সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর যুগেরও পূর্বে খৃস্টানদের জানা ছিল, মিসর গুপ্তধনের দেশ। খৃস্টানরা যে কটি কারণে মিসর দখল করতে চাইছিল, এটিও তার একটি কারণ। দীর্ঘ সংঘাত-লড়াইয়ের পর খৃস্টানদের কাছে যখন সালাহুদ্দীন আইউবীকে পরাজিত করে মিসরের দখল নেয়া কঠিন মনে হল, তখন তারা ভাবতে শুরু করল যে, মিসরীয়দের কারো দ্বারা-ই এসব গুপ্ত ধনভাণ্ডারের সন্ধান করতে হবে এবং সেই অমূল্য সম্পদ উদ্ধার করে কাজে লাগাতে হবে।
খৃস্টানরা যেভাবে হোক জানতে পারল যে, মিসর সরকারের পুরাতন কাগজপত্রে এমন কিছু তথ্য ও নকশা রয়েছে, যাতে কিছু কিছু সমাধির দিক নির্দেশনা দেয়া আছে। কিন্তু সেসব কাগজ উদ্ধার করা তো আর সহজ ব্যাপার নয়। খৃস্টানরা শুধু এ তথ্য নেয়ার জন্য মিসরে দক্ষ ও অভিজ্ঞ গুপ্তচর পাঠায় যে, কাগজগুলো কোথায় আছে এবং কিভাবে গায়েব করা যায়। কিন্তু সংশ্লিষ্ট বিভাগের দায়িত্বশীলদের হাত করা সম্ভব ছিল না। সুলতান আইউবী যে সময়ে কার্ক ও শোবকের লড়াই নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন এবং যে ঘোলাটে পরিস্থিতিতে তার অনুপস্থিতিতে মিসর ষড়যন্ত্রের উর্বর ভূমি ও বিদ্রোহের অগ্নিগর্ভের রূপ ধারণ করেছিল, সেই সুযোগে খৃস্টানদের গোয়েন্দা প্রধান হরমুন এ ব্যাপারে সাফল্য অর্জন করেন যে, সুলতান আইউবীর সেনাবাহিনীর পদস্থ এক কমান্ডার আহমার দরবেশকে হাত করে নেন। আহমার ছিলেন সুদানী। তার বিরুদ্ধে গাদ্দারীর কোন অভিযোগ ছিল না। সুলতান আইউবীর পরম আস্থাভাজন ছিলেন তিনি। তিনি সুলতান আইউবীর কমান্ডে যুদ্ধও করেছেন। সেনাবাহিনীতে বেশ সুনাম ছিল তার। পরে জানা গেল যে, এক খৃস্টান মেয়ে আহমারের মস্তিষ্কে সুদানপ্রেম ও সুলতান আউইবীর বিরোধী চেতনা জাগিয়ে তুলেছিল। এসথিনা নাম্মী এই মেয়েটি আহমারকে মিসরের সীমান্ত অঞ্চলের কিছু এলাকার শাসনক্ষমতা দেয়ার প্রলোভন দেখিয়েছিল। লোকটি ছিল মুসলমান, কিন্তু খৃস্টানরা তার মাথায় এ দর্শন ঢুকিয়ে দেয় যে, তুমি আগে সুদানী, পরে মুসলমান।
নূরুদ্দীন জঙ্গী যখন কার্ক দুর্গ জয় করে নেন এবং সালাহুদ্দীন আইউবী মিসরে গাদ্দারদের মূলোৎপাটনে ব্যস্ত, ততক্ষণে আহমার দরবেশ কয়েকজন খৃস্টান গুপ্তচরের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক করেছেন। তিনি কারো মনে এমন কোন সন্দেহ পর্যন্ত জাগ্রত হতে দেননি যে, তিনি দুশমনের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধছেন। প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র পর্যন্ত তিনি সকলের কাছে এতই বিশ্বস্ত যে, অনায়াসে তিনি পুরনো দলিল-দস্তাবেজ পর্যন্ত পৌঁছে যান। সেখান থেকে তিনি খৃস্টানদের কাঙ্খিত কাগজপত্রগুলো চুরি করে নিয়ে আসেন।
আহমার দররেশ যা চুরি করে আনল, সেগুলো মূলত কাগজ নয়- কাগজ ও কাপড়ের মাঝামাঝি একটা কিছু। তাতে স্পষ্ট ভাষায় কিছু লেখা নেই, আছে কতগুলো আঁকিবুকি দাগ ও কিছু নকশা-নমুনা। লেখাজোখা কিছু থাকলেও তা সেই ফেরাউনী আমলের ভাষা, যা বুঝবার উপায় নেই।
আহমার দরবেশ কাগজগুলো খৃস্টানদের হাতে তুলে দেন। তারা অনেক চিন্তা-গবেষণা করে, তা থেকে যা উদ্ধার করে তার মর্ম হল, কায়রো থেকে প্রায় আঠার ক্রোশ দূরে একটি পরিত্যক্ত পাহাড়ী অঞ্চল অবস্থিত। যার ভেতরে সম্ভবত হিংস্র প্রাণীও অনুপ্রবেশ করে না। তার-ই অভ্যন্তরে এক স্থানে কোন এক ফেরাউনের সমাধি।
তথ্যটি কতটুকু সঠিক, তা কেউ জানে না। তবু ভাগ্য পরীক্ষা করে দেখবে আহমার। এটা যে ফেরাউনের সমাধি, তার নাম র্যামন্স দ্বিতীয়। তার সমাধি অনুসন্ধান ও খনন করার জন্য খৃস্টানরা কায়রোতে কজন চতুর, বিচক্ষণ ও অভিজ্ঞ গোয়েন্দা প্রেরণ করে। মারকুনী তাদের দলনেতা। ইতালীর অধিবাসী মারকুনী একজন অভিজ্ঞ পর্যটক ও পর্বত বিশেষজ্ঞ। আহমারের নির্দেশনায় তারা এমন ছদ্মবেশ ধারণ করেছে যে, তাদের আসল রূপ ধরার উপায় নেই কারো। তাদের দুজন এখন আহমারের গৃহভৃত্য। আহমারের সহযোগিতায় এরা ফেরাউনদের সমাধি খনন করে মহামূল্য সম্পদ, হিরা জহরত উদ্ধার করবে। তারপর খৃস্টানরা সেই সম্পদ ব্যবহার করবে সুলতান আইউবীর বিরুদ্ধে নাশকতামূলক কাজে, ফেদায়ীদের পেছনে ব্যয় করে সুলতান আইউবীকে খুন করাবে। বিনিময়ে যখন মিসর খৃস্টান কিংবা সুদানীদের দখলে আসবে, তখন খৃষ্টানরা আহমারকে কোন এক এলাকার গবর্নর বানাবে। এতকিছুর বিনিময়ে এই হবে আহমারের পুরস্কার। আহমার এ দায়িত্বও বরণ করে নিয়েছে যে, এই গুপ্তধন অনুসন্ধানকালীন যদি সুলতান আইউবী খৃস্টান কিংবা সুদানীদের উপর আক্রমণ করে বসেন, তাহলে তিনি তার বাহিনীকে আইউবীর যুদ্ধ পরিকল্পনার বিপক্ষে ব্যবহার করবেন।
মিসর থেকে ফেরাউনী গুপ্তধন উদ্ধার করে খৃস্টানদের হাতে তুলে দেয়াই এখন আহমারের একমাত্র মিশন। লোকটির দেল-দেমাগ সম্পূর্ণরূপে খৃস্টানদের কজায়। অভিযানের যে দুসদস্য ভৃত্যবেশে তার ঘরে অবস্থান করছিল, মারকুনীর নেতৃত্বে তাদেরকে সমাধি অভিমুখে রওনা করিয়ে দেন। তিনি। জায়গার নকশাটাও সঙ্গে দিয়ে দেন। অপর এক গোয়েন্দার মাধ্যমে হরমুনের নিকট সংবাদ পৌঁছান যে, গুপ্তধন অনুসন্ধানের অভিযান শুরু হয়ে গেছে। হরমুন কনফারেন্সে খৃস্টান সম্রাট প্রমুখদের অবহিত করেন যে, এ সমাধির সন্ধান যদি পেয়েই যাই, তাহলে তা থেকে যে পরিমাণ সম্পদ উদ্ধার হবে, তা দ্বারা মিসরীয়দের হাতেই মিসরের মূল উপড়ে ফেলা যাবে। হরমুনের মুখে সম্ভাব্য সাফল্যের আনন্দের দ্যোতি।
