বাঁ-দিকে আরেকটি প্রশস্ত এলাকা। কয়েকটি মশাল জ্বলছে সেখানে। গাছ-গাছালি আছে সেখানেও। অন্তত পঁচিশজন নারী-পুরুষ ও শিশু গোল হয়ে নাচছে ও গাইছে। তাদের মধ্যখানে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। আগুনের উপর ঝুলছে হাত-পা বাঁধা একটি মানুষের লাশ। আগুনে ছেকা হচ্ছে লাশটাকে। মারকুনী বুঝতে পারে এটা তার সঙ্গীর মৃতদেহ। মাথার চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত সর্বাঙ্গ শিউরে ওঠে মারকুনীর। ভয়ানক এই দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে আছে সে। আগুনের পাশে দাঁড়িয়ে আছে লাঠিওয়ালা বৃদ্ধ। লাশের দেহের গোশত কেটে সকলের মাঝে বন্টন করছে বৃদ্ধ।
দৃশ্যটা গভীর রেখাপাত করে মারকুনীর মনে। আর স্থির থাকতে পারল না সে। ফিরে রওনা হয় পিছন দিকে- যেদিক থেকে এসেছিল সেদিকে। পথটা মনে আছে তার। সতর্ক পায়ে চলছে মারকুনী। হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে যায় পোলসেরাতসম সেই দেয়ালের কাছে, যার উপর থেকে পড়ে গিয়ে মারা গিয়েছিল তার এক সঙ্গী। খাদের ভেতর থেকে শিয়ালের চেঁচামেচির শব্দ শুনতে পায় মারকুনী। মারকুনী বুঝতে পারে, জংলী শিয়ালরা তার সঙ্গীর লাশটা ছিঁড়েকুড়ে খাচ্ছে আর চেঁচামেচি করছে। তার অপর সঙ্গীকে ভক্ষণ করছে জংলী মানুষ। বাতাসের এখন তেজ নেই। মারকুনী অন্ধকারে সাবধানে দেয়ালটা পার হয়ে ওপার চলে যায়।
রাতের এখন শেষ প্রহর। মারকুনী ও তার সঙ্গীদ্বয় যেখানে তিনটি উট রেখে পায়ে হেঁটে পাহাড়ে ঢুকে পড়েছিল, পৌঁছে যায় সেখানে। এবার এক মুহূর্তও দেরী করবে না সে। উটের সঙ্গে বাঁধা মশক থেকে এক ঢোক পানি পান করার বিলম্বও সহ্য হচ্ছে না তার। চড়ে বসে একটি উটের পিঠে। সঙ্গে নিয়ে নেয় অপর দুটি। হাঁটতে শুরু করে উট।
***
পরদিন সন্ধ্যাবেলা। একজন সম্ভ্রান্ত মিসরী বণিকের বেশে আহমার দরবেশের ঘরে প্রবেশ করে মারকুনী। মারকুনীকে দেখেই আহমার জিজ্ঞেস করে, তুমি একা কেন? অন্য দুজন কোথায়?
জবাব না দিয়েই ধপাস করে একটি চেয়ারে বসে পড়ে মারকুনী। হুঁশ-জ্ঞান ঠিক নেই তার। আহমারকে ইঙ্গিতে সামনে বসতে বলে। আহমার মারকুনীর সামনে মুখোমুখি বসে পড়ে। কিছুটা শান্ত হয়ে কথা বলতে শুরু করে মারকুনী। অভিযানের প্রতিটি মুহূর্ত ও প্রতি পদের কাহিনী শুনিয়ে যায় আহমারকে।
মারকুনীর দুসঙ্গীর করুণ মৃত্যুতে একবিন্দু দুঃখ প্রকাশ করলেন না আহমার। তিনি যখন শুনতে পেলেন যে, উলঙ্গ হিংস্র মানুষগুলো মারকুনীর এক সঙ্গীকে খেয়ে ফেলেছে, তখন তিনি আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, আচ্ছা, তুমি কি নিজ চোখে দেখেছ যে, ওদের কারো পরনেই কাপড় নেই? তুমি কি সত্যিই বৃদ্ধের লাঠির মাথায় সাপের ফণা দেখেছ? তুমি কি ভালভাবেই দেখেছ যে, তারা আমাদের লোকটির গোশত খাচ্ছে? অভূতপূর্ব কৌতূহল আহমার দরবেশের কণ্ঠে।
আমি আপনাকে স্বপ্নের কাহিনী শোনাচ্ছি না- শান্ত সমাহিত কণ্ঠে বলল মারকুনী- আমার মাথার উপর দিয়ে যে ঝড় বয়েছিল, আমি আপনাকে তারই বিবরণ দিচ্ছি। নিজ চোখে যা যা দেখেছি, তা-ই আমি আপনাকে শোনাচ্ছি।
ফেরাউনও এ কথাই বলেছেন, যা তুমি শুনিয়েছ আহমার দরবেশ বসা থেকে উঠে মারকুনীর কাঁধে হাত রাখলেন এবং আনন্দের আতিশয্যে অনেকটা চীৎকার করে বললেন- তুমি রহস্য উদঘাটন করে ফেলেছ মারকুনী! এরাই সেই লোক, আমি যাদের সন্ধান করছিলাম। এই গোত্রটি ষোল শতক পর্যন্ত ওখানে বসবাস করছে। এরা ভাবতেও পারেনি যে, কালের বিবর্তন তাদেরকে মানুষের গোশত খেতে বাধ্য করবে। কাগজের লেখাগুলো তুমি পড়তে পারবে না, আমি পড়তে সক্ষম হয়েছি। তাতে লেখা আছে, ধনভাণ্ডারের রক্ষণাবেক্ষণ করবে সাপ। কিন্তু আমার সমাধির হেফাজত করবে মানুষ, যারা কয়েক শতক পর সাপ ও হিংস্র প্রাণীতে পরিণত হয়ে যাবে। আমার সমাধির সীমানায় কোন মানুষ প্রবেশ করলে রক্ষীরা তাকে খেয়ে ফেলবে। কালের বিবর্তন তাদেরকে উলঙ্গ করে ফেলবে। কিন্তু আমি যেখানে আমার অন্য জগতের ঘর তৈরি করেছি, সেখানে তাদেরকে পোশাক পরান হবে। বাইরের কোন মানুষ তাদের গুপ্তাঙ্গের প্রতি দৃষ্টিপাত করতে পারবে না। যে-ই তাকাবে, সে ওখান থেকে প্রাণ নিয়ে ফিরতে পারবে না।
আমি তো জীবিত ফিরে এসেছি! মারকুনী বলল।
কারণ, তুমি নীচে যাওনি- আহমার বললেন- তুমি কালো রঙের যে পাথুরে পাহাড়ের কথা বলেছ, তারই পাদদেশে কোন এক স্থানে র্যামন্সের লাশ ও ধনভাণ্ডার লুকিয়ে রাখা আছে। আর এই উলঙ্গ মানুষগুলো? এদের পূর্বপুরুষরা ব্যামন্সের সময় থেকে ওখানে পাহারার দায়িত্ব পালন করছে। তাদের মৃত্যুর পর তাদের বংশধর একের পর এক এ দায়িত্ব পালন করে আসছে। এভাবে পনের-ষোল শতাব্দী কেটে গেছে। আমি বলতে পারব না, ওরা কি খেয়ে জীবন বাঁচায়। বোধ হয় হিংস্র প্রাণীর ন্যায় তারা মরুভূমির পথিকদের শিকার করে সিদ্ধ করে খায়। ওখানে পর্যাপ্ত পানি আছে। খেজুরেরও অভাব নেই। কাজেই ওদের বেঁচে থাকা বিস্ময়কর নয়। তারা আজও ফেরাউনকে খোদা বলে বিশ্বাস করে। তাদের বিশ্বাসে যদি ফাটল ধরত, তাহলে তারা ওখানে থাকত না। তুমি কি তাদের কাছে কোন অস্ত্র দেখেছ?
না।
সংখ্যায় তারা কতজন হবে?
রাতে যখন তারা একত্রিত ছিল, তখন পঁচিশজন ছিল।
এমনই হবে। এর চেয়ে বেশী হওয়ার কথায় নয়।
