আরো সিদ্ধান্ত নেয়া হয় যে, ইউনানী, লাতিনী ও ফ্রিংকীদেরকে অতিশীঘ্র প্রস্তুত করা হবে, যাতে তারা সমুদ্রের তীরে মিসরের উত্তর-পশ্চিমের এতটুকু এলাকা দখল করে নেবে, যাকে ঘাটিরূপে ব্যবহার করা যায় এবং ফিলিস্তীনের প্রতিরক্ষা ও মিসর আক্রমণে কাজে লাগান যায়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে সিদ্ধান্তটি গ্রহণ করা হয়, তাহল ইসলামী ভূখণ্ডে মুসলমানদের চরিত্র ধ্বংসের কার্যক্রম তীব্রতর করে তুলতে হবে।
মিসরের সীমান্ত এলাকাগুলোতে মুসলমানদের মধ্যে কুসংস্কার ও ইসলামবিরোধী চিন্তা-চেতনা সৃষ্টি করার লক্ষ্যে পরিচালিত খৃষ্টানদের যে মিশনটি সাফল্যের দোড়গোড়ায় উপনীত হওয়ার পর নস্যাৎ করে দেয়া হয়েছে, গোয়েন্দা মারফত সে সংবাদ কেন্দ্রে পৌঁছে গেছে। গোয়েন্দারা খৃস্টান কর্মকর্তাদের কাছে এ সংবাদও পৌঁছায় যে, আমাদের নিয়োজিত ব্যক্তিরা যেসব মুসলমানদেরকে দলে ভিড়িয়েছিল, তারাই তাদেরকে পিটিয়ে হত্যা করেছে।
বৈঠকে এ তথ্যও পরিবেশন করা হয় যে, অধিকৃত এলাকাগুলোতে মুসলমানদের জীবনধারাকে দুর্বিষহ করে তোলা হয়েছে। জীবনে অতিষ্ঠ হয়ে তারা দলে দলে দেশ ছেড়ে পালাচ্ছে। আমরা তাদেরকে শান্তিতে-নিরাপদে পালাতেও দিচ্ছি না। আমরা পলায়নপর কাফেলার পথরোধ করে তাদের সর্বস্ব লুটে নিচ্ছি এবং মেয়েদেরকে অপহরণ করে নিয়ে আসছি।
বৈঠকে এ পদক্ষেপটির প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করে বলা হয় যে, মুসলিম নিধনের এটি একটি উত্তম পন্থা।
বৈঠকে একটি সিদ্ধান্ত এই গ্রহণ করা হয় যে, মুসলমানদের মধ্যে খৃস্টবাদের প্রচার করতে হবে। তার জন্য প্রয়োজন বিরাট অংকের বাজেট। এ কাজ পূর্ব থেকেই পরিচালিত হয়ে আসছে এবং অর্থও দেদারছে ব্যয় হচ্ছে। কিন্তু তাতে কিছু সমস্যাও সৃষ্টি হয়েছে। একটি সমস্যা হল, যথাস্থানে অর্থ প্রেরণ করতে হচ্ছে উটের মাধ্যমে। বেশ কবার এমনও হয়েছে যে, অর্থ ও স্বর্ণমুদ্রা বোঝাই উট মিসরের সীমান্ত প্রহরীদের হাতে ধরা পড়েছে কিংবা দস্যুদের হাতে লুণ্ঠিত হয়েছে। এ সমস্যার সমাধানে এমন একটি পন্থা বের করে নেয়া দরকার যে, অর্থ-কড়ি, সোনা-দানা ও অন্যান্য মূল্যবান বস্তু সেখান থেকেই হস্তগত করা যায়, যেখানে এগুলো ব্যয় করতে হবে। দীর্ঘদিন যাবত এ নিয়ে মাথা ঘামান হচ্ছে। খৃষ্টানদের ইন্টেলিজেন্স প্রধান হরমুন সালাহুদ্দীন আইউবীর গোয়েন্দা প্রধান আলী বিন সুফিয়ানেরই ন্যায় অস্বাভাবিক বিচক্ষণ ব্যক্তিত্ব। তিনি আগেই ভেবে ঠিক করে রেখেছেন যে, মিসরের ভূমি নিজের মধ্যে এত অধিক সম্পদ লুকিয়ে রেখেছে, যা দ্বারা গোটা পৃথিবীকে ক্রয় করা সম্ভব। কিন্তু সেসব ধন-ভাণ্ডার হস্তগত করা আকাশের তারকা হাতে নেয়ার সমান। এসব ধন-ভান্ডার ফেরাউনদের সমাধিস্থলে পুঁতে রাখা আছে। ইতিহাস থেকে জানা যায়, যখন কোন ফেরাউন মৃত্যুবরণ করত,তখন তার সঙ্গে তার রাজকীয় সব ধন-সম্পদ, সোনা-দানা, হিরা-জহরত পুঁতে রাখা হত। মিসর থেকে ফেরাউনদের এসব গুপ্তধন উদ্ধার করে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করার কথাই ভাবছেন হরমুন।
ফেরাউনদের দাফন করার জন্য মাটির নীচে বিশাল পরিসরের একটি মহল নির্মাণ করা হত। ফেরাউনরা নিজেরাই নিজেদের জীবদ্দশায় এই মহল তৈরি করে রেখে যেত। তার জন্য তারা এমন একটি স্থান বেছে নিত, যেখানে পৌঁছা কারো পক্ষে যেন সম্ভব না হয়। মৃত্যুর পর নিয়ম অনুযায়ী তাকে তথায় দাফন করে সমাধিস্থলটি এমনভাবে বন্ধ করে দেয়া হত যে, নির্মাণকারী কারিগররা ছাড়া অন্য কারো জানা সম্ভব হত না যে, এটি কিভাবে খোলা যাবে। দাফন কাজ সমাপ্ত করার পর মৃত ফেরাউনের স্বজনরা মহল নির্মাতা কারিগরদের মেরে ফেলত।
ফেরাউনদের বিশ্বাস ছিল, তারা খোদা। আরেক বিশ্বাস ছিল, মৃত্যুর পরও তাদের এই প্রভাব-প্রতিপত্তি ও ক্ষমতা বহাল থাকবে। এই বিশ্বাসের ভিত্তিতে তারা পাহাড় কেটে এবং পাহাড়ের নীচে মাটি খনন করে প্রাসাদোপম হলঘর ও অন্যান্য কক্ষ তৈরি করিয়ে তাতে বিপুল পরিমাণ হিরা-জহরত ও সোনা রূপা গচ্ছিত রাখত। তাছাড়া ভেতরে লাশের সঙ্গে ঘোড়াগাড়ী, ঘোড়, গাড়োয়ান ও মাঝি-মাল্লাসহ নৌকা রেখে দিত। সেবার জন্য দাস-দাসী এবং সুন্দরী নারীও সঙ্গে দেয়া হত। সব মিলে অবস্থা এই দাঁড়াত যে, মারা গেল একজন মানুষ, আর তার সঙ্গে দাফন করা হল বিপুল পরিমাণ ধন-সম্পদ ও অসংখ্য মানুষ। সবশেষে বিশেষ প্রক্রিয়ায় এমনভাবে সমাধির মুখ বন্ধ করে দেয়া হত, যেখানে প্রবেশ করা দুনিয়ার কারো পক্ষে সম্ভব নয়।
ফেরাউনী যুগের পরিসমাপ্তি ঘটার পর যখনই যে রাজা মিসরের শাসন ক্ষমতায় আসীন হন, সবাই ফেরাউনদের সমাধিগুলো খুঁজে বের করার চেষ্টা করেন। কিন্তু সকলেই ব্যর্থ হন। ব্যক্তিগত উদ্যোগেও অনেকে ফেরাউনদের সমাধিসমূহ খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছে বলে ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়। তাদের কেউ কেউ সমাধির ভেতরে ঢুকে গিয়েছিল বলেও প্রমাণ পাওয়া যায়। কিন্তু তারা আর ফিরে আসতে পারেনি; কোথায় হারিয়ে গেছে, তা আর কারো জানা সম্ভব হয়নি। দুএকজন প্রাণ নিয়ে ফিরে আসলেও তারা আপাদমস্তক অন্যদের জন্য শিক্ষার উপকরণ হয়ে দাঁড়ায়। সে কারণে একটি বিশ্বাস বদ্ধমূল যে, ফেরাউনরা খোদা ছিল না বটে, কিন্তু মৃত্যুর পরও তাদের কাছে এমন শক্তি রয়ে গেছে, যার বলে তারা সমাধিতে গমনকারীদের শাস্তি দিয়ে থাকে। মানুষের কাছে এ বিশ্বাস গ্রহণযোগ্য হওয়ার কারণ হল, যখনই যে বাদশা যে কোন ফেরাউনের সমাধিতে হাত দিয়েছে, তার রাজত্বে পতন এসেছে। অনেকে আবার একই কারণে ফেরাউনদেরকে অপয়া বলেও মনে করে।
