সুলতান আইউবী আঘাত হানলেন সেসব লোকদের উপর, যারা ইসলামের স্বঘোষিত ইজারাদার সেজে বসেছিল। উপদেষ্টাগণ সুলতান আইউবীকে পরামর্শ দেন যে, ধর্ম একটি স্পর্শকাতর বিষয়। সাধারণ মানুষ মসজিদের ইমামদের ভক্ত। আপনার এই অভিযানে জনসমর্থন আপনার বিপক্ষে চলে যাবে। সুলতান জিজ্ঞেস করলেন, তাদের মধ্যে কজন এমন আছে, যারা ইসলামের মর্ম বুঝে? মানুষ তো তাদের ভক্ত হয়েছে এই জন্য যে, তারা তাদের সর্বশক্তি ব্যয় করে থাকে নিরীহ জনসাধারণ তাদের অনুরক্ত হোক। আমি জানি এই ইমামরা নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য, নিজেদের সম্মান ও স্বার্থ রক্ষা করার জন্য জনসাধারণকে ইসলামের সঠিক বুঝ ও আসল চেতনা থেকে অজ্ঞই রাখে। জাতির শ্রেষ্ঠ শিক্ষালয় হল মসজিদ। মসজিদের চার দেয়ালের ভেতরে বসে মানুষের কানে যা-ই দেয়া হয়, তা-ই মর্মমূলে পৌঁছে যায়। এ হল মসজিদের পবিত্রতা ও মহত্বের ক্রিয়া। কিন্তু আমাদের দেশে মসজিদের অপব্যবহার হচ্ছে। মসজিদে বসে একজন ইমাম পীর মুরশিদ সাজছে। এখনই যদি আমি অবস্থার পরিবর্তন ঘটিয়ে আমলদার আলেমদের নিয়োজিত না করি, তাহলে কিছুদিন পর মানুষ ইমাম ও পীর মুরশিদদের পূজা করতে শুরু করবে। এই বে-এলেম ও বে-আমল আলেমরা নিজেদেরকে আল্লাহ ও বান্দার মধ্যকার দূত বানিয়ে নেবে এবং ইসলামের পতনের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
যাইনুদ্দীন আলী বিন নাজা আল-ওয়ায়েজ একজন বিজ্ঞ চিন্তাশীল ও আমলদার আলেম। সুলতান আইউবী পরামর্শ নেয়ার জন্য তাকে ডেকে আনলেন। যাইনুদ্দীন বিন আলী ব্যক্তিগত উদ্যোগে গুপ্তচরবৃত্তির একটি ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন। একবার তিনি খৃস্টানদের ভয়ংকর এক ষড়যন্ত্র সম্পর্কে তথ্য দিয়ে বহু কুচক্রীকে ধরিয়েও দিয়েছিলেন। তিনি ধর্ম এবং ধর্ম বিষয়ে যেসব অপতৎপরতা চলছিল, সে সম্পর্কে পূর্ণ অবহিত ছিলেন। তিনি এই বলে সুলতান আইউবীর মনোবল বাড়িয়ে দেন যে, আপনি যদি আজ ধর্মকে অপতৎপরতা ও ষড়যন্ত্রের হাত থেকে রক্ষা করতে না পারেন, তাহলে কাল জাতি আপনার আদেশ-নিষেধ মান্য করার জন্য আগে নামধারী ধর্মগুরুদের অনুমতি নেয়া আবশ্যক মনে করবে আর আপনিও সেই রীতি মেনে নিতে বাধ্য হবেন। আর এতদিনে খৃস্টানরা মুসলমানদের ধর্মীয় চিন্তা-চেতনায় কুসংস্কার ও অনৈতিকতার সংমিশ্রণ ঘটিয়েই ফেলেছে।
বিজ্ঞ আলেম যাইনুদ্দীন বিন আলীর সমর্থন পেয়ে সুলতান আইউবী সঙ্গে সঙ্গে লিখিত ফরমান জারি করলেন যে, যাইনুদ্দীন বিন আলী বিন নাজা আল ওয়ায়েজের তত্ত্বাবধানে দেশের সকল মসজিদের ইমামদের ইলম, আমল ও চরিত্র ইত্যাদি বিষয়ে তদন্ত পরিচালিত হবে এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে নতুন ইমাম নিয়োগ করা হবে। ইমাম নিযুক্তির ব্যাপারে সুলতান আইউবী যে কটি শর্ত আরোপ করলেন, তার মধ্যে অন্যতম হল, ইমাম বিজ্ঞ আলিম হওয়ার পাশাপাশি সামরিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হতে হবে। সুলতান আইউবী জিহাদ, দর্শন ও সামরিক চেতনাকে ধর্ম ও মসজিদ-মাদ্রাসা থেকে পৃথক করতে রাজি নন।
তিনি দেশে এমন সব খেলাধুলা ও বিনোদনের উপকরণ ও পদ্ধতিকে অবৈধ ঘোষণা করেন, যাতে জুয়াবাজি ও চরিত্রহীনতার সংমিশ্রণ রয়েছে। তার নির্দেশে আলী বিন সুফিয়ানের গোয়েন্দা বিভাগ বিনোদনের বিভিন্ন আখড়ায় হানা দিয়ে নানারকম উলঙ্গ ছবি ইতাদি আপত্তিকর জিনিস উদ্ধার করে। গ্রেফতার করে অনেক কুচক্রীকে। তাদেরকে রাষ্ট্রদ্রোহিতা ও শক্রর পক্ষপাতিত্ব করার অভিযোগে আজীবনের জন্য কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে নিক্ষেপ করে। তার পরিবর্তে সুলতান আইউবী বিনোদনের জন্য তরবারী চালনা, ঘোড়সওয়ারী, অস্ত্র ছাড়া লড়াই ও কুস্তি ইত্যাকার খেলাধুলার প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা করেন। তিনি বিদ্যালয় ও মসজিদে জ্ঞান প্রতিযোগিতার রেওয়াজ চালু করেন।
সুলতান আইউবী সীমান্ত বাহিনীগুলোর প্রতি বিশেষভাবে মনোনিবেশ করেন। তিনি অবগত আছেন যে, শহর-নগর ও রাজধানী থেকে দূরে বসবাসকারী মানুষ সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের দ্রুত শিকার হয়ে পড়ে এবং তারাই সর্বপ্রথম দুশমনের আক্রমণের শিকার হয়। তাদের মানসিক ও দৈহিক রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সুলতান আইউবী বিশেষ পরিকল্পনা হাতে নেন। সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্টে তিনি যেসব বাহিনী প্রেরণ করেছেন, তিনি নিজে তাদেরকে দিক-নির্দেশনা ও কঠোর নীতিমালা প্রদান করেন। বাহিনীর কমান্ডারদের নিয়োগ করেছেন বেছে বেছে ঈমানী চেতনা, বিচক্ষণতা ও দেশপ্রেমের ভিত্তিতে। রুশদ ইবনে মুসলিমও সেসব কমান্ডারদেরই একজন, যিনি যেইমাত্ৰ মাহমুদের একটু ইঙ্গিত পেলেন যে, একজন গুরুত্বপূর্ণ আসামী ধরা পড়েছে, অমনি বাহিনী নিয়ে ছুটে চললেন। কমান্ডার যুদি আগের জন হত, তাহলে মাহমুদ গিয়ে তাকে খৃস্টান ও সুদানীদের পরিবেষ্টিত মদ-নারীতে মত্ত পেত আর টালবাহানা করে সময় নষ্ট করে কুচক্রীদের পালাবার সুযোগ করে দিত।
কমান্ডার রুশদ ইবনে মুসলিম, মাহমুদ ইবনে আহমদ ও ইমাম- যার নাম ইউসুফ ইবনে আজর- এ মুহূর্তে সুলতান আইউবীর কক্ষে উপবিষ্ট। তারা সুলতানকে নিহত ভেল্কিবাজের কাহিনী শোনাচ্ছেন। আলী বিন সুফিয়ানও বৈঠকে উপস্থিত। সুলতান আইউবী সীমাহীন আনন্দিত যে, এতবড় একটি সাংস্কৃতিক আক্রমণ প্রতিহত করা গেল। কিন্তু আলী বিন সুফিয়ান বললেন, সবেমাত্র আক্রমণ প্রতিহত করা শুরু হয়েছে। এর প্রতিক্রিয়া দূর করতে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন। আমি তথ্য পেয়েছি যে, সীমান্ত এলাকাগুলো থেকে সেনাবাহিনীতে ভর্তির লোক পাওয়া যাচ্ছে না। সীমান্ত সংলগ্ন এলাকার অধিবাসীরা সুদানীদের বন্ধু এবং মিসর সরকারের বিরোধী হয়ে গেছে। তাদের জিহাদী জযবা নিঃশেষ হয়ে গেছে। তারা তাদের উৎপাদিত খাদ্যশস্য, ও গবাদিপশু আমাদেরকে দেয় না- এসব তারা সরবরাহ করে সুদানীদের। সেসব এলাকার মসজিদ এখন বিরান। মানুষ কুসংস্কারে আচ্ছন্ন হয়ে দাগাবাজ ও ভেল্কিবাজ পীরদের পূজা করতে শুরু করেছে। তাদের মনমানসিকতাকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার জন্য নিয়মতান্ত্রিক অভিযান শুরু করা আবশ্যক। আলোচ্য ভেল্কিবাজ ও তার সাঙ্গপাঙ্গদের যদি হত্যা না করা হত, তাহলে তাদের গলায় জুতার মালা পরিয়ে জনতার মাঝে প্রদর্শন করে কাজ হাসিল করা যেত।
