ আর সম্পদের মোহ-ই তো! মানুষকে মানুষের সামনে সেজদা করতে কিসে বাধ্য করল? দারিদ্র্য আর ক্ষুধা-ই তো! তোমরা খৃস্টানদের কথা বললে যে, তারা ফেরাউনের একটি সমাধি লুট করেছে। শোন, যখন প্রথম ফেরাউনের মরদেহ তার সমুদয় সম্পদসহ মাটিচাপা দেয়া হয়, তখন থেকে কবর-চুরির সূচনা হয়। মানুষ হিংস্র হায়েনার ন্যায় প্রথম ফেরাউনের কবরের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। নিজেদের দ্বীন-ঈমান ত্যাগ করে মানুষ গুপ্তধনের উপর লুটিয়ে পড়েছিল। তারপর একের পর এক ফেরাউন মৃত্যুবরণ করতে থাকে আর কবর-চুরি নিয়মিত একটি পেশার ন্যায় চলতে থাকে। তারপর এই কবরচুরির প্রবণতা রোধ করার জন্য প্রত্যেক ফেরাউন নিজের জীবদ্দশায় : মৃত্যু-পরবর্তী সমাধির জন্য এমন দুর্গম জায়গা ঠিক করে যেতে শুরু করে, যেখানে পৌঁছা কারো পক্ষে সম্ভব না হয় এবং মৃত্যুর পর তাদের উত্তরসূরী ও স্থলাভিষিক্তরা সেই সমাধি এমনভাবে বন্ধ করে রাখতে শুরু করে, যেন কেউ তা খুলতে না পারে। তারপর একসময় যখন ফেরাউনদের যুগের পরিসমাপ্তি ঘটে, তখন মিসরের শাসনক্ষমতা যখন যার হাতে আসে, তখনই সে সেই গুপ্ত ধনভাণ্ডার খুঁজে বের করার প্রতি মনোনিবেশ করে। আমি জানি, ফেরাউনদের অনেক সমাধি এমনও আছে, সেগুলো কোথায় আছে কেউ জানে না। সেগুলো মূলত পাতালপ্রাসাদ। মিসরের শাসকবর্গ ও হানাদাররা কেয়ামত পর্যন্ত এসব সমাধি খুঁজতে থাকবে…।
