আমি তাদের কাছে দুটি উটও দেখেছি। আরো থাকতে পারে, তবে আমি দেখেছি দুটোই।
তার মানে তারা বাইরেও আসে- আহমার দরবেশ বললেন- বাইরে তারা অবশ্যই আসে। পথচারীদের শিকার করতে বাইরে তাদের আসতেই হয়। শোন মারকুনী, কান পেতে শোন! ওখানে নিশ্চয়ই এমন একটি সোজা পথ আছে, যে পথে তারা বাইরে আসা-যাওয়া করে। সেটি পাহাড়ের কোন একটি গোপন পথ হবে। আমি তোমাদেরকে যে পথের কথা বলেছিলাম, তা এমন কোন পথ নয়, যে পথে বারবার আসা-যাওয়া করা যায়। ওখানে অন্য আরো একটি পথ আছে, যার সন্ধান ঐ হিংস্র উলঙ্গ মানুষগুলোর নিকট থেকে নেয়া যায়। কিভাবে নেয়া যায়, আমি তার পন্থা ভেবে দেখেছি। ওখানে যথারীতি হামলা করা যেতে পারে। তার জন্য তোমার এক সঙ্গী যেখানে খাদে পড়ে গিয়ে মারা গেছে। সেখানে আরো কিছু লোককে মারতে হবে। এই ত্যাগ অত্যন্ত জরুরী। তুমি বল, পঁচিশ-ত্রিশজন লোককে- যাদের মধ্যে নারী-শিশু বৃদ্ধও আছে- হত্যা করার জন্য এবং তাদের দু-তিনজনকে জীবিত ধরার জন্য; তোমার কত সৈন্যের প্রয়োজন? সর্বনিম্ন সংখ্যা বল। তুমি হবে সে বাহিনীর রাহবার ও সেনাপতি।
পরিকল্পনাটা আমি বুঝে ফেলেছি- মারকুনী বলল- আমার মাথায়ও একটা বুদ্ধি এসেছে। আমরা ওদেরকে হত্যা করতে পারি। দু-তিনজনকে জীবিত ধরাও সম্ভব। কিন্তু আমি আপনাকে এ নিশ্চয়তা দিতে পারি না যে, তারা ওখানকার সব গোপন তথ্য আমাদেরকে দেবে। গোত্রের অন্যদেরকে মরতে দেখে তারাও মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হয়ে যাবে, তবু মুখ খুলবে না। আমি এমন এক কৌশল অবলম্বন করব যে, তাড়া খেয়ে তাদের দুএকজন বাইরের দিকে পালাতে শুরু করবে আর আমরা তাদের পিছু নেব। আমাদের রাস্তা চেনা হয়ে যাবে।
তুমি বড় বিচক্ষণ মারকুনী!- আহমার দরবেশ বললেন- বল, কত লোকের প্রয়োজন?
পঞ্চাশজন- মারকুনী জবাব দেয়। অধিকাংশ লোক আমার নির্বাচিত হতে হবে, আমিই তাদেরকে খুঁজে নেব। তবে কার্যক্রম শুরু হওয়ার আগে আমি আমার শর্তের কথা জানাতে চাই।
তুমি দাবি অনুপাতে পুরস্কার পাবে- যা চাইবে ঠিক তা-ই দেব। আহমার বললেন।
আমি গুপ্তধনের ভাগ চাই- মারকুনী বলল- এমন একটি বিপজ্জনক অভিযান আমার দায়িত্বের আওতাভুক্ত নয়। আমি একজন গুপ্তচর ও নাশকতা কর্মী। আমাকে ফেরাউনের গুপ্তধন খুঁজে বের করার জন্য প্রেরণ করা হয়নি। এটা আপনার নিজের কাজ। পুরস্কার নয়। আমি চাই উদ্ধারকৃত ধনের ভাগ, যা চাইব ঠিক তা। আপনার পরিকল্পনা সফল হলে আপনি তো একটি প্রদেশের শাসনকর্তা হয়ে যাবেন; আর আমি গুপ্তচর গুপ্তচরই রয়ে যাব। কাজেই আমার সম্পদ চাই।
এ অভিযান কারো ব্যক্তিগত নয়- আহমার বললেন- এটি মিসর, কুশ ও সুদানের শাসন ক্ষমতা দখল করার খৃষ্টীয় পরিকল্পনা।
নিজ দাবিতে অনড় থাকে মারকুনী। বেকায়দায় পড়ে যান আহমার দরবেশ। আহমার জানেন র্যামন্সের সমাধি পর্যন্ত পৌঁছা মারকুনী ছাড়া আর কারো পক্ষে সম্ভব নয়। তার দাবি মেনে নেয়া ছাড়া উপায় নেই আহমারের। মারকুনী বলল, কতদিন পর্যন্ত মরুভূমিতে কাটাতে হবে তার কোন ঠিক নেই। শক্ত ও শুকনো খাবার আমি পছন্দ করি না। কাজেই, আমাকে অতিরিক্ত দু তিনটি উটও দিতে হবে, যা আমি সঙ্গীদের নিয়ে রান্না করে খাব। আর আর কুদুমীকেও দিতে হবে।
কুদুমীকে?- বিস্ময়ের সঙ্গে জিজ্ঞেস করলেন আহমার- এমন উঁচু স্তরের ভূবনমোহিনী রূপসী গায়িকাকে দেব তোমার সঙ্গে এমন বিপজ্জনক অভিযানে! আর সেও তো যেতে রাজি হবে না?
অতিরিক্ত বিনিময় দিলে সে রাজি হয়ে যাবে- মারকুনী বলল- আমি.. তার জন্য এমন ব্যবস্থা করে দেব যে, মেয়েটা টেরই পাবে না, সে মরুভূমিতে আছে নাকি কোন বিপজ্জনক মিশনের সঙ্গে আছে। আমি তার মূল্য বুঝি।
সে যুগের রীতি ছিল, কোন ধনাঢ্য ব্যবসায়ী সফরে গেলে প্রিয়তমা স্ত্রীকে সঙ্গে করে নিয়ে যেত। স্ত্রীদের মধ্যে কাউকে ভাল না লাগলে টাকার বিনিময়ে পছন্দমত কোন নর্তকী-গায়িকা কিংবা বেশ্যা মেয়েকে নিয়ে যেত। সেনা কমান্ডাররাও যুদ্ধের সময় স্ত্রী কিংবা ভাড়াকরা সুন্দরী কোন মেয়েকে সঙ্গে। রত। সে যুগে রূপসী যুবতী মেয়ে ছিল সোনার চেয়েও দামী। আর সে কারণেই ইহুদী-খৃস্টানরা সালতানাতে ইসলামিয়ার মূলোৎপাটনের জন্য নারীকে ব্যবহার করত। কাজেই মারকুনীর ন্যায় একজন দুঃসাহসী ও বিপজ্জনক অভিযানের নায়কের একটি সুন্দরী নর্তকীকে সঙ্গে নেয়ার দাবি করা অস্বাভাবিক কিছু ছিল না। কিন্তু আহমার দরবেশের মনে বিস্ময় সৃষ্টি করেছে তার কুদুমীর মত এমন এক পরমাসুন্দরী যুবতী নতকীর দাবি উত্থাপন করায়, যার গমনাগমন আমীর ও ধনাঢ্য ব্যক্তিদের নিকট। মেয়েটা সুদানের বাসিন্দা। মুসলমান। আর অতিশয় রূপসীই নয়- তার চালচলন, ভাবভঙ্গীমায়ও ছিল অনুপম এক যাদু। বড় বড় ব্যক্তিত্বদের দেমাগ সদা খারাপ করে রাখত মেয়েটা। এই কুদুমী মারকুনীর সঙ্গে বিপজ্জনক এক অভিযানে জনমানবশূন্য ধু-ধু মরু অঞ্চলে চলে যাবে, তা কল্পনায়ও আসে না। কিন্তু মারকুনীর কুদুমীকে চা-ই চাই। শেষ পর্যন্ত আহমার দরবেশকে প্রতিশ্রুতি দিতেই হল যে, ঠিক আছে, কুদুমীকে পাবে।
কার্যক্রম শুরু হয়ে যায়। পঞ্চাশ ব্যক্তির সন্ধানে নেমে পড়ে মারকুনী ও আহমার। কায়রোতে খৃস্টান গোয়েন্দা ও সন্ত্রাসীর অভাব নেই। মারকুনী অধিকাংশ লোক তাদের থেকেই নিতে চাইছে। কারণ, তারা তার বিশ্বস্ত। আহমার দরবেশেরও একই অভিমত। একটি নাশকতাকারী গ্রুপ আছে আহমার দরবেশেরও। সুলতান আইউবীর এই সেনাপতি তলে তলে, এ গ্রুপটিকে তৈরি করে রেখেছে। তারা সবাই মুসলমান। তাদের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য খৃস্টানদেরই ন্যায়। আহমার দরবেশ নিজের ঈমান নীলাম করে এ লোকগুলোকেও ঈমান বিক্রেতা বানিয়ে দিয়েছে। এরা সবাই সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর দুশমন। এদের ওঠাবসা হাসান ইবনে সাব্বাহর ফেদায়ীদের সঙ্গে। এই গ্রুপের মধ্য থেকেও কয়েকজনকে বাছাই করে নেয় আহমার দরবেশ।
