হঠাৎ গরম বাতাসের ঝাঁপটা তীব্র হতে শুরু করে। বাতাসের ঝাঁপটা খেয়ে বালুকারাশি উড়তে শুরু করে। সঙ্গে সঙ্গে কতগুলো নারীর কান্নার আওয়াজ ভেসে আসতে লাগল। তারা শুনতে পাচ্ছে যে, দু-তিনজন নারী একযোগে উচ্চকণ্ঠে ক্রন্দন করছে। মারকুনীর সঙ্গীরা ঘাবড়ে যায়। মারকুনী কান খাড়া করে বিষয়টা অনুধাবন করার চেষ্টা করে। এক সঙ্গী বলল, এই জাহান্নামে কোন মানুষ জীবিত থাকতে পারে না; এরা মানুষ নয়- প্রেতাত্মা।
এসব কিছুই নয়- মারকুনী বলল- প্রেতাত্মাও নয়, জীবন্ত নারীও নয়। এটা বাতাসের শব্দ। এ এলাকায় কোন কোন টিলায় লম্বা লম্বা ছিদ্রপথ আছে, যা উভয় দিক থেকে ভোলা। কোন কোন টিলা এমন যে, সেগুলোর গা ঘেঁষে যখন বাতাসের ঝাঁপটা অতিক্রম করে, তখন এ ধরনের শব্দ সৃষ্টি হয়, যা তোমরা এ মুহূর্তে শুনতে পাচ্ছ। এতে আমাদের ভয় পাবার কিছু নেই।
তবু মারকুনীর সঙ্গীদের ভয় কাটছে না। মারকুনীর ব্যাখ্যায় তারা আশ্বস্ত হতে পারছে না যে, এ কান্নার শব্দ কোন জ্বিন-ভূত বা প্রেতাত্মার নয়। মারকুনীর ব্যাখ্যা তারা মেনে নিতে পারল না।
বাতাসের গতি তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। উড়ন্ত বালুকারাশি মেঘের মতো ছেয়ে গেছে। ফলে এখন আর বেশী দূর পর্যন্ত দেখা যায় না। প্রথমে মারকুনী দেয়ালের উপর পা রাখে। জায়গাটা এত কাঁচা যে, বালি মাটিতে মারকুনীর পা ধসে যায়। মারকুনী আরেক পা তুলে সম্মুখে অগ্রসর হয়। তাকায় নীচের দিকে। খাদের গভীরতা দেখে দুঃসাহসী অভিযাত্রী মারকুনীর সর্বাঙ্গ কেঁপে উঠে। খাদের তলা দেখা যায় না। মনে হচ্ছে এর কোন তলা-ই নেই।
মারকুনী কয়েক পা এগিয়ে যায়। এখানে ডানে-বাঁয়ে কোন টিলা নেই। মারকুনী হাওয়ার উপর দাঁড়িয়ে আছে যেন। কান্নার শব্দ আরো উচ্চ হয়ে যায়।
মারকুনী তার সঙ্গীদের বলল, পা টিপে টিপে সাবধানে এগিয়ে আস। নীচের দিকে একদম তাকাবে না। এই ভেবে অগ্রসর হও, যেন তোমরা সমতল ভূমিতে হাঁটছ।
মারকুনীর সঙ্গীদ্বয় পূর্ব থেকেই ভীত-সন্ত্রস্ত। পা কাঁপছে, হাঁটু থর থর করছে। কাঁপছে মাথা থেকে পা পর্যন্ত। তবু দেয়ালের উপর উঠে তারা কয়েক পা অগ্রসর হয়। প্রবলবেগে বয়ে যাওয়া বাতাস তাদের পা উপড়ে ফেলে। গা দুলতে শুরু করে। মারকুনী তাদের সাহস যোগাচ্ছে আর ধীরে ধীরে সম্মুখে অগ্রসর হচ্ছে।
দেয়ালের মধ্যখানে পৌঁছে যায় মারকুনী। সামনে দেয়ালের কিছু অংশ ভাঙ্গা এবং নীচু। প্রস্থ এত কম যে, দাঁড়িয়ে হাঁটা সম্ভব নয়। মারকুনী বসে পড়ে এবং ঘোড়ার পিঠে বসার মত করে দুপা দুদিকে ছড়িয়ে দিয়ে সে অবস্থায়ই সামনে অগ্রসর হতে থাকে। দেয়ালের প্রস্থ ক্রমান্বয়ে ক্ষীণ ও গোল হয়ে চলেছে। মারকুনী খুব সাবধানে অগ্রসর হতে থাকে। পেছনে তার সঙ্গীদ্বয়ও এগিয়ে আসছে। হঠাৎ এক সঙ্গীর ভীতিপ্রদ আর্তচীৎকার ভেসে আসে মারকুনী, আমাকে ধর।
কিন্তু ধরার জন্য তার কাছে যাওয়া কারো পক্ষে সম্ভব নয়। লোকটি একদিকে কাৎ হয়ে যায় এবং কোন অবলম্বন না থাকার কারণে পড়ে যায়। তার চীৎকারের শব্দ শুনছে মারকুনী ও তার অপর সঙ্গী। শব্দটা ক্রমান্বয়ে দূরে চলে যায়। তারপর ধপাস করে ভারী কোন বস্তু পড়ে গেলে যেরূপ শব্দ হয়, তেমন একটা আওয়াজ শোনা যায় এবং চীৎকারের শব্দ থেমে যায়। সঙ্গীর পরিণতি বুঝতে বাকী নেই মারকুনীর। মারকুনী নীচের দিকে তাকায়। জাহান্নামসম অতল খাদে পড়ে যাওয়া সঙ্গীর আর্তচীকারের ধ্বনি ভয়ানক এই বিরান ভূমিতে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে এখনো।
আমাকে তোমার সঙ্গে রাখ মারকুনী- অপর সঙ্গী বলল। কণ্ঠস্বর থর থর করে কাঁপছে তার- আমি এমন করে মরতে চাই না।
মারকুনী তার সঙ্গীকে সাহস যোগায়। নিজে সামনে অগ্রসর হতে থাকে। দেয়াল এখন উপরের দিকে উঠছে। মারকুনী বসে বসেই এগিয়ে চলছে। নারী কণ্ঠের সেই ক্রন্দন শব্দ এখনো কানে আসছে যথারীতি। পড়েযাওয়া সঙ্গীর চীৎকারধ্বনিও প্রতিধ্বনির ন্যায় ঘুরে ফিরছে।
এখন দেয়ালটা কিছু চওড়া। মারকুনী মোড় ঘুরিয়ে সঙ্গীর হাত ধরে। ধীরে ধীরে দেয়াল বেয়ে দুজন উঠে যায় উপরে। দেয়াল খানিকটা পুরু হওয়ার কারণে কিছুটা অনায়াসে এগুতে পারার কথা। কিন্তু বাতাসের গতি এতই তীব্র যে, ভারসাম্য রক্ষা করে চলা দুষ্কর। তারা ধীরে ধীরে এগিয়ে চলে। এক সময় দেয়াল পার হয়ে তারা সমতল ভূমিতে এসে পৌঁছে। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে মারকুনী। পাশাপাশি সঙ্গীর নির্মম মৃত্যুতে তার বুকটা বেদনায় ভারী হয়ে উঠে। স্বস্তির নিঃশ্বাসের সঙ্গে বেরিয়ে আসে সঙ্গী হারানোর বেদনার দীর্ঘশ্বাস।
সম্মুখে দুটি টিলার মধ্যখান দিয়ে একটি সংকীর্ণ পথ। একমাত্র সঙ্গীকে নিয়ে তার মধ্যে ঢুকে পড়ে মারকুনী। মারকুনীর সঙ্গী তাকে জিজ্ঞেস করে, জেফ্রে কি মরেই গেল? কোনভাবে কি তাকে উদ্ধার করা কিংবা এক নজর দেখা যায় না? আমরা কি লোকটাকে এভাবে রেখেই ফিরে যাব?
সঙ্গীর প্রতি তাকায় মারকুনী। তার চোখে-মুখে গাম্ভীর্যের ছাপ। তারপর একটি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে না সূচক মাথা নাড়ে। মারকুনীর চোখে পানি এসে গেছে। কিছু না বলে অপর সঙ্গীর কাঁধে হাত রেখে সান্ত্বনা দেয়। তারপর ধীরপায়ে সম্মুখপানে এগিয়ে চলে।
