এই জাহান্নামে এমন সবুজ-শ্যামল এলাকা চোখের ভেল্কি নয় তো? না, মারকুনী যা দেখছে, সবই সত্য, বাস্তব। এই ভূখণ্ডের ঘ্রাণই একটু আগে মারকুনী অনুভব করেছিল।
তার থেকে সামান্য সামনে কতগুলো পাহাড় দেখতে পায় মারকুনী। পাহাড়গুলো মাটিরও নয়, বালিরও নয়- পাথরের। রং কালচে। হঠাৎ মারকুনী নিজে দ্রুত বসে পড়ে, টেনে সঙ্গীকেও বসিয়ে দেয়। আরো একটি বিস্ময়কর কি যেন দেখতে পেয়েছে সে। দুজন মানুষ নিম্নভূমিতে এদিকেই এগিয়ে। আসছে। আপাদমস্তক উলঙ্গ। এক চিলতে সুতাও নেই পরনে। গায়ের রং গাঢ় বাদামী। বেশ সুদর্শন। লোকগুলো পুরুষ।–
হঠাৎ করে একদিক থেকে বেরিয়ে আসে এক মহিলা অন্যদিকে হেঁটে যাচ্ছে সে। সেও মাথা থেকে পা পর্যন্ত বিবস্ত্র। মাথার চুলগুলো এলোমেলো, হাঁটু পর্যন্ত লম্বিত। আকার-গঠনে এদের কাউকেই কাফ্রি বা জংলী বলে মনে হয় না।
এরা প্রেতাত্মা- মারকুনীর সঙ্গী বলল- এরা মানুষ নয় মারকুনী! সূর্য ডুবে যাচ্ছে। চল, পেছনের দিকে পালিয়ে যাই। রাতে এরা আমাদেরকে মেরে ফেলবে। তুমি বিশ্বাস কর মারকুনী! আর কিছু সময় এখানে কাটালে আমরা জীবিত ফিরে যেতে পারব না! চল, পেছন দিকে ফিরে যাই।
মারকুনীরও ধারণা, এরা মানুষ নয়, অন্য কিছু হবে। তবু সঙ্গীকে বুঝাতে চেষ্টা করছে, এরা মানুষই; তুমি অহেতুক ভয় পাচ্ছ। মারকুনী নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করছে, আসলে এরা কি? মানুষই যদি হয়ে থাকে, তাহলে এরা কারা? এমন উলঙ্গ কেন? এরা তো বাতাসে উড়ছে না; মাটিতেই হাঁটছে। দূরে একস্থানে তিনটি শিশুকে দৌড়াদৌড়ি-ছুটাছুটি করতে দেখতে পায় মারকুনী। শিশুগুলো এদেরই সন্তান হবে নিশ্চয়। ওদের চলাফেরা তো ঠিক মানুষেরই ন্যায়।
মারকুনী উপুড় হয়ে পেটে ভর করে সরিসৃপের ন্যায় সামনে এগিয়ে যায়। তার সঙ্গীও তার পার্শ্বে গিয়ে শুয়ে পড়ে। দুজন শুয়ে শুয়ে পর্যবেক্ষণ করছে। ওখানকার দেয়ালগুলো খাড়া নয়- কিছুটা ঢালু। বালিও প্রচুর। মারকুনীর সঙ্গী বোধ হয় আরো একটু সামনে এগুবার চেষ্টা করে কিংবা কি হল কে জানে, হঠাৎ সে পড়ে যায় এবং গড়াতে গড়াতে নীচে গিয়ে পতিত হয়।
ওখান থেকে উপরে উঠে আসা অসম্ভব। মারকুনী পেছনে সরে গিয়ে এমন একটি পাথরের আড়ালে গিয়ে আত্মগোপন করে, যেখান থেকে নীচের অবস্থা দেখা যায়। মারকুনীর সঙ্গী যে ঢালু দিয়ে নীচে পড়ে গেল, তার উচ্চতা ত্রিশ কি চল্লিশ গজের বেশী হবে না। মারকুনী দেখতে পেল, তার সঙ্গী ওঠে আসার চেষ্টা করছে। সে তার সঙ্গীকে কোন সাহায্য করতে পারছে না।
যে উলঙ্গ পুরুষ দুজন স্বাভাবিক গতিতে এদিকে আসছিল, তারা এবার দৌড়াতে শুরু করে। দৃশ্যটা উপর থেকে দেখে ফেলে মারকুনী। কিন্তু তার সঙ্গী বিষয়টা টের পায়নি। মারকুনী তাকে ডাক দিয়ে সতর্কও করতে পারছে না। এখানে কোন মানুষ আছে, তা বুঝতে দিতে চাইছে না সে। লোক দুজন এসে মারকুনীর সঙ্গীকে পেছন থেকে ঝাঁপটে ধরে। তার সঙ্গে খঞ্জর আছে, আছে ছোট তরবারীও। কিন্তু অস্ত্র খুলে হাতে নেয়ার মওকা পেল না সে। লোক দুজন তাকে টেনে নীচে নামিয়ে ফেলে। যে উলঙ্গ মহিলা দুজন কোথাও যাচ্ছিল, ছুটে আসে তারাও। এসে পড়ে ক্রীড়ারত শিশুরাও। তারা নিজ ভাষায় কাকে যেন ডাক দেয়। কোথা থেকে ছুটে আসে দশ-বারজন মানুষ। তারাও সবাই উলঙ্গ। একজন তার বন্ধুর কোমর থেকে তরবারীটা খুলে নেয়। মাটিতে ফেলে দেয়া হয় লোকটাকে। মারকুনী উপর থেকে দেখতে পায়, লোকগুলো তরবারী দ্বারা তার সঙ্গীর ধমনী কেটে ফেলে। দর দর করে লাল টাটকা রক্ত বেরুতে শুরু করে। সবাই নাচতে শুরু করে। কি যেন গাইছে তারা। খিলখিল করে হাসছেও। এমন সময় ক্ষীণকায় এক বৃদ্ধ এসে পড়ে। তার হাতে তার দেহের উচ্চতার সমান লম্বা একটি লাঠি। তাকে দেখে সবাই একদিকে সরে দাঁড়ায়।
বৃদ্ধের পরনেও কিছু নেই- উলঙ্গ। তার লাঠির মাথায় দুটি সাপের ফণা। ফেরাউনদের বৈশিষ্ট্যমূলক চিহ্ন এটা। বৃদ্ধ মারকুনীর সঙ্গীর গায়ে হাত লাগায়। সে এখন নিথর। মারা গেছে মারকুনীর সঙ্গী। বৃদ্ধ নিজের এক হাত উপরে তুলে ধরে আকাশের দিকে তাকিয়ে কি যেন বলে। তার সঙ্গে উলঙ্গ মানুষগুলো যাদের মধ্যে দুজন নারী এবং কয়েকটি শিশু রয়েছে- সেজদায় লুটিয়ে পড়ে। বৃদ্ধ এখন কি যেন বলছে। সে পুনরায় উপরে হাত উঠায়। এবার সবাই সেজদা থেকে উঠে দাঁড়ায়। একজন বৃদ্ধকে ঢালুর দিকে ইঙ্গিত করে বলছে, লোকটা ওদিক থেকে নীচে গড়িয়ে পড়েছে। বৃদ্ধের ইশারা পেয়ে তারা মারকুনীর সঙ্গীর মৃতদেহটা তুলে নিয়ে যায়। মারকুনীর মনে ভয় জাগে, এই রহস্যময় মানুষগুলো উপরে উঠে দেখে কিনা যে, নীচে পড়ে যাওয়ার লোকটার সঙ্গে আর কেউ ছিল কিনা। দীর্ঘক্ষণ পর্যন্ত নীচের দিকে তাকিয়ে থাকে মারকুনী।
সূর্য ডুবে গেছে। জীবনের মায়া ত্যাগ করেছে মারকুনী। জীবন যায় যাক, এ জায়গা এবং এই মানুষগুলোর ভেদ-রহস্য উদ্ধার করবেই সে। তরবারীটা তুলে নেয় ডান হাতে। বাঁ-হাতে খঞ্জর। এদিক-ওদিক তাকিয়ে হাঁটা দেয় একদিকে।
রাতের অন্ধকার গাঢ় হচ্ছে ধীরে ধীরে। কোথাও কোন আওয়াজ নেই, শব্দ নেই। ভয়ংকর নীরবতা বিরাজ করছে এলাকায়। ডান-বাঁয়ে ও পেছনের দিকে কান রেখে সামনের দিকে এগিয়ে চলছে মারকুনী। নিম্নাঞ্চলের পাশ ঘেঁষে এগুচ্ছে সে। এবার ক্ষীণ কণ্ঠের শব্দ তার কানে আসতে শুরু করে। শব্দটা ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে। খানিক পর সে যে আওয়াজটা শুনতে পায়, তা নাচ-গান ও শোরগোলের আওয়াজ। আওয়াজটা যেদিক থেকে আসছে, সেদিকে এগিয়ে যায় মারকুনী। দেখতে পায় এক ভয়ংকর দৃশ্য।
