মারকুনী নিজে কুদুমীর নিকট আহমার দরবেশের পয়গাম নিয়ে যায়। আহমার কোন সাধারণ ব্যক্তি নন। তিনি একজন পদস্থ সেনা কর্মকর্তা। আর মিসরে শাসন চলছে কার্যত সেনাবাহিনীর। কুদুমী আহমারকে ভালভাবে চেনে ও শ্রদ্ধা করে। মেয়েটি অম্লান বদনে সম্মত হয়ে যায়। মারকুনী তাকে জানায়, আমরা ফেরাউনের সমাধি থেকে হিরে-জহরত উদ্ধার করতে যাচ্ছি। শুনে কুদুমী এতই উৎফুল্ল হয়ে উঠে যে, সে এক্ষুণি যাওয়ার জন্য উদগ্রীব হয়ে ওঠে। মারকুনী অত্যন্ত সুচতুর ও সতর্ক মানুষ। মুখের কথায় রাণী কিওপেট্রা বানিয়ে ফেলে কুদুমীকে। কুদুমী একজন নর্তকী। তার চেতনা বলতে কিছু নেই। সে চেনে শুধু নিজের রূপ-যৌবন, অর্থ আর হিরে-জহরত। নিজের রূপ-যৌবনে কখনো ভাটা পড়বে না বলেই তার বিশ্বাস। মারকুনী তাকে একথা জানায়নি যে, সমাধি থেকে উদ্ধার করা গুপ্তধন কোথায় কি কাজে ব্যয় করা হবে।
পঞ্চাশজন লোক খুঁজে বের করতে পনের-বিশদিন কেটে যায়। তাদ্রের অধিকাংশ খৃস্টান নাশকতাকারী। অন্যরা মুসলমান। তারাও খৃস্টানদের নাশকতা কর্মী।
উটে চড়ে সবাই কায়রো থেকে বেরিয়ে যায়। তবে একত্রে নয়- তারা তিন তিনজন ও চার চারজনের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলে বিভক্ত হয়ে মুসাফির ও ব্যবসায়ীর বেশ ধরে আলাদা আলাদভাবে বেরিয়ে গেছে। কুদুমীকে নিয়ে যাওয়া হয় একজন পর্দানশীল সম্ভ্রান্ত বধূরূপে। মারকুনী সাজে তার স্বামী। কুদুমী ছাড়াও মারকুনীর সাথে আরো দুজন লোক, তাদের একজন খৃস্টান অপরজন মুসলমান। মুসলমানের নাম ইসমাইল। ইসমাইল আহমারের খাস লোকদের একজন। খৃস্টানদের দালাল, ভাড়াটিয়া খুনী। সমাজে তার কোন মর্যদা নেই কিন্তু মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিরা তাকে সালাম দিয়ে চলে। মারকুনীও তাকে ভালভাবেই চিনে এবং এ অভিযানের একজন বিশ্বস্ত কর্মী বলে মনে করে।
সকলেই ভিন্ন ভিন্ন রাস্তায় রওনা হয়। আঠার ক্রোশ দূরে কোথায় গিয়ে একত্রিত হতে হবে, তা সবাইকে জানিয়ে দেয়া হবে। সকলের সঙ্গে তীর ধনুক-তরবারী এবং রশি ও খননযন্ত্র।
সকলের আগে মারকুনী, ইসমাইল, কুদুমী ও তাদের অপর সঙ্গী গন্তব্যে পৌঁছে যায়। মারকুনী তাদেরকে পাহাড়ী এলাকার ভেতরে নিয়ে যায়।
সূর্য ডুবে গেছে। তারা তাঁবু স্থাপন করে। তাদের অন্যান্য সঙ্গীদের এ রাতেই এসে পৌঁছানোর কথা। ইসমাইল কুদুমীকে চেনে; কিন্তু কুদুমী ইসমাইলকে জানে না।
***
এক ময়দানে লড়াই করছেন নূরুদ্দীন জঙ্গী। কার্ক দুর্গ জয় করে সেখানকার এবং তার আশপাশের আরো কিছু এলাকার নিয়ন্ত্রণ সম্পন্ন করে ফেলেছেন তিনি। দূর-দূরান্ত পর্যন্ত টহল দিয়ে ফিরছে তার বাহিনী, যাতে খৃস্টানরা কোনদিক থেকে পাল্টা আক্রমণ করতে চাইলে যথাসময়ে তা প্রতিহত করা যায়। বিভিন্ন পয়েন্টে খৃস্টান বাহিনীর সঙ্গে সংঘাত- সংঘর্ষও চলছে তাদের।
উদ্ধারকৃত এলাকার নিয়ন্ত্রণভার সুলতান আইউবীর বাহিনীকে বুঝিয়ে দিয়ে বাগদাদ ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে চাইছেন নুরুদ্দীন জঙ্গী। আইউবীর অপেক্ষায় প্রহর গুণছেন তিনি। কিন্তু সুলতান আইউবী যুদ্ধে লিপ্ত অপর রণাঙ্গনে, যে রণাঙ্গন মিসরে খুলে বসেছে খৃস্টান ও তাদের মদদ পুষ্ট মুসলিম গাদ্দাররা। এ ময়দানই বেশী ভয়ংকর। তবে এমন আন্ডারগ্রাউন্ড যুদ্ধক্ষেত্রে লড়াই করার যোগ্যতা আছে সুলতান আইউবীর। মোকাবেলা করছেনও পুরোদমে। কিন্তু তৃতীয় আরো একটি যুদ্ধক্ষেত্র তৈরি হয়ে গেছে, তা এখনও জানতে পারেননি তিনি। এটি হল ফেরাউনদের সমাধি অনুসন্ধানের অভিযান।
রাতের আহারের পর হলরুমে প্রবেশ করেন সুলতান আইউবী। আলী বিন সুফিয়ান, গিয়াস বিলবীস এবং বেশ কজন ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তা কক্ষে উপস্থিত। সেদিনই নুরুদ্দীন জঙ্গীর দীর্ঘ একখানা পত্র সুলতান আইউবীর হস্তগত হয়। তিন্নি পত্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো উপস্থিত কর্মকর্তাদের পাঠ করে শোনান। সুলতান জঙ্গী লিখেছেন
প্রিয় সালাহুদ্দীন! আল্লাহ তোমাকে বাঁচিয়ে রাখুন ও নিরাপদ রাখুন। কার্ক ও তার আশপাশের এলাকাসমূহ এখন শত্রুমুক্ত। আমাদের সৈন্যরা দূর দূরান্ত পর্যন্ত টহল দিয়ে ফিরছে। মাঝে মধ্যে খৃস্টান সৈন্যদের সঙ্গে তাদের ছোটখাট সংঘাতও হচ্ছে। খৃস্টানরা আমাকে নানা কৌশলে বুঝাতে চাচ্ছে যে, তারা এখনো পরাজিত হয়নি। তোমার গড়া গেরিলা বাহিনী সত্যিই প্রশংসার যোগ্য। তারা বহু দূর-দূরান্ত পর্যন্ত চলে যাচ্ছে। তুমি তাদের উপর যে পরিশ্রম করেছ, তারা তার মূল্য পরিশোধ করছে। তোমার গোয়েন্দারা তাদের চেয়েও সাহসী ও বুদ্ধিমান। আমি এতদূরে বসে তাদেরই চোখে দুশমনের সব তৎপরতা প্রত্যক্ষ করছি…..।
সর্বশেষ তথ্য যা পেলাম, তাতে বুঝা যাচ্ছে, খৃস্টানরা আপাতত জবাবী আক্রমণ চালাবে না। তারা আমাদেরকে উৎসাহিত করছে, যেন আমরা এগিয়ে গিয়ে তাদের উপর আক্রমণ করি। তুমি তো জান, বাইতুল মোকাদ্দাস- যা আমাদের প্রথম কেবলা, আমাদের লক্ষ্য আমাদের থেকে কত দূরে। আমি জানি, তুমি এই দূরত্বকে ভয় পাওয়ার লোক নও। তবে দূরত্বটা যত না বেশী, তার চেয়ে বেশী পথের দুর্গমতা ও প্রতিবন্ধকতা। বাইতুল মুকাদ্দাস পর্যন্ত পৌঁছতে হলে পথে আমাদের অনেক দুর্গ জয় করে অগ্রসর হতে হবে। তন্মধ্যে কয়েকটি দুর্গ তো অত্যন্ত দুর্ভেদ্য। দূর-দূরান্তের এসব দুর্গ দ্বারা খৃষ্টানরা বাইতুল মোকাদ্দাসের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে শক্ত করে রেখেছে। তোমার গোয়েন্দারা আমাকে আরো জানিয়েছে যে, খৃষ্টানরা ইউনান, ল্যাটিন ও ইতালীয়দের নৌ-বাহিনীকে একত্রিত করার চেষ্টা করছে। তারা কামনা করছে যে, এ তিনটি রাহিনী একসঙ্গে মিসর আক্রমণ করে উত্তর এলাকায় সৈন্য নামিয়ে দিক। এমন পরিস্থিতির মোকাবেলা করার জন্য তোমাকে প্রস্তুত থাকতে হবে। তুমি তৈরি থাক। তোমাদের কাছে দূরে অগ্নিগোলা নিক্ষেপণযোগ্য মিনজানিকে বেশী থাকতে হবে। আমার পরামর্শ হল, উত্তর এলাকার মাটি যদি অনুমতি দেয়, তাহলে দুশমনের নৌ-বহরকে সমুদ্রের তীর পর্যন্ত আসতে দাও, ওখানে মোকাবেলা করার প্রয়োজন নেই। দুশমনকে এই আত্মপ্রবঞ্চনায় লিপ্ত হতে দাও যে, তারা তোমাদের অজ্ঞাতে মিসরে ঢুকে পড়েছে। সৈন্যরা জাহাজ থেকে কূলে নেমে আসার পর অগ্নিগোলা নিক্ষেপ করে জাহাজগুলোকে পুড়ে ফেল এবং খৃস্টান সৈন্যদেরকে পছন্দমত কোন এক ময়দানে নিয়ে কোণঠাসা করে ফেল…।
