সুলতান আইউবী তার বৈপ্লবিক পরিকল্পনায় সীমান্ত এলাকাগুলোকেও অন্তর্ভুক্ত রেখেছিলেন। এবার সেদিকে আরো বেশি দৃষ্টি দেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তার জন্য এ মুহূর্তে সর্বাপেক্ষা বেশি জরুরী তকিউদ্দীন ও তার বাহিনীকে সুদান থেকে বের করিয়ে আনা। কায়রো পৌঁছেই তিনি পরিকল্পনা প্রণয়নে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। রাতে এক তিলও ঘুমান না তিনি। তিনি নিজে সুদানের ময়দানে যেতে পারছেন না। আভ্যন্তরীণ ঘোলাটে পরিস্থিতি তাঁকে যেতে দিচ্ছে না। তিনি কায়রো ফিরে এসেই তকিউদ্দীনকে এ সংবাদ দেয়ার জন্য দূত প্রেরণ করেন যে, আমি মিসর এসে গেছি।
দূত ফিরে এসেছে। সে সংবাদ নিয়ে এসেছে যে, তকিউদ্দীনের এ পর্যন্ত বহু সৈন্য মারা গেছে এবং কিছু সৈন্য দুশমনের হাতে ধরা পড়েছে কিংবা পরিস্থিতির শিকার হয়ে এদিক-ওদিক পালিয়ে গেছে। দূত জানায়, তকিউদ্দীন তার অবশিষ্ট সৈন্যদেরকে একত্রিত করতে সক্ষম হয়েছেন। কিন্তু দুশমন তাদের ধাওয়া করে ফিরছে। তকিউদ্দীন জবাবী আক্রমণ করার সুযোগ পাচ্ছেন না। আপাতত তার কয়েক প্লাটুন সৈন্য প্রয়োজন, যাদের সহযোগিতায় তিনি বেরিয়ে আসার চেষ্টা করবেন।
সুলতান আইউবী সঙ্গে সঙ্গে তিন-চারটি কমান্ডো ইউনিট এবং কয়েক প্লাটুন অভিজ্ঞ সৈনিক সুদান পাঠিয়ে দেন। সুদান পৌঁছে তারা অভিযান শুরু করে। তকিউদ্দীনকে দুশমনের ধাওয়ার হাত থেকে মুক্ত করে বেরে করে আনাই তাদের লক্ষ্য। তারা পেছন দিক থেকে আক্রমণ করে দুশমনের ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে। কমান্ডো ইউনিটগুলো দুশমনকে অস্থির করে তোলে। কাঙ্খিত সময়ের আগেই তারা সাফল্য অর্জন করতে সক্ষম হয়।
তকিউদ্দীন সুদান আক্রমণে যারপরনাই ব্যর্থ হয়। সাফল্য শুধু এতটুকু অর্জিত হয় যে, তকিউদ্দীন, তার কেন্দ্রীয় কমান্ডের সালার ও অবশিষ্ট সৈন্যরা নিশ্চিত ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পেয়ে গেলেন। মিসরের সীমান্তে প্রবেশ করে তকিউদ্দীন টের পেলেন যে, তিনি তাঁর বাহিনীর অর্ধেক সুদানে খুইয়ে এসেছেন।
***
ওদিকে কার্ক জ্বলছে। নুরুদ্দীন জঙ্গীর কারিগররা প্রয়োজন অনুপাতে দূরপাল্লার মিনজানিক তৈরি করে নিয়েছে। এসব মিনজানিক দ্বারা পাথর ও আগুন নিক্ষেপ করা হচ্ছে। সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী ভেতরের কয়েকটি টার্গেট ঠিক করে দিয়ে গিয়েছিলেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল রসদের ডিপোর আগুনের প্রথম গোলাটি দুর্গের সেইদিক থেকে নিক্ষেপ করা হয়, যেদিক থেকে রসদের ডিপো খানিকটা কাছে। সৌভাগ্যবশত গোলা নিশানায় গিয়ে নিক্ষিপ্ত হয়। দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে উঠে। আগুনের লেলিহান শিখা জঙ্গী বাহিনীর মনোবল বাড়িয়ে দেয়। মুসলমানরা দূরপাল্লার তীর-কামানও তৈরি করে নিয়েছে। অতিশয় শক্তিশালী সিপাহীরা এগুলো ব্যবহার করছে। কিন্তু আট-দশটি তীর নিক্ষেপ করার পর তারা পরিশ্রান্ত হয়ে পড়েছে। সুলতান জঙ্গী আরো একটি দুঃসাহসী অভিযান পরিচালনা করেন। তিনি বেশ কজন শক্তিশালী সিপাহী বেছে নেন এবং তাদেরকে নির্দেশ দেন, তোমরা দুর্গের ফটকের উপর ঝাঁপিয়ে পড় এবং ফটক ভাঙ্গতে শুরু কর। ফটক ভাঙ্গার প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম তাদের সরবরাহ করা হয়।
জঙ্গীর এই জানবাজ বাহিনী ফটকের দিকে ছুটে যায়। উপর থেকে খৃস্টানরা বৃষ্টির মত তীর ছুঁড়তে শুরু করে। কয়েকজন জানবাজ মুজাহিদ শহীদ হয়ে যায়। জখম হয় কজন। সুলতান জঙ্গী দূরপাল্লার তীরান্দাজদের তথায় সমবেত করেন। সাধারণ তীরন্দাজদের একটি দলকেও ডেকে নেন। সবাইকে বিভিন্ন পয়েন্টে দাঁড় করিয়ে প্রাচীরের উপর অবস্থানরত খৃস্টান সেনাদের উপর তীর নিক্ষেপ করার নির্দেশ দেন। নির্দেশ পাওয়া মাত্র মুসলিম তীরন্দাজরা শাঁ শাঁ করে তীর ছুঁড়তে শুরু করে। জানবাজদের আরেকটি দল ফটকের দিকে ছুটে যায়। জঙ্গীর সৈন্যদের তীর ছোঁড়া এবার মুষলধারার বৃষ্টির রূপ ধারণ করে। প্রাচীরের উপর ডাক-চিৎকার শোনা যায়। খানিক পর প্রাচীরের উপর কতগুলো ড্রাম দেখা যায়। সেগুলো জ্বলন্ত কাঠ ও অঙ্গারে ভরা। তারা ড্রামগুলো বাইরের দিকে ফেলে দেয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু ড্রাম ঠেলে বাইরের দিকে দেয়ার জন্য যেইমাত্র একজন মাথা জাগায়, অমনি সে মুজাহিদদের তীরের নিশানায় পরিণত হয়। ফলে দুএকটি ড্রাম বাইরে এসে পড়লেও অন্য সবগুলো প্রাচীরের উপরই উপুড় হয়ে যায়। প্রাচীরের উপর দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে উঠে। আগুন নিক্ষেপকারীরাই নিজেদের আগুনে পুড়ে মরতে শুরু করে।
সুলতান জঙ্গীর একজন কমান্ডার জঙ্গীর আক্রমণের এই পন্থা দেখে ঘোড়া হাঁকিয়ে দুর্গের পেছন ফটকের দিকে ছুটে যায় এবং সেখানকার কমান্ডারকে বিষয়টি অবহিত করে। দুকমান্ডার মিলে পেছন ফটকেও একই পদ্ধতির হামলা পরীক্ষা করতে শুরু করে। প্রথম পর্যায়ে মুজাহিদরা কিছুটা ক্ষয়ক্ষতির শিকার হলেও শেষ পর্যন্ত তাদের এ অভিযানও সফল হয়। মুসলিম তীরন্দাজরা খৃস্টান সেনাদেরকে উপর থেকে আগুন নিক্ষেপ করার সুযোগ বন্ধ করে দেয়। সুলতান জঙ্গীও দুকমান্ডারের এ অভিযান সম্পর্কে অবহিত হন।
সুলতান জঙ্গী এবার মিনজানিক দ্বারা দুর্গের ভেতরে আগুনের গোলা নিক্ষেপ করার নির্দেশ দেন। মুসলিম বাহিনী কার্ক দুর্গের উভয় ফটকের দুঃসাহসী আক্রমণ অভিযান দেখে কারো নির্দেশের অপেক্ষা না করেই দুভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। একভাগ দুর্গের সামনে চলে যায়, অপর ভাগ পেছনের ফটকের দিকে। উভয় পয়েন্টে প্রাচীরের উপর এত অধিক তীরবর্ষণ করা হয় যে, উপরের প্রতিরোধ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। কার্ক দুর্গের সামনের ও পেছনের উভয় ফটক ভেঙ্গে ফেলা হয়। সুলতান জঙ্গীর বাহিনী দুর্গের ভেতরে ঢুকে পড়ে। শহরে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়। জনসাধারণের মধ্যে ভীতি ছড়িয়ে পড়ে। নিরীহ মানুষগুলো ছুটাছুটি শুরু করে দেয়। এই সুযোগে খৃস্টান সম্রাট ও কমান্ডারগণ দুর্গ থেকে পালিয়ে যায়। সন্ধ্যা নাগাদ খৃস্টান বাহিনী অস্ত্র সমর্পণে বাধ্য হয়। সুলতান জঙ্গী বন্দী মুসলমানদেরকে বন্দীদশা থেকে মুক্ত করেন। খৃস্টান সম্রাটদের শহরময় অনুসন্ধান করা হয়; কিন্তু কাউকে পাওয়া গেল না।
