অনেক পথ ঘুরে তারা গ্রামে পৌঁছে। চলে যায় সোজা মসজিদের ইমামের হুজরায় নিয়ে ভেল্কিবাজকে কাঁধ থেকে নামানো হয়। বন্ধন খুলে দেয়া হয়। তার বুকে তীর ও খঞ্জর গেঁথে আছে। সাদিয়াকেও তারা হুজরায় রাখে। আশংকা আছে, ঘটনা জানাজানি হয়ে গেলে ভেল্কিবাজের দলের লোকেরা এসে আক্রমণ করতে পারে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তাদের একথা ভাববারও পরিবেশ নেই যে, তাদের খোদার পুত্র কোথায়। জনসমাবেশের পর এখন তারা মদ নারী নিয়ে ব্যস্ত। তারা ভাবতেও পারছে না, তাদের মনিব নতুন চিড়িয়াসহ অপহরণ হতে পারে।
ইমাম ও মাহমুদ ধৃত ভেল্কিবাজকে পরিধানের চোগা খুলতে বলেন। সে প্রথমে তীর ও খঞ্জর টেনে বের করে। তারপর চোগা খুলে। ভিতরের পোষাকও খোলানো হয়। পোষাকের নীচে গায়ে নরম কাঠ বাঁধা। কাঠের উপরে চামড়া জড়ানো। তার বুকটা সম্পূর্ণ কাঠ দ্বারা ঢাকা। চামড়া জড়ানো এই কাঠে-ই বিদ্ধ হয়েছিল তীর ও খঞ্জরগুলো। সে ইমাম ও মাহমুদকে বলল, কি চাও বল- সোনা-রূপা, উট যা চাও, যত চাও দেব; আমাকে ছেড়ে দাও।
তুমি ছাড়া পাবে না। ইমাম বললেন।
ইমাম মাহমুদকে বললেন, নিকটবর্তী চৌকিটা কোথায় তা তোমার নিশ্চয় জানা আছে। সেখানকার সব সৈনিকদের নিয়ে আস।
মাহমুদ যাওয়ার জন্য উঠে দাঁড়ায়। হুজরা থেকে বের হয়। ইমামও উঠে দরজায় দাঁড়িয়ে মাহমুদকে কানে কানে বলেন, আগে এখানকার সহকর্মীদের আমার কাছে পাঠিয়ে দাও।
মাহমুদ ইমামের ঘোড়ার জিনে বসে-ই সাওয়ার হয়ে রওনা দেয়। ইমামের এ এলাকার গোয়েন্দাদ্বয়কে যথাস্থানে পেয়ে যায়। তাদেরকে এক্ষুণি মসজিদে গিয়ে ইমামের সঙ্গে দেখা করতে বলে চৌকি অভিমুখে ছুটে চলে। ঘন্টা দেড়েকের পথ।
মাহমুদ ছুটে চলেছে। কিন্তু তার মনে সংশয়। চৌকির কমান্ডারকে চিনে সে। লোকটা নীতিহারা। খৃষ্টান ও সুদানীরা ঘুষ দিয়ে তাকে দলে ভিড়িয়ে রেখেছে। মাহমুদ সে রিপোর্টও কায়রো পাঠিয়েছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। মাহমুদ প্রায় নিশ্চিত যে, কমান্ডার তার বাহিনীকে দিবে না কিংবা টালবাহানা করে কালক্ষেপন করবে, যাতে শত্ৰু হাত থেকে ছুটে যেতে পারে। তা-ই যদি হয়, তাহলে কী করবে ভাবছে মাহমুদ। অথচ, রাত পোহাবার আগেই বাহিনী নিয়ে গ্রামে পৌঁছতে হবে তাকে। সৈন্য না পেলে ইমাম ও তার গোয়েন্দাদের জীবন বিপন্ন হতে পারে। কারণ, ধৃত দাগাবাজের হাতে অনেক লোক আছে। তার সাধারণ ভক্ত-মুরীদরাও অনেকে তার জন্য নিবেদিত।
ইমামের কাছে খঞ্জর আছে। তার গোয়েন্দারাও এসে গেছে। তাদের কাছেও খঞ্জর আছে। তারা ভেল্কিবাজকে পাহারা দিয়ে আটকে রাখে। লোকটি মুক্তির জন্য এত মূল্যের অফার দিয়ে যাচ্ছে যে, ইমাম ও তার গোয়েন্দারা কখনো তা স্বপ্নেও দেখেনি। ইমাম তাকে বললেন, আমি এখন মসজিদে বসা আছি। এটি সেই আল্লাহর ঘর, যিনি তোমাকে সত্য দ্বীনসহ আকাশ থেকে নামিয়েছেন। আর এই বুঝি তোমার সত্য দ্বীন? দেখ দোস্ত! আমি কায়রো সরকারের একজন কর্মকর্তা। যত লোভ-ই দেখাও, আমি তোমাকে ছাড়তে পারি না। আমি ঈমান বিক্রি করতে পারি না।
মাহমুদ বিন আহমদ চৌকিতে গিয়ে পৌঁছে। কমান্ডারের তাঁবু তার চেনা। তাঁবুতে আলো জ্বলছে। ঘোড়ার পদশব্দ শুনে কমান্ডার তাঁবুর বাইরে বেরিয়ে আসেন। কিন্তু ইনি কে! কমান্ডারকে মাহমুদ চিনতে পারছে না। মাহমুদ নিজের পরিচয় দেয়। কমান্ডার তাকে তাঁবুতে নিয়ে যায়। কমান্ডার জানালেন, গতকাল সন্ধায় পুরাতন বাহিনীকে প্রত্যাহার করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে এবং তার পরিবর্তে একটি নতুন বাহিনী এসেছে। এই রদবদল হয়েছে সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর নির্দেশে। এরা সুলতান আইউবীর সঙ্গে ময়দান থেকে আসা বাহিনী।
মাহমুদ কমান্ডারকে জানায়, আমরা বিরাট এক শিকার পাকড়াও করেছি এবং তার পুরো গ্যাং ধরার জন্য এক্ষুণি চৌকির সব সৈন্য প্রয়োজন। রাতারাতি-ই তাদেরকে ঘিরে ফেলতে হবে।
বাহিনীর সেনাসংখ্যা পঞ্চাশের অধিক। কমান্ডার সঙ্গে সঙ্গে তাদেরকে তৈরি হয়ে ঘোড়ায় সওয়ার হওয়ার নির্দেশ দেন। তাদের কাছে আছে বর্শা, তরবারী, তীর ও তীরন্দাজ। মাত্র আট-দশজন সিপাহীকে চৌকিতে রেখে দেয়া হয়। এরা এসেছে কার্ক অবরোধ অভিযান থেকে। অটুট চেতনার অধিকারী এরা।
কমান্ডার দ্রুত ঘোড়া ছুটান। পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছে মাহমুদ। গন্তব্যের নিকটে পৌঁছে ঘোড়ার গতি কমিয়ে দেয়া হয়, যাতে অপরাধীরা টের না পায়। তবে অপরাধীরা টের পাওয়ার মত অবস্থায় ছিলও না। মদ ও নিদ্রা তাদেরকে অজ্ঞান করে রেখেছে।
কমান্ডার মাহমুদের দিক-নির্দেশনায় এলাকাটা সম্পূর্ণ ঘিরে ফেলেন এবং অভিযান ভোর নাগাদ মুলতবী রাখেন। মাহমুদ ইমামকে সংবাদ জানিয়ে দেয় যে, বাহিনী যথাসময়ে এসে গেছে। সাদিয়া ইমামের হুজরায়-ই অবস্থান করছে। ইমাম একজন দূত পাঠিয়ে সাদিয়ার পিতাকেও ডেকে আনেন।
তাকে এক নজর দেখার উদ্দেশ্যে দূর-দূরান্ত থেকে আগত ভক্ত-মুরীদ দর্শনার্থীরা রাতের কারামত দর্শনের পর খোলা আকাশের নীচে, শুয়ে পড়েছে। তাদের পবিত্র মানুষ তাদেরকে বলেছিল, আগামী রাত আমি তোমাদের আর্জি শুনব। সকালের আলো ফোঁটার আগেই তারা জেগে ওঠে। আবছা অন্ধকারে অনেকগুলো ঘোড়া দেখতে পায় তারা। ঘোড়াগুলোর আরোহীরা সৈনিক বলে মনে হল তাদের কাছে। বিষয়টা তারা কিছুই বুঝে উঠতে পারল না। তাদের জানা নেই যে, মৃত প্রাণীকে জীবনদানের ক্ষমতাওয়ালা মানুষটি মসজিদের হুজরায় হাত-পা বাঁধা অবস্থায় বসে আছে।
