মারকুনী সুড়ঙ্গের শেষ প্রান্তে গিয়ে পৌঁছে। সুড়ঙ্গ থেকে বের হয়ে আপাতত স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে তারা। দাঁড়িয়ে যায় তিনটি উট। মারকুনী চারদিক দৃষ্টি নিক্ষেপ করে নতুন জায়গাটি দেখে নেয় এক নজর। এখানে চতুর্দিকে পুরাতন একটি দুর্গের সুউচ্চ অনেকগুলো প্রাচীর চোখে পড়ল। দুর্গটি মানুষের নির্মিত নয়- প্রাকৃতিক। এলাকাটি মূলত পাহাড়ী। পাহাড়গুলো তিন চারশ গজ পর্যন্ত ঢালু। কোনটি অনেক উঁচু, কোনটি নিচু। গোলাকার এই জায়গাটা চারদিক থেকেই বন্ধ বলে মনে হল। মারকুনী উটগুলো একস্থানে বসিয়ে রেখে সঙ্গীদের নিয়ে পায়ে হাঁটতে শুরু করল। বালি-মাটির পাহাড়। হাঁটতে হচ্ছে পা টিপে টিপে। পা ফসকে পড়ে যাওয়ার আশংকা প্রবল।
এলাকায় কোন রাস্তা পাওয়া গেল না। একটি পাহাড়ের কোল ঘেঁষে পায়ে হাঁটা যায়, এমন একটি ফাঁকা জায়গা। সে পথ ধরেই হাঁটছে মারকুনী ও তার সঙ্গীরা। এলাকার মাটি ও টিলা প্রমাণ করছে, শত শত বছর যাবত এখানে কোন মানুষের পা পড়েনি।
কিছুদূর অগ্রসর হওয়ার পর মারকুনী ও তার সঙ্গীদের প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়ে উঠে। ডানদিকের পাহাড়ের কোলঘেঁষে পা টিপে টিপে হাঁটার চেষ্টা করছে অভিযাত্রী দল। বাঁ-দিকের এলাকাটি নীচের দিকে চলে গেছে অনেক দূর পর্যন্ত। এটি সুবিশাল ও গভীর এক গর্ত। এখান থেকে নীচে পতিত হওয়া মানে নির্ঘাত মৃত্যু। গর্তের অপর পাড়েও উঁচু উঁচু পাহাড়।
তুমি কি বিশ্বাস কর যে, র্যামন্স ফেরাউনের জানাযা এ-পথে অতিক্রম করেছিল? মারকুনীকে জিজ্ঞেস করল তার এক সঙ্গী।
আহমার দরবেশ তো এ পথের কথাই বলেছেন- মারকুনী বলল- আমি নকশাটা যতটুকু বুঝতে পেরেছি, তাতে বুঝা যায়, আমাদের রাস্তা এটিই। র্যামন্সের মৃতদেহ অতিক্রম করেছিল অন্য পথে। সে পথটি আমাদের খুঁজে বের করতে হবে। সেটি ছিল একটি গোপন পথ, যা শত শত বছরের ব্যবধানে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। সে পথটি খুঁজে বের করতে পারলে আমরা র্যামন্স-এর সমাধি পেয়ে যাব।
যদি বেঁচে থাকি, তবেই তো!
হ্যাঁ, আমি এ ব্যাপারে কোন নিশ্চয়তা দিতে পারি না- মারকুনী বলল-তবে এ নিশ্চয়তা দিতে পারি যে, সমাধি পর্যন্ত যদি পৌঁছতে পারে, তাহলে তোমাদের দুজনকে লাল করে দেব।
কিছুদূর অগ্রসর হওয়ার পর পথ এখন খানিকটা চওড়া। পার্শ্বের গর্তের পরিধিও শেষ হয়ে গেছে। সম্মুখে এমন দুটি পাহাড়, যার পাদদেশ একটির সঙ্গে অপরটি মিলিত। এ দুপাহাড়ের মধ্যখান দিয়ে তারা ঢুকে পড়ে। সামান্য অগ্রসর হওয়ার পর এখন সামনে আর পথ নেই। পাহাড় দুটি এখানে এসে মিলে গেছে। তারা বা-দিকে উপরে ওঠে যায়। শ খানেক গজ উপরে ওঠার পর সরু একটি গলি চোখে পড়ে। গলিটি সেখান থেকে বেয়ে গেছে নীচের দিকে। চারদিকের পাহাড়ী পরিবেশ অত্যন্ত ভীতিকর মনে হল। তারা সরু গলিপথ বেয়ে নীচের দিকে নেমে যায়।
কয়েকটি বাঁক ঘুরে আরা নীচে নেমে আসে। সম্মুখে বিশাল-বিস্তৃত সুগভীর এক খাদ। এত গভীর যে, খাদের তলদেশ দেখা যায় না। চারদিকে পাহাড় আর পাহাড়। সে এক ভীতিকর পরিবেশ। গলিপথ অতিক্রম করে বাইরে বের হয়ে এ দৃশ্য দেখেই কয়েক পা পিছিয়ে আসে মারকুনী ও তার সঙ্গীরা।
এখানকার আবহাওয়া প্রচণ্ড গরম। মাটির সঙ্গে কি যেন এক ধাতু মিশ্রিত, যার তাপেই গরমটা এত অসহ্যকর। পাহাড়ের পাদদেশে বালুকারাশি চিকচিক করছে। সূর্যতাপ এত প্রখর যে, বালি থেকে খুঁয়ার মত উঠছে।
খাদের এক পার্শ্বে আপনা-আপনি গড়ে উঠা একটি দেয়াল চোখে পড়ল। এটি মূলত মাটি ও বালির টিলা, যা দেখতে দেয়ালের মত। টিলার উপরটা যতটুকু চওড়া, নীচটাও ঠিক ততটুকু। পুরু আধা হাতের বেশী হবে না। উপরটা কোথাও গোলাকার, যার উপর দিয়ে অতিক্রম করা অত্যন্ত বিপজ্জনক। তবে মারকুনীকে খাদ পার হতে হলে এই দেয়াল বেয়েই হতে হবে, যা পোলসেরাত অতিক্রম করার নামান্তর। দেয়ালটার দৈর্ঘ্য পঞ্চাশ গজেরও বেশী হবে। মারকুনীর এক সঙ্গী বলল, আমার মতে এর উপর দিয়ে অতিক্রম না করে তুমি আত্মহত্যার অন্য কোন ভাল পথ বেছে নাও।
গুপ্তধনের ভাণ্ডার রাস্তায় পড়ে থাকে না- মারকুনী বলল- আমাদেরকে এ পথেই অতিক্রম করতে হবে।
আর ফসকে নীচে জাহান্নামের আগুনে পড়তে হবে। বলল অপর সঙ্গী।
আমরা কি ক্রুশে হাত রেখে শপথ করিনি যে, ক্রুশের মর্যাদা ও ইসলামের মূলোৎপাটনের জন্য প্রয়োজনে আমরা জীবন দেব? মারকুনী বলল আমাদের সহকর্মীরা কি যুদ্ধের ময়দানে জীবন উৎসর্গ করছে না? আমি কাপুরুষের ন্যায় ফিরে গিয়ে আহমার দরবেশকে বুঝ দিতে পারি যে, শত শত বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর সেখানকার সব পথ বন্ধ হয়ে গেছে। যেখানে নদী ছিল, এখন সেখানে পাহাড় আর নকশার যেখানে পাহাড় দেখান হয়েছে, সেখানে এখন কিছুই নেই; কালের বিবর্তনে সব উলট-পালট হয়ে গেছে। কিন্তু আমি কাপুরুষ সাজতে পারব না, আমি মিথ্যা বলব না। তোমাদের মত আমার মনেও ভয় ধরে গেছে। আমি তার বিরুদ্ধে লড়াই করছি। তোমরা আমার মনের ভীতি বৃদ্ধি কর না বন্ধুরা। তোমরা যদি আমার সঙ্গ না দাও, তাহলে তা ক্রুশের সঙ্গে প্রতারণা বলে গণ্য হবে এবং তার শাস্তি হবে বেদনাদায়ক। আমি তোমাদের আগে আগে হাঁটব। কোথাও পা ফসকে পড়ার আশংকা দেখা দিলে বসে পড়বে; ঘোড়ার পিঠে যেভাবে বস, ঠিক সেভাবে। তারপর বসে বসেই সামনে অগ্রসর হতে থাকবে।
