***
১৯৪৭ সালের মার্চ মাসের শেষ দিন। কায়রো থেকে আঠার ক্রোশ দূরে একস্থানে তিনটি উট দাঁড়িয়ে আছে। প্রতিটি উটের পিঠে একজন করে আরোহী। প্রত্যেকের মুখমণ্ডল কাপড় দিয়ে ঢাকা। একজন চোগার পকেট থেকে চওড়া একটি কাগজ বের করে। খুলে গভীর দৃষ্টিতে দেখে সঙ্গীদের বলে, ঠিক আছে, জায়গা এটাই। তিনজনই উটের পিঠে বসা। তার ইশারা পেয়ে উট তিনটি সামনের দিকে অগ্রসর হতে শুরু করে।
সম্মুখে দেয়ালের মত খাড়া দুটি টিলা মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। মাঝখানে সরু রাস্তা, যেখান দিয়ে একটি উট চলতে পারে। এক সারিতে উট তিনটি ভেতরে ঢুকে পড়ে। ভেতরের পর্বতগুলো আকারে এমন, যেন ছাদবিহীন বিশাল এক প্রাসাদ। বালির অন্তহীন সমুদ্রে এ পার্বত্য এলাকাটি তিন-চার মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত। বাইরে এখানে-ওখানে অনেকগুলো টিলা ও চত্বর। পেছনে শক্ত মাটির পাহাড়।
সূর্য অস্ত যাওয়ার অনেক আগেই এখানে সন্ধ্যা হয়ে যায়। কেউ কখনো এ ভূতুড়ে পার্বত্য এলাকার ভেতরে প্রবেশ করার সাহস করেনি। করবেই বা কেন, এর অভ্যন্তরে অনুপ্রবেশ করার প্রয়োজনই তো কারো হচ্ছে না। মরুভূমির মুসাফিরদের প্রয়োজন পড়ে শুধু পানির। কিন্তু এমন শুষ্ক পার্বত্য অঞ্চলে পানি পাওয়া যাবে ভুলেও তো ভাবে না কেউ।
এলাকাটি মানুষের কোন গমন পথের পার্শ্বেও নয়। মাইলের পর মাইল দূর থেকে চোখে দেখা যায় শুধু। এলাকা সম্পর্কে জনসমাজে অনেক ভীতিকর কল্পকাহিনী প্রচলিত আছে। মানুষ বলাবলি করে, এটি নাকি শয়তানের আড্ডাখানা। আল্লাহ যখন শয়তানকে আকাশ থেকে জমিনে নামিয়ে দেন, তখন শয়তান এখানেই অবতরণ করেছিল। সামরিক দিক থেকেও এলাকাটির কোন গুরুত্ত নেই। সে কারণে সৈন্যরাও কখনো এ এলাকার ভেতরে প্রবেশ করার প্রয়োজন অনুভব করেনি।
মিসরের এ ভয়ংকর ভূখণ্ডের ইতিহাসে এ তিনজন মানুষই বোধ হয় প্রথম, যারা এর অভ্যন্তরে অনুপ্রবেশ করল। এর ভেতরে তাদের ঢুকতে হবেই। কারণ, পুরাতন দলিল-দস্তাবেজ ও নকশা এ স্থানকেই চিহ্নিত করছে। সন্দেহে ফেলে দিল শুধু নকশার একটি রেখা। রেখাটা একটি নদীর। কিন্তু এখানে কখনো কোন নদী ছিল না। চিহ্নিত স্থানে এখন চোখে পড়ছে অনেকখানি লম্বা একটি নিম্নাঞ্চল, যার প্রস্থ বার কি চৌদ্দ হাত। ভেতরের বালির আকার আকৃতি প্রমাণ করছে, শত শত বছর আগে এ পথে পানি প্রবাহিত হত। এই নিম্নাঞ্চলের পরিধি নিকটে কোথাও গিয়ে থেমে যাওয়ার পরিবর্তে চলে গেছে নীল দরিয়া অভিমুখে। উষ্ট্ৰচালকরা নিশ্চিত যে, তারা যে জায়গার অনুসন্ধান করছে, এটিই সে জায়গা।
অভিযানের দলনেতা মারকুনী ও তার দুসঙ্গী সবাই খৃস্টান। তারা সুলতান আইউবীর এক কমান্ডার আহমার দরবেশ- এর দিক-নির্দেশনায় ফেরাউন। র্যামন্স দ্বিতীয়-এর সমাধির অনুসন্ধানে এসেছে। নকশা অনুযায়ী সঠিক জায়গায় এসে উপনীত হয়েছে তারা। এবার ভেতরে ঢুকে দেখতে হবে নকশার তথ্য কতটুকু সঠিক।
মারকুনী স্বাভাবিক কণ্ঠে তার সঙ্গীদের বলল, নিজেকে খোদা দাবিদার ফেরাউন নিজের শেষ বিশ্রামাগার এ জাহান্নামে বানাতে এসেছে, তা আমার বিশ্বাস হয় না। আহমার ও হরমুন আমাদেরকে অনর্থক এক পরীক্ষায় ফেলে দিলেন!
মারকুনী কঠিনপ্রাণ মানুষ। হিম্মত হারাবার মত লোক নয়। সকলের সামনে এগিয়ে চলছে সে। পেছনে সঙ্গীরা। অনেকখানি ভেতরে ঢুকে পড়েছে তারা। এলাকার রূপ-আকৃতি একস্থানে একরকম। মাটির রং কোথাও গাঢ় বাদামী, কোথাও খয়েরী, কোথাও বা লাল। স্থানে স্থানে বালির উঁচু উঁচু ঢিবি। কোথাও মাটির খাড়া টিলা। ঢালু পাহাড়ের ঢাল বেয়ে বালি গড়িয়ে পড়ছে দেখা যাচ্ছে।
আরো অনেকখানি এগিয়ে যায় মারকুনী। সামনে আর পথ নেই। মারকুনী ডানে-বাঁয়ে তাকায়। একদিকে একটি টিলা চোখে পড়ে তার। টিলার মধ্যখানে এমনভাবে ফাটা, যেন ভূমিকম্পে ফেটে ফোকর হয়ে গেছে। মারকুনী সেই ছিদ্রপথে উঁকি দিয়ে দেখতে পায়, একটি গলিপথ চলে গেছে অনেক দূর পর্যন্ত। উটের চলা কঠিন হবে মনে হয়। তবু মারকুনী তার উটটি ঢুকিয়ে দেয় সরু গলির ভেতর। পেছনে পেছনে ঢুকে পড় অন্য দুজন সঙ্গীও। দুপার্শ্বের টিলার দেয়াল ঘেঁষে এগিয়ে চলতে শুরু করে উটগুলো। আরোহীরা পা বাইরে রাখতে পারছে না। তাই তুলে রেখে দিয়েছে উটের উপর। উটগুলোর পেটের ঘষায় টিলার দেয়ালের মাটি খসে নীচে পড়ছে। পথটা ক্রমেই উঠে গেছে উপরদিকে। মারকুনী এগিয়ে চলছে সঙ্গীদের নিয়ে। উটের পায়ের আঘাতে দুপার্শ্বের টিলা দুটো কেঁপে উঠছে। মনে হচ্ছে, এই বুঝি টিলা দুটো ভেঙ্গে পড়ে দুদিক থেকে চাপা দিয়ে পিষে ফেলবে তিনটি উট ও তাদের চালকদের।
সামনে অগ্রসর হয়ে উপরদিকে তাকায় মারকুনী। দূর উপরে টিলার উভয় চূড়া পরস্পর মিশে গেছে। সম্মুখে আবছা অন্ধকার। কিন্তু দূরে একস্থানে আলোর মত চোখে পড়ে, যাতে মারকুনীর মনে আশা জাগে, ও পর্যন্তই গলি শেষ; তারপর প্রশস্ত জায়গা।
সরু গলিপথটি এখন যেন একটি সুড়ঙ্গ। উটের পায়ের আওয়াজ ভীতিকর এক গুঞ্জরণ সৃষ্টি করে চলেছে তাতে। মারকুনী সামনের দিকে এগিয়ে চলে। রাস্তা এখানে একটিই; ফলে পথ ভোলার আশংকা নেই। সামনে যে আলো পরিলক্ষিত হচ্ছিল, তা ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠছে আর সুড়ঙ্গপথ শেষ হয়ে আসছে।
