বাহিনীর কমান্ডার দামেস্ক-এর অধিবাসী। নাম রুশদ ইবনে মুসলিম। সরকারের সাধারণ একজন কর্মচারী। কিন্তু সীমান্ত চৌকিতে এসে তিনি তার সিপাহীদের উদ্দেশে যে ভাষণ প্রদান করেন, তাতে তার বিরাট ব্যক্তিত্বের প্রকাশ ঘটে। তিনি বললেন
গোটা দেশ শুধু তোমাদের উপর ভরসা করে ঘুমায়। সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী সব সময়-ই তোমাদের সঙ্গে আছেন। তোমরা যদিও তাকে দেখতে না পাও, তাহলে তাকে আমার চোখে দেখ। আমরা সকলেই এক একজন সালাহুদ্দীন আইউবী। এখানে কেউ যদি পুরাতন বাহিনীর সিপাহীদের ন্যায় ঈমান বিক্রি কর, তাহলে আমি হাত-পা বেঁধে তাকে মরুভূমিতে ফেলে আসব। তার শাস্তির নির্দেশ আমি কায়রো থেকে নেব না। আমি আল্লাহ থেকে নির্দেশ নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকি।
ভোর হল। রুশদ ইবনে মুসলিম দেখলেন, তাঁবুগুলোতে কোন নড়াচড়া নেই। তার মানে ওদের জাগতে এখনো দেরী। তিনি জনতাকে বললেন, তোমরা একটু সরে গিয়ে বস; কিন্তু চলে যেও না, অপেক্ষা কর। তোমাদের কাংখিত পবিত্র মানুষটিকে অতি কাছে থেকেই তোমরা দেখতে পাবে।
জনতাকে সরিয়ে দিয়ে কমান্ডার তিন-চারজন অশ্বারোহী সিপাহীকে বিভিন্ন টিলার উপর দাঁড় করিয়ে দেন, যাতে অপরাধীদের কেউ পালাতে না পারে। অবশিষ্ট সৈনিকদেরকে নির্দেশ দিলেন, তোমরা ঘোড়া থেকে নেমে চারদিকে থেকে ভেতরে ঢুকে পড়। কেউ প্রতিরোধ করলে তাকে হত্যা করে ফেল। কেউ পালাবার চেষ্টা করলে তাকে তীর ছুঁড়ে মেরে ফেলে। অবশ্য পালাবার সুযোগ নেই এখানে।
কমান্ডার খোলা তরবারী হাতে একটি তাঁবুতে প্রবেশ করেন। দেখলেন, একটি অর্ধনগ্ন মেয়ে ও দুজন পুরুষ ঘুমিয়ে আছে। তরবারীর আগার খোঁচা দিয়ে তিনি তাদের জাগাবার চেষ্টা করেন। তারা জাগ্রত হওয়ার পরিবর্তে উল্টো গালাগাল শুরু করে দেয় এবং পার্শ্ব পরিবর্তন করে আবার ঘুমিয়ে পড়ে। এবার কমান্ডারের তরবারীর আগা তাদের চামড়া ছেদ করে যায়। তিনজনই বিড় বিড় করে ওঠে। তাদের বের করে নিয়ে যাওয়া হয়। অন্যান্য তাঁবুগুলোতেও যেসব নারী ও পুরুষদের পাওয়া গেল, সকলের একই অবস্থা। একটি তাঁবুতে পাওয়া গেল অনেকগুলো সারিন্দা-হারমোনিয়াম।
ধৃত আসামীদের সবাইকে একস্থানে জড়ো করে পাহারা বসিয়ে দেয়া হল। তাদের উট ও অন্যান্য জিনিসপত্র সব জব্দ করা হল। ইমাম মসজিদের হুজরা থেকে বড় আসামীকে নিয়ে আসেন। তার দুহাত পিঠমোড়া করে বাঁধা। রাতে যেস্থানে সে মোজেজা দেখিয়েছিল, তাকে সেখানে দাঁড় করিয়ে রাখা হল। পিছনটায় এখনও পর্দা ঝুলছে। তার সাঙ্গপাঙ্গদের তার সম্মুখে বসিয়ে দেয়া হল। তাদেরও প্রত্যেকের হাত পিঠমোড়া করে বাঁধা। উদ্ধারকৃত বাদ্যযন্ত্রগুলো সামনে রাখা হল। ইমাম জনতাকে এগিয়ে আসতে বললেন। জনতা হুড়মুড় করে এগিয়ে আসে। ইমাম বললেন, তোমরা লোকটাকে বল, যদি তুমি খোদার দূত বা খোদার পুত্র হয়ে থাক, তাহলে তোমার হাতের বন্ধন খুলে ফেল। এ নাকি মরা মানুষ জীবিত করতে পারে। আমি এর দলের একজনকে খুন করব। তোমরা একে বল, যেন এ তাকে আমার হাত থেকে তাকে বাঁচিয়ে রাখে কিংবা মারা গেলে জীবিত করে নেয়। বলেই ইমাম তার দলের একজনকে ধরে আনেন এবং কমান্ডারের হাত থেকে তরবারীটা নিয়ে আঘাত হানতে উদ্যত হন। লোকটি চীৎকার করে বলে উঠে, আমাকে ক্ষমা করে দিন। এ লোকটি আমাকে জীবিত করতে পারবে না। এ বড় পাপী মানুষ। আল্লাহর ওয়াস্তে আমাকে খুন করবেন না।
জনতার সংশয় এখনো কাটেনি। ইমাম লোকটার চোগা এবং অন্যান্য কাপড়-চোপড়ও সঙ্গে করে নিয়ে এসেছেন। নিয়ে এসেছেন তার দেহ থেকে খুলে নেয়া নরম কাঠ এবং চামড়াও। ইমাম নিজে কাপড়গুলো পরিধান করেন। কাউকে না দেখিয়ে চামড়া মোড়ানো নরম কাঠটাও বুকে বেঁধে নেন। তারপর চোগা পরিধান করেন। তিনি কমান্ডারকে বললেন, আপনার চারজন তীরন্দাজকে আমার সামনে আসতে বলুন। তারা আসে। ইমাম তাদেরকে বললেন, আমার থেকে ত্রিশ কদম দূরে গিয়ে দাঁড়াও। আমার বুকটাকে নিশানা বানিয়ে তীর ছোঁড়।
তীরন্দাজরা রুশদ ইবনে মুসলিমের প্রতি প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকায়। রাতে মাহমুদ কমান্ডারকে তীর-খঞ্জরের কাহিনী বিস্তারিত শুনিয়েছিল। কমান্ডার তার তীরন্দাজদের নির্দেশ দেন, তীর চালাও। তারা নিশানা ঠিক করে তীর ছোঁড়ে। চারটি তীর ইমামের বুকের ঠিক মাঝখানটায় এসে গেঁথে যায়। ইমাম বললেন, এবার চারজন এগিয়ে এসে আমার বুকে চারটি খঞ্জরের আঘাত হান। চারজন সর্বশক্তি প্রয়োগ করে ইমামের বুকে খঞ্জরের আঘাত হানে। খঞ্জর ইমামের বুকে গিয়ে আটকে যায়।
ইমাম তীরন্দাজদের বললেন, আরো একটি করে তীর ধনুকে সংযোজন করে নাও। তিনি দাগাবাজ পবিত্র মানুষটিকে সামনে এনে দাঁড় করান। জনতাকে উদ্দেশ করে উচ্চস্বরে বললেন, এ লোকটি নিজেকে অক্ষয় বলে দাবি করে। আমি তোমাদেরকে দেখাব, লোকটি আসলে কী। তিনি তীরন্দাজদের বললেন, এর হৃদপিন্ডকে নিশানা বানিয়ে তীর নিক্ষেপ কর।
চারটি ধনুক উপরে উঠে প্রস্তুত হয়ে যায়। লোকটি দৌড়ে ইমামের পেছনে চলে আসে। মৃত্যুর ভয়ে লোকটি থর থর করে কাঁপছে আর ইমামের নিকট জীবন ভিক্ষা চাচ্ছে। ইমাম তাকে বললেন, সামনে আস এবং জনতাকে বল যে, তোমরা খৃস্টানদের নিয়োজিত সন্ত্রাসী ও দাগাবাজ। সঙ্গে সঙ্গে লোকটি জনতার দিকে মুখ করে উচ্চস্বরে বলতে শুরু করল, আমি অক্ষয় নই। আমি তোমাদের-ই ন্যায় মানুষ। তোমাদের ঈমান নষ্ট করার জন্য খৃস্টানরা আমাকে নিয়োজিত করেছে। তারা আমাকে বেতন দেয়।
