আর শামউনের কন্যা সাদিয়াকে এ ব্যক্তিই অপহরণ করিয়েছিল জনতার উদ্দেশ্যে ইমাম বললেন- আমরা ওকে উদ্ধার করেছি।
ইমাম চোগাটা খুলে ফেলেন। ভেতরের কাপড়ও খুলেন। দেহ থেকে কাঠটা আলাদা করে রুশদ ইবনে মুসলিমের একজন সিপাহীর হাতে দিয়ে বললেন, এটিকে উপস্থিত জনতার প্রত্যেককে দেখিয়ে আন। সিপাহী কাঠটা হাতে নিয়ে ঘুরে ঘুরে সবাইকে দেখিয়ে আনে। ইমাম কাঠটা উঁচিয়ে ধরে জনতার উদ্দেশে বললেন, তীর আর খঞ্জর এই কাঠে বিদ্ধ হত।
জনতার সামনে সব রহস্য উন্মোচিত হয়ে যায়। ইমাম বললেন, এবার যাও, ঘুরে-ফিরে ওদের ভণ্ডামীর সাজ-সরঞ্জাম কোথায় কি আছে দেখ। মানুষ হুড়মুড় করে ছুটে যায়।
ঝুলন্ত পর্দার পেছনে একটি গুহা তৈরি করা হয়েছিল। রাতে ওখানে বসেই বাদকরা বাজনা বাজাত। মানুষ তাঁবুগুলোর মধ্যে ঢুকে পড়ে। সবগুলো
তাঁবুতে মদের উৎকট গন্ধ। সব জায়গা ঘুরে-ফিরে দেখার পর জনতাকে আবার এ স্থানে বসিয়ে ইমাম ভণ্ডটার ভণ্ডামীর বিস্তারিত বিবরণ দেন। ইমাম তথ্য বের করে নিয়েছেন যে, রাতে যে ছেলেটিকে জীবিত করা হয়েছিল, সে তাদেরই লোক। এখন রশি দিয়ে বাঁধা কয়েদীদের একজন সে। তাকে জনতার সম্মুখে নিয়ে আসা হল। দেখান হল আরো এক ব্যক্তিকে, যে রাতে বৃদ্ধর ভান ধরে লাশের পিতা সেজেছিল। যে চারজন তীরন্দাজ রাতে তীর চালিয়েছিল, তাদেরকেও সামনে নিয়ে আসা হল। তারাও সেই দলেরই মানুষ। এবার ইমাম জনতার উদ্দেশে ভাষণ দেন–
মুসলমানগণ! মনোযোগ সহকারে শোন! এরা সবাই ক্রুশের পূজারী। তোমাদের ঈমান ধ্বংস করতে এসেছে। তোমরা জান যে, কোন মানুষ মৃত মানুষকে জীবিত করতে পারে না। স্বয়ং আল্লাহও মরে যাওয়া মানুষকে জীবিত করেন না। কারণ, আল্লাহ নিয়ম ও আইন অনুযায়ী কাজ করেন। তিনি একক; তার কোন শরীক নেই। তার কোন সন্তান নেই। ক্রুশের পূজারী এই লোকগুলো ইসলামের আলোকে নির্বাপিত করার লক্ষ্যে এসব অস্ত্র ব্যবহার করছে। মিথ্যার পূজারী এসব মানুষ তোমাদের ঈমান, ঈমানী চেতনা ও তোমাদের তরবারীকে ভয় করে। এরা ময়দানে তোমাদের মোকাবেলা করার সাহস রাখে না। এ কারণে এসব আকর্ষণীয় পন্থা অবলম্বন করে তোমাদের অন্তরে সন্দেহ ও কু-মন্ত্রণা সৃষ্টি করার চেষ্টা করছে, যাতে তোমরা ইসলামের হেফাজতের জন্য ক্রুশের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করতে না পার। এই মিসরেই ফেরাউন নিজেকে খোদা বলে দাবি করেছিল। মহান আল্লাহ সেই খোদায়ী দাবীদারকে নীল নদে ডুবিয়ে মেরেছিলেন। আমার বন্ধুগণ! তোমরা নিজেদের মর্যাদা বুঝ। দুশমনকে ভালভাবে চিনে নাও।
উপস্থিত জনতা- যাদের সকলেই মুসলমান- অগ্নিশর্মা হয়ে উঠে। লোকগুলো অশিক্ষিত, পশ্চাৎপদ। ফলে সব ব্যাপারেই বাড়াবাড়ি করে ফেলা তাদের স্বভাব। ভক্তিতেও সীমালংঘন, বিরোধেও সীমালংঘন। তারা একজন পাপিষ্ঠ ভরে ভেল্কিবাজি দেখে তাকে খোদার পুত্র বলে বরণ করে নিয়েছিল। আর পরে তার বিপক্ষে বক্তব্য শুনে এমন উত্তেজিত হয়ে উঠল যে, ক্ষুব্ধকণ্ঠে ধ্বনি তুলে তার ও তার সাঙ্গপাঙ্গদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।
ইমাম আসামীদেরকে কায়রো পৌঁছিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বিক্ষুব্ধ জনতার ভীড়ের মধ্য থেকে তাদেরকে জীবিত বের করে আনা কঠিন হয়ে পড়ে। কমান্ডার রুশদ ইবনে মুসলিম যে কোন প্রকারে হোক জনতাকে নিয়ন্ত্রণে আনার পরামর্শ দেন। কিন্তু ইমাম তাতে সম্মত হলেন না। তিনি বললেন, তা করতে গেলে এই সহজ-সরল নিরীহ মানুষগুলো মারা যাবে। তা না করে বরং তাদের হাতেই ঐ পাপিষ্ঠদের জীবনের অবসান ঘটুক। তারা বুঝুক, যে লোকটি খোদার দূত ও পুত্র হওয়ার দাবি করল, সে একটা পাপিষ্ঠ মানুষ- যাকে যে কোন মানুষ হত্যা করতে পারে।
ইমাম, রুশদ ইবনে মুসলিম ও মাহমুদ একদিকে সরে যান। কমান্ডার একটি টিলার উপরে উঠে তার সিপাহীদের ডেকে বললেন, তোমরা যে যেখানে আছ, সেখানেই থাক; ওদেরকে বাধা দিও না।
কিছুক্ষণ পরের দৃশ্য। ঘটনাস্থলে ইমাম, মাহমুদ, কমানডার রুশদ ইবনে মুসলিম ছাড়া আর কেউ নেই। রাতে যেখানে ভেল্কি দেখানো হয়েছিল, সেখানে ভেল্কিবাজ ও তার সাঙ্গপাঙ্গদের লাশগুলো পড়ে আছে। জনতার রোষানল থেকে মেয়েরাও রেহাই পায়নি। খুন হয়েছে তারাও। ক্ষতবিক্ষত লাশগুলো পড়ে আছে। একটিও চেনার উপায় নেই। উত্তেজিত জনতা তাঁবু, পর্দা ও অন্যান্য সব সরঞ্জাম লুট করে নিয়ে গেছে। অপরাধী চক্রের উটগুলোও জনতা নিয়ে গেছে। লাপাত্তা হয়ে গেছে রুশদ ইবনে মুসলিমের নটি ঘোড়াও। মানুষ বুঝতে পারেনি যে, এগুলো তাদেরই সৈন্যদের ঘোড়া। সব মিলে মনে হচ্ছিল যে, হঠাৎ একটি ঝড় এসে সবকিছু উড়িয়ে নিয়ে গেছে।
আমার কায়রো যেতে হবে– ইমাম কমান্ডার ও মাহমুদকে বললেন ঘটনাটি সরকারকে অবহিত করতে হবে।
***
দিন কয়েকের মধ্যে সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী যেসব আইন জারি করলেন ও যেসব পদক্ষেপ হাতে নিলেন, তা ছিল বৈপ্লবিক- এতই বৈপ্লবিক যে, তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধুমহল ও ভক্তদের পর্যন্ত চমকে দিল। তিনি সর্বপ্রথম আলী বিন সুফিয়ান ও গিয়াস বিলবীসের সন্দেহভাজন তালিকাভুক্তদের বাড়ী-ঘরে তল্লাশি চালান। তাদের মধ্যে কেন্দ্রীয় কমান্ডের বেশ কজন পদস্থ কর্মকর্তাও ছিল। তল্লাশিতে তাদের ঘরে প্রচুর পরিমাণ হিরা-জহরত, মূল্যবান সহায় সামগ্রী ও ভিনদেশী অতিশয় রূপসী নারী উদ্ধার হয়। কারো কারো ঘরে এমন কতিপয় চাকর পাওয়া যায়, যারা মূলত সুদানের অভিজ্ঞ গুপ্তচর। তাছাড়া অভিযোগের পক্ষে আরো অনেক প্রমাণ পাওয়া যায়। সুলতান আইউবী পদমর্যাদা নির্বিশেষে তাদের প্রত্যেককে বন্দীশালায় নিক্ষেপ করেন এবং নির্দেশ দেন যে, এদের সঙ্গে সাধারণ বন্দীর ন্যায় আচরণ কররে। সুলতান আইউবীর এই পদক্ষেপের ফলে তার কেন্দ্রীয় কমান্ড ও উপদেষ্টা পরিষদের বেশকটি পদ শূন্য হয়ে যায়। কিন্তু তিনি তাতে বিন্দুমাত্র বিচলিত হলেন না।
