এটিও একটি গলিপথ। মারকুনী যত সামনে অগ্রসর হচ্ছে, পথটা ততই প্রশস্ত হচ্ছে। মারকুনী সঙ্গীর দিকে তাকিয়ে বলে, আমাদের সৌভাগ্য যে, যেদিকেই যাই পথ পেয়ে যাই। তাও একটিমাত্র পথ। পথ একাধিক হলে ধাঁধায় পড়ে যাওয়ার আশংকা ছিল।
গলি শেষ হয়ে গেছে। শেষ প্রান্তের রাস্তাটা বেশ প্রশস্ত। সামনে পাহাড়ের চড়াই। এখনও তীব্র বাতাস বইছে। এই ভয়ানক এলাকায় কতদূর পর্যন্ত এসে পৌঁছেছে, সে হিসাব নেই মারকুনীর। সে এতটুকুই জানে যে, জগত থেকে তার সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে গেছে। ক্রুশের নামে দেওয়ানা হতে চলেছে মারকুনী। ফেরাউনের সমাধি খুঁজে বের করার উদ্দেশ্য সম্পর্কে সে এতটুকুই জানে যে, সেখান থেকে উদ্ধারকৃত সম্পদ দ্বারা মুসলমানদের ক্রয় করে তাদেরকে ইসলামী সাম্রাজ্যেরই বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হবে এবং পৃথিবীতে ক্রুশের রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত করা হবে।
সন্ত্রস্ত সঙ্গীকে নিয়ে সম্মুখে এগিয়ে চলে মারকুনী। এখন তারা যেদিকে অগ্রসর হচ্ছে, বাতাস সেদিক থেকেই প্রবাহিত হচ্ছে। পাহাড়ের চড়াই সরে গেছে ডানে-বাঁয়ে। সামনে সুবিস্তৃত নীল আকাশ চোখে পড়ছে। মারকুনী চড়াই বেয়ে উপরে উঠছে।
হঠাৎ দাঁড়িয়ে যায় মারকুনী। নাক টেনে বাতাস শুঁকে সঙ্গীকে বলে, তুমিও শুঁকে দেখ, বাতাসের ঘ্রাণে পাহাড়ী এলাকার ঘ্রাণ না?
তোমার মাথাটা আসলেই খারাপ হয়ে গেছে- মারকুনীর সঙ্গী বলল পাহাড়ী এলাকায় পাহাড়ের ঘ্রাণ থাকবে না তো থাকবে কী? তুমি বোধ হয় ভাবছ, তুমি এখন ইতালীতেই আছ। তোমার নাকে সম্ভবত তোমার বাড়ির ঘ্রাণ আসছে।
সঙ্গীর খোঁচামারা কথায় মারকুনীর কোন ভাবান্তর ঘটল না। চেহারায় তার অন্য প্রতিক্রিয়া। বাতাস শুঁকে শুঁকে কি যেন উপলব্ধি করার চেষ্টা করছে সে। তারপর সঙ্গীকে বলল, তুমি বোধ হয় ঠিকই বলেছ যে, পাহাড়ের কাঠিন্য আমার মস্তিষ্কে প্রভাব বিস্তার করে ফেলেছে। এখানে তো পানি থাকতে পারে না। আমি সম্ভবত কল্পনায় খেজুর, সবুজ-শ্যামলিমা ও পানির ঘ্রাণ শুকছি। এসব ঘ্রাণ তো আমার চির পরিচিত। বোধ হয় আমার ঘ্রাণশক্তি আমাকে ধোকা দিচ্ছে। এই জাহান্নামে পানির চিহ্নও থাকার কথা নয়।
মারকুনী!- হঠাৎ মারকুনীর সঙ্গী তার বাহু চেপে ধরে তাকে থামিয়ে দেয় এবং বলে- আমিও একটি ঘ্রাণ শুকছি- মৃত্যুর ঘ্রাণ। মনে হচ্ছে আমরা মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। চল বন্ধু! যেদিক থেকে এসেছি, সে-পথেই ফিরে যাই। তুমি যদি মনে কর আমি ভীরু, তাহলে তুমি আমাকে যুদ্ধের ময়দানে পাঠিয়ে পরীক্ষা নাও, দেখবে আমি একশ মুসলমানের গলা না কেটে মরব না। লোকটির কণ্ঠে ভীতির ছাপ, দুচোখে টলটলায়মান অশ্রুর ফোঁটা।
মারকুনী স্বল্পবাক মানুষ। সঙ্গীর কাঁধে হাত রেখে মুচকি একটা হাসি দিয়ে বলল, আমরা একশ নয়- এক হাজার মুসলমানের গলা কাটব; তারপরও মরব না। তুমি আমার সঙ্গে থাক।
মারকুনী সঙ্গীকে নিয়ে পাহাড়ের চড়াই বেয়ে উপরের দিকে উঠতে শুরু করে। চড়াই বেশী উঁচু নয়। সূর্যটা পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়েছে। এখন আর রোদের তাপ নেই, কিরণও নেই। সারাদিনের ক্লান্তিতে পা আর এগুতে চাচ্ছে না। তারা সামনের দিকে ঝুঁকে ঝুঁকে পা টেনে হাঁটছে। একসময় পৌঁছে যায় পাহাড়ের শীর্ষ চূড়ায়। ধূলিবালিতে তাদের চোখ-মুখ সর্বাঙ্গ মলিন হয়ে গেছে। দুচোখ মেলে দেখে মারকুনী। সামনে ঢালু ও ছোট ছোট পাথর। একটি পাথরের উপর উঠে দাঁড়ায় সে। সঙ্গীকে ডাক দিয়ে হঠাৎ বসে পড়ে। সঙ্গীকে উদ্দেশ করে বলে, তোমার যদি মরুভূমি সম্পর্কে ভাল অভিজ্ঞতা থাকে, তাহলে তুমি বুঝতে পারবে সামনে মরিচিকা দেখা যাচ্ছে। সামনের দিকে তাকিয়ে দেখ, ওটা আসলেই মরুভূমি কিনা।
সঙ্গী মাথা উঁচু করে সামনের দিকে তাকায়। চক্ষুদয় বন্ধ করে আবার খোলে। আবার গভীরভাবে নিরীক্ষা করে তাকায়। সে সিদ্ধান্তে উপনীত হয়, ওটা মরিচিকা নয়।
দৃশ্যটা আসলেই মরিচিকা ছিল না। কতগুলো খেজুর গাছের মাথা তাদের চোখে পড়ছিল। পাতাগুলো হরিদ্রা বর্ণের। গাছগুলোর অবস্থান নিম্ন এলাকায় বলে মনে হল বেশ দূরে।
মারকুনী পাথরের উপর থেকে নেমে সম্মুখে চলে যায়। এবার মনে ভয় ধরে গেছে দুঃসাহসী খৃস্টান সেনাকমান্ডার মারকুনীর। সঙ্গী পেছনে পেছনে হাঁটছে তার। জায়গাটায় নানা বর্ণ ও নানা আকারের পাথরখণ্ড ছড়িয়ে আছে এখানে-ওখানে। কোনটি এমন, যেন একজন মানুষ হাঁটুতে মাথা গেড়ে বসে আছে। কোনটি বেশ বড়, কোনটি হোট। এগুলোর ফাঁকে পথের সন্ধান করছে মারকুনী।
সূর্যটা পশ্চিম আকাশে আরো নীচে নেমে গেছে। পাহাড়ের চূড়াগুলো স্পর্শ করছে যেন অস্তাচলগামী লাল সূর্যটা। নিঃশ্বাসের গতি বেড়ে গেছে মারকুনীর। ভয়ের তীব্রতায় বুকটা ধড়-ফড়, দুরু দুরু করছে। পা টেনে টেনে পেছনে পেছনে হেঁটে চলে অসহায় সঙ্গী।
হঠাৎ দাঁড়িয়ে যায় মারকুনী। মোড় না ঘুরিয়েই ধীরে ধীরে সরতে শুরু করে পেছন দিকে। মনে হয় মারকুনী ভয়ংকর কিছু দেখেছে। সঙ্গীও তার কাছে এসে দাঁড়ায় এবং বিস্ময়ভরা চোখে তার প্রতি তাকায়।
***
একটি নিম্ন এলাকা দেখতে পাচ্ছে মারকুনী ও তার সঙ্গী। এলাকাটির বিস্তার এক বর্গ মাইলের কম নয়। চারপাশে মাটি ও বালির উঁচু উঁচু প্রাকৃতিক দেয়াল। এলাকাটা সবুজ-শ্যামলে ঢাকা। কোথাও উঁচু, কোথাও নীচু। অনেকগুলো খেজুর গাছ চোখে পড়ছে। বুঝা যাচ্ছে, ওখানে প্রচুর পানি আছে।
