কার্কের দুর্ভেদ্য দুর্গ মুসলমানদের দখলে আসে। বাইতুল মোকাদ্দাস মুসলমানদের চোখে পড়তে শুরু করেছে। এ ঘটনা ১১৭৩ সালের শেষ তিন মাসের।
৩.৩ ফেরাউনের গুপ্তধন
ফেরাউনের গুপ্তধন
ফিলিস্তীনে খৃস্টানদের কনফারেন্স চলছে। যে কোন জয়, যে কোন পরাজয়, পিছুহটা কিংবা সফল অগ্রযাত্রার পর বৈঠকে মিলিত হওয়া তাদের নিয়ম। বসে তারা মতবিনিময় করে, মদপান করে ও নারী নিয়ে আমোদ করে। তাদের বিশ্বাস, মদ আর নারী ছাড়া যুদ্ধজয় করা যায় না। তারা নিজেদের মেয়েদেরকে মুসলমানদের এলাকায় গুপ্তচরবৃত্তি, নাশকতা ও মুসলিম শাসকদের চরিত্র হননের জন্য লেলিয়ে দিচ্ছে আর নিজেরা অধিকৃত এলাকাসমূহ থেকে মুসলমান মেয়েদের অপহরণ করে নিজেদের বিনোদন উপকরণে পরিণত করছে।
গোয়েন্দারা তাদেরকে রিপোর্ট প্রদান করল যে, সালাহুদ্দীন আইউবী বলে থাকেন, খৃস্টানরা হল নারী ব্যাপারী আর মুসলমান হচ্ছে নারীর সম্ভ্রমের মোহাফেজ। শুনে খৃস্টান সম্রাট ও কমান্ডারগণ অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে। একজন উপহাস করে বলল, লোকটা এই সহজ কথাটা বুঝতে পারছে না যে, ক্রুশের পুত্ররা যেমন সৈনিক হয়ে ধর্মের কাঁজে তাদের দেহকে ব্যবহার করছে, তেমনি মেয়েরাও মুসলমানদেরকে বেকার করে তোলার জন্য নিজেদের দেহকে ব্যবহার করছে। আরেকজন বলল, সালাহুদ্দীন আইউবী এখনো টের পায়নি যে, তার জাতির অসংখ্য ছোট ছোট শাসক-কেল্লাদার ও সালারকে আমাদের এক একটি মেয়ে, সোনার এক একটি থলে এমনভাবে ঘায়েল করে রেখেছে যে, সেই পরাজয়ে তারা গর্ববোধ করছে এবং সুখ অনুভব করছে। এমতাবস্থায় সালাহুদ্দীন আইউবী আমাদের থেকে ইসলামের মর্যাদা কিভাবে রক্ষা করবে?
এ হল খৃস্টানদের প্রথম দিকের কনফারেন্সগুলোর বক্তব্যের সারাংশ। কিন্তু ১১৭৩ সালের শেষদিকে যখন বাইতুল মুকাদ্দাসে খৃস্টান সম্রাট ও নেতৃবৃন্দ বৈঠকে বসেন, তখন তাদের উপর অন্যরকম ভাব বিরাজ করছিল। এবার তারা সুলতান আইউবীকে নিয়ে তাচ্ছিল্য করছেন না। কারো মুখে হাসি নেই। কারো এ কথাও স্মরণ নেই যে, মদ-নারী ছাড়া তাদের বৈঠক চলে না। কার্ক থেকে তারা বড় লজ্জাজনক অবস্থায় পেছনে সরে এসেছে। তাদের মধ্যে উপস্থিত আছেন কার্ক-এর কেল্লাদার রেজনাল্ডও। রেজনাল্ড একজন বিখ্যাত সমরবিদ। সুলতান আইউবীর বাহিনীর সঙ্গে তিনি বারকয়েক সংঘর্ষে লিপ্তও হয়েছিলেন। এ বৈঠকে উপস্থিত আছে রেমান্ডও, যিনি কার্ক অবরোধের সময় সুলতান আইউবীর বাহিনীকে ঘিরে ফেলেছিলেন। রেমান্ড ও রেজনাল্ড দুজন মিলে এমন পরিকল্পনা তৈরি করেছিলেন, যা নিয়ে তারা বেজায় উস্ফুল্ল ছিলেন। কিন্তু সুলতান আইউবী কার্ক অবরোধ বহাল রাখতে সক্ষম হন এবং রেমান্ডের অবরোধ এমনভাবে ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে দেন যে, এবার তার বাহিনীই উল্টো সুলতান আইউবীর হাতে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। তাদের সব রসদ-পাতি ধ্বংস হয়ে যায়। ফলে সৈন্যরা আহত উট-ঘোড়াগুলো যবাই করে খেতে শুরু করে। তার অর্ধেকেরও বেশী সৈন্য আইউবীর হাতে মারা পড়ে। কিছু বন্দী হয় এবং অবশিষ্টরা পালিয়ে যায়।
রেজনাল্ড-এর ভাগ্য ভাল যে, নূরুদ্দীন জঙ্গীর বাহিনী যখন কার্ক দুর্গে ঢুকে পড়ে, তখন ভেতরের ভীত-সন্ত্রস্ত জনতার হৈ-হুঁল্লোড় ও ছুটাছুটির ফাঁকে তিনি প্রাণ নিয়ে পালিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছেন। অন্যথায় আজ এই কনফারেন্সে তিনি অংশ নিতে পারতেন না।
আজকের এই বৈঠকে খৃস্টানদের সেই যুদ্ধবাজ সরদারদের বিপুলসংখ্যক উপস্থিত আছেন, যাদেরকে বলা হয় নাইট। এটি একটি উপাধি, যা রাজার পক্ষ থেকে প্রদান করা হয়। কনফারেন্সে উপস্থিত আছেন আক্রার পাদ্রীও, যিনি ক্রুশের প্রধান মুহাফিজের মর্যাদায় ভূষিত। তাছাড়া উপস্থিত আছেন গে অফ লুজিনান, তার ভাই আমারলক ও মুসলমানদের প্রধান শত্রু ফিলিপ অগাস্টাস। নাইট ও অন্যান্য কমান্ডারদের সঙ্গে এ কনফারেন্সে উপস্থিত আছেন খৃস্টানদের সম্মিলিত ইন্টেলিজেন্স প্রধান হরমুন ও তার দু-তিনজন সহযোগী। প্রথম প্রথম সবাই চুপচাপ বসে থাকেন, যেন তারা কথা বলতে ভয় পাচ্ছেন। অবশেষে ফিলিপ অগাস্টাস প্রথম মুখ খুলেন। তিনি ক্রুশের প্রধান মুহাফিজ কে সভাপতি ঘোষণা করে তাকে উদ্বোধনী ভাষণ দেয়ার অনুরোধ জানান।
আমার সেই লোকদের উদ্দেশে ভাষণ দিতে লজ্জা লাগছে, যারা শপথ ভঙ্গ করেছে, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে এবং বাইতুল মুকাদ্দাসে জীবিত ও সহীহ সালামত এসে পৌঁছেছে- আক্রার পাদ্রী বললেন- আমি যীশুখৃষ্টের কাছে লজ্জিত। ক্রুশ দেখলে আমার চোখ লজ্জায় অবনত হয়ে আসে। তোমরা কি সবাই ক্রুশে হাত রেখে অঙ্গীকার করনি যে, জীবন দিয়ে হলেও তোমরা তার দুশমনকে নির্মূল করবে! তোমরা কি এই শপথ নাওনি যে, পৃথিবীর বুক থেকে ইসলামের নাম-চিহ্ন মুছে ফেলার জন্য প্রয়োজন হলে নিজেদের জীবন, সম্পদ ও শরীরের প্রতিটি অঙ্গ উৎসর্গ করতেও কুণ্ঠিত হবে না? কিন্তু তোমরা কজন এমন আছ, যাদের গায়ে সামান্য একটু আচড়ও লেগেছে? একজনও নেই! তোমরা শোবক দুর্গ মুসলমানদের হাতে তুলে দিয়ে পালিয়ে এসেছিলে। এবার ফেলে এসেছ কার্ক। আমি জানি, যারা ময়দানে জয়লাভ করে, তারা মাঝে মধ্যে পরাজিতও হয়। দুটি জয়ের পর একটি পরাজয় কোন ব্যাপার নয়। কিন্তু তোমাদের পরপর দুটি পরাজয়, দুটি পিছুটান প্রমাণ করছে যে, ক্রুশ ইউরোপেই বন্দী হয়ে গেছে এবং এমন একটি সময়ও আসন্ন, যখন ইউরোপের গীর্জাগুলোতে মুসলমানদের আযানের ধ্বনি গুঞ্জরিত হবে।
