আমি তোমার অপারগতা সম্পর্কে বেখবর নই। তোমার দূত আমাকে সব কথাই বলেছে। তবে আমি কাবার প্রভুর শপথ করে বলতে পারি, খৃস্টানদের রাজারা সবাই যদি ঝড়ের ন্যায়ও ছুটে আসে, আল্লাহর রাসূলের উম্মতদের। কোন ক্ষতি করতে পারবে না। উম্মত রক্ত দিতে জানে, জানে মাথা দিতে। কিন্তু একদল ঈমান বিক্রয়কারী গাদ্দার আমাদেরকে শিকল পরিয়ে রেখেছে। তুমি কায়রোতে আটকা পড়ে আছ। আমি বাগদাদ থেকে বের হতে পারছি না। নারী, মদ আর সোনার থলে আমাদের দুর্ভেদ্য প্রাচীরে ফাটল ধরিয়ে দিয়েছে। আমাদের ঘরে যদি শান্তি থাকত, স্বস্তি থাকত, তাহলে তুমি-আমি দুজনে মিলে ক্রুশের মোকাবেলা করতে পারতাম। কিন্তু কাফেররা এমন ফাঁদ পেতে রেখেছে যে, মুসলমানরাও কাফের হতে চলেছে। এই কাফের মুসলমানরা এতই অন্ধ যে, বুঝতেও পারছে না, দুশমন তাদের বোন-কন্যাদের ইজ্জত নিয়ে খেলা করছে। কার্কের মুসলমানরা যেরূপ মানবেতর জীবন-যাপন করছিল, তা আমি তোমাকে বলে বুঝাতে পারব না। খৃস্টানরা তাদের উপর যে অমানবিক নির্যাতন চালিয়েছিল, তা শুনলে তোমার গা শিউরে উঠবে। আমি জাতির গাদ্দারদেরকে কিভাবে বুঝব যে, দুশমনের সঙ্গে বন্ধুত্ব করা সরাসরি দুশমনি করার চেয়েও বেশী ভয়ংকর…।
তুমি দুঃখ প্রকাশ করেছ যে, তোমার ভাই, ভাল ভাল কর্মকর্তা ও সুযোগ্য কমান্ডারগণ তোমার হাতে নিহত হচ্ছে। শোন সালাহুদ্দীন! ওরা তোমার হাতে নিহত হচ্ছে, দুঃখের বিষয় এটা নয়। দুঃখজনক বিষয় হল, স্বজাতির কর্ণধার হওয়া সত্ত্বেও তারা গাদ্দারীর পথ বেছে নিল! মুসলমানের হাতে মুসলমান নিহত হচ্ছে দেখে খৃষ্টানরা উল্লাস করছে, এটা হল আফসোসের বিষয়। তুমি গাদ্দারদের ক্ষমা করতে পার না। গাদ্দারের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। আমি তোমার অপেক্ষা করছি। তুমি যখন আসবে, সঙ্গে বেশীসংখ্যক সৈন্য নিয়ে আসবে। খৃষ্টানরা তোমাদেরকে দুর্গের অভ্যন্তরে লড়াইয়ে লিপ্ত করিয়ে তোমাদের শক্তি নিঃশেষ করে দিতে চায়। এমন যেন না হয় যে, বাইতুল মোকাদ্দাসের পথেই তোমরা সব শক্তি হারিয়ে ফেলবে। তুমি যখন আসবে, মিসরের আভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রেখে আসবে। সুদানীদের ব্যাপারে সবসময় সতর্ক থাকতে হবে। আমি জানতে পেরেছি, তোমার আর্থিক সমস্যাও আছে। আমি তোমাকে সাহায্য করার চেষ্টা করব। নিজের সমস্যা নিজেই সমাধান করতে পারলে ভাল হবে। কায়রো থেকে যথাশীঘ্র বেরিয়ে আসার চেষ্টা কর। তবে ভেতর ও বাইরের পরিস্থিতি দেখে-শুনে আসবে। আল্লাহ তোমার সহায় হোন।
***
সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী উপস্থিত কমান্ডার-কর্মকর্তাদেরকে নুরুদ্দীন জঙ্গীর বার্তাটি পাঠ করে শোনান। তিনি তাদেরকে আশার বাণী শোনান যে, সেনাবহিনীতে ভর্তি হওয়ার জন্য পল্লী এলাকাসমূহ থেকে লোক আসতে শুরু করেছে। দুশমন কুসংস্কার বিস্তারের যে অভিযান শুরু করেছিল, তা সফলভাবে দমন করা হয়েছে। কিন্তু কোন কোন স্থানে এখনো তার ক্রিয়া রয়ে গেছে। একটি আবহ উঠেছিল দেশের বিভিন্ন মসজিদ থেকে। তাও কঠোর হাতে দমন করা হয়েছে। খৃস্টানরা আমাদের ধর্ম-বিশ্বাসে যেসব অলীক চিন্তা-চেতনার অনুপ্রবেশ ঘটানোর চেষ্টা করেছিল, তিন-চারটি মসজিদের ইমামও মানুষের মন-মস্তিষ্কে সেই চিন্তা-চেতনা ঢুকাতে শুরু করেছিল। তারা আল্লাহর দূত সেজে বসেছিল। আমি এমন মানুষেরও দেখা পেয়েছি, যে বিপদে পড়ে সরাসরি আল্লাহর নিকট দোয়া করার পরিবর্তে ইমামদেরকে নজরানা দিয়ে থাকে যে, ইমামরা তার জন্য দোয়া করবে। মানুষের মধ্যে এই বুঝ ছড়িয়ে দেয়া হয়েছিল যে, সাধারণ মানুষ না সরাসরি আল্লাহর নিকট কিছু চাইতে পারে, না আল্লাহ সরাসরি তাদের কথা শুনেন। সুলতান আইউবী বললেন, আমি সেই ইমামদেরকে অপসারণ করে সেই মসজিদগুলোতে এমন ইমাম নিয়োগ করেছি, যাদের বিশ্বাস ও চিন্তা-চেতনা কুরআনের অনুকূল। তারা এখন লোকদেরকে এই শিক্ষা দিচ্ছে যে, আল্লাহ আলেম-বেআলেম, ধনী-গরীব, রাজা-প্রজা সকলের জন্য সমান। তিনি সরাসরি যে কারো দোয়া শুনে থাকেন, ভাল কাজের পুরস্কার ও মন্দ কাজের শাস্তি প্রদান করেন। আমি আমার জাতির মধ্যে এই শক্তি ও চেতনা সৃষ্টি করার চেষ্টা করছি, যেন তারা নিজেদেরকে এবং আল্লাহকে চেনার চেষ্টা করে। আমার বন্ধুগণ! তোমরা তো দেখেছ, তোমাদের দুশমন শুধু যুদ্ধের ময়দানেই লড়াই করছে না, তারা তোমাদের মন-মগজে নতুন বিশ্বাস ও চেতনার অনুপ্রবেশ ঘটানোরও চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এ অভিযানে ইহুদীরা সকলের আগে। ইহুদীরা এখন আর তোমাদের মুখোমুখি এসে লড়াই করবে না। তারা তোমাদের ঈমানকে দুর্বল করার চেষ্টা করছে। এ কাজে তারা শীঘ্র সফল হতে না পারলেও ব্যর্থও হবে না। এমন একটি সময় আসবে, যখন আল্লাহর অভিশাপপ্রাপ্ত এই সম্প্রদায়টি মুসলমানদেরকে দুর্বল পেয়ে এমন চাল চালবে যে, তারা লক্ষ্য অর্জনে সমর্থ হবে- তাদের খঞ্জর সালতানাতে ইসলামিয়ার হৃদপিণ্ডে আঘাত হানবে। তোমরা যদি তোমাদের ইতিহাসকে এই যিল্লতির হাত থেকে রক্ষা করতে চাও, তাহলে আজই পূর্বপ্রস্তুতি গ্রহণ কর- জনগণের কাছে যাও। নিজেকে শাসক ও জনগণকে শাসিত ভাবতে ভুলে যাও। জনমনে এমন আত্মমর্যাদাবোধ জাগ্রত কর, যেন তারা দেশ-জাতি-দ্বীনের জন্য জীবন কুরবান করতে প্রস্তুত হয়ে যায়।
