এমনটা কক্ষনো হবে না- ফিলিপ অগাস্টাস বললেন- ক্রুশের মহান মুহাফিজ! এমনটা হবে না কখনো। আমাদের এই পরাজয়ের পেছনে কিছু কারণ ছিল। আমরা বিষয়টা নিয়ে ভেবে দেখেছি এবং আপনার উপস্থিতিতে এখনও বিষদ পর্যালোচনা হবে।
সম্ভবত তোমরা ভেবে দেখনি যে, মুসলমানদের গন্তব্য এখন বাইতুল মোকাদ্দাস- ক্রুশের মহান মুহাফিজ বললেন- তোমরা কি জান না, সালাহুদ্দীন আইউবী বাইতুল মোকাদ্দাস পুনরুদ্ধার করার শপথ নিয়েছিল? তোমাদের কি জানা নেই যে, বাইতুল মোকাদ্দাস মুসলমানদের প্রথম কেবলা, যার স্বার্থে তারা আপন সন্তানদের পর্যন্ত কুরবানী করতে পারে?
আমরা মুসলমানদের মধ্যে গাদ্দারীর বীজ বপন করেছি- ফিলিপ অগাস্টাস বললেন- আমরা মুসলমানদের মধ্যে এত গাদ্দার তৈরি করেছি, যারা সালাহুদ্দীন আইউবী ও নূরুদ্দীন জঙ্গীকে বাইতুল মোকাদ্দাসের পথে বিভ্রান্ত করে পিপাসায় মেরে ফেলবে।
তাহলে সেই মুসলমানরা কারা, যারা তোমাদের হাত থেকে এত শক্ত দুটি কেল্লা কেড়ে নিল?- ক্রুশের মুহাফিজ বললেন- তোমরা এ কথাটা ভুলে যেও না যে, মুসলমান একটি কঠিন জাতি। মুসলমান গাদ্দারীর পথ অবলম্বন করলে আপন ভাইয়ের গলায়ও ছুরি চালাতে পারে। কিন্তু সেই গাদ্দার মুসলমানেরই মধ্যে যখন জাতীয় চেতনা জেগে উঠে, তখন নিজের গলা কাটিয়ে পাপের প্রায়শ্চিত্ত আদায় করে। মুসলমান গাদ্দারও যদি হয়ে যায়, তোমরা তাদের উপর ভরসা রেখ না। বেশী দূর যেতে হবে না, কেবল নিকট অতীতের দশটি বছরের ঘটনাবলীতে চোখ বুলাও। হিসাব করে দেখ, গাদ্দার মুসলমানরা তোমাদেরকে কতটুকু ভূখণ্ড দিয়েছে? মিসরে পা রাখার মত সাহস তোমাদের এখনো হয়েছে কি? আজ মুসলমান ফিলিস্তীনে বসে আছে। কাল তোমাদের বুকে এসে বসবে। মনে রেখ আমার বন্ধুগণ! সালাহুদ্দীন আইউবী ও নূরুদ্দীন জঙ্গী যদি তোমাদের থেকে বাইতুল মোকাদ্দাস কেড়ে নিতে সক্ষম হয়, তাহলে ইউরোপকেও তোমরা ধরে রাখতে পারবে না। তবে সমস্যা ফিলিস্তীন- ইউরোপের নয়, সমস্যা পৃথিবীর কোন ভূখণ্ড নিয়ে নয়। আসল সমস্যা হল ক্রুশ ও ইসলামের। এটি দুটি ধর্ম ও দুটি আদর্শের লড়াই। এ দুটির যে কোন একটির পতন হতেই হবে। কিন্তু তোমরা কি ক্রুশের পতন মেনে নেবে?
না, পবিত্র পিতা! এমন কখনো হবে না- সভার পারিষদবর্গের মধ্যে জোশ সৃষ্টি হয়ে যায়- এত নিরাশ হওয়ার কোন কারণ নেই মহান পিতা!
তাহলে তোমরা সেই কারণগুলো খুঁজে বের কর, যার ফলে তোমাদের একের পর এক পরাজয় বরণ করতে হচ্ছে- ক্রুশের মুহাফিজ বললেন- আমি তোমাদেরকে যুদ্ধ সম্পর্কে কোন উপদেশ দিতে পারি না। আমি তো সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সৈনিক, আমি কালীসার মুহাফিজ। আমি কালীসার কুমারীদের শপথ করে বলছি, তোমরা দশজন কট্টর মুসলমানকে আমার সামনে নিয়ে আস, আমি তাদেরকে ক্রুশের পূজারী বানিয়ে ফেলব। তোমরা একটু ভেবে দেখ, তোমাদের এত বিশাল শক্তিধর সেনাবাহিনী মুসলমানদের ক্ষুদ্রতম একটি বাহিনীর মোকাবেলা কেন করতে পারছে না? তোমাদের পাঁচশ আরোহী সৈনিককে একশ পদাতিক মুসলিম সৈনিক কিভাবে পরাস্ত করে? কারণ একটাই- মুসলমান লড়াই করে ধর্মীয় চেতনা নিয়ে। তারা যখন তোমাদের মোকাবেলায় আসে, আসে বিজয় কিংবা মৃত্যুর শপথ নিয়ে। আমি শুনেছি, তাদের কমান্ডাররা তোমাদের পেছনে চলে যায় এবং অতর্কিত হামলা করে তোমাদের কোমর গুঁড়িয়ে দিয়ে তোমাদের তীর খেয়ে চালনীর ন্যায় ঝাঁঝরা হয়ে যায় কিংবা নিরাপদে কেটে পড়ে। ভেবে দেখ, দশ-বারজন মুসলমান দলবদ্ধ হয়ে কিভাবে তোমাদের হাজার হাজার সৈন্যের অভ্যন্তরে ঢুকে পড়ে? এ আর কিছু নয়- ধর্মীয় বিশ্বাস। তারা মনে করে, খোদা তাদের সঙ্গে আছেন, আছেন খোদার রাসূলও। এমন দুঃসাহসী অভিযানে তারা নির্দেশনা তাদের কমান্ডার থেকে গ্রহণ করে না, গ্রহণ করে কুরআন থেকে। আমি অতি মনোযোগ সহকারে কুরআন অধ্যয়ন করেছি। মুসলমানরা আমাদের বিরুদ্ধে যে লড়াই করে, কুরআন তাকে জিহাদ বলে। জিহাদ করা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য ফরজ। এমনকি ইসলামে জিহাদের গুরুত্ব নামাযের চেয়েও বেশী। কাজেই তোমরাও যতক্ষণ না নিজেদের মধ্যে উন্মাদনা সৃষ্টি করতে পারবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তোমরা মুসলমানদের পরাজিত করতে পারবে না।
আক্রার পাদ্রী তার পরাজিত শাসকমণ্ডলী ও কমান্ডারদের মধ্যে নবপ্রেরণা সৃষ্টি করার চেষ্টা করেন এবং বললেন, তোমরা নিজেরা বসে পর্যালোচনা কর যে, এসব পরাজয়ের কারণগুলো কী, এর দায়-দায়িত্ব কার কার উপর বর্তায় এবং কিভাবে এই পরাজয়গুলোকে বিজয়ে পরিণত করা যায়। নিজেদের সর্বশক্তি বাইতুল মুকাদ্দাসের প্রতি নিবদ্ধ কর। মনে রেখ, সালাহুদ্দীন আউবী ফেরেশতা নয়- তোমাদেরই ন্যায় একজন মানুষ। তার শক্তি শুধু একটাই যে, সে একজন পাকা ঈমানদার।
পাদ্রী বৈঠক ত্যাগ করে চলে যান।
পাদ্রীর চলে যাওয়ার পর সভাসদদের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়। আলোচনা-পর্যালোচনা ও বাকবিতণ্ডার পর তারা কতিপয় সিদ্ধান্তে উপনীত হয়। একটি সিদ্ধান্ত এই যে, আমরা আর জবাবী আক্রমণ করব না; বরং সুলতান আইউবী ও নূরুদ্দীন জঙ্গীকে সম্মুখে অগ্রসর হওয়ার এবং যুদ্ধ অব্যাহত রাখার সুযোগ প্রদান করব। তাদেরকে তাদের অবস্থান থেকে দূরে সরিয়ে নেয়া হবে এবং এদিক-ওদিক দিয়ে লড়াইয়ে জড়িয়ে রাখা হবে। এভাবে তাদের রসদ সরবরাহের পথ দীর্ঘ ও অনিরাপদ হয়ে পড়বে।
