ইমাম ও মাহমুদ আলোময় একটি তাঁবুর নিকটে গিয়ে কান পেতে মেয়েদের কথা শোনার চেষ্টা করে। মেয়েদের কথাবার্তা তাদের মনোবল বাড়িয়ে দেয়। এক নারীকণ্ঠ বলছে, ম্যাজিক এখানেও সফল হচ্ছে। আরেকজন বলল, বড় মূর্খ সম্প্রদায়।
মুসলমানদেরকে ধ্বংস করার এই একটাই পন্থা যে, তাদেরকে ম্যাজিক দেখিয়ে কুসংস্কারাচ্ছন্ন বানিয়ে দাও- আরেক নারীর কণ্ঠ।
জানি না ও কি অবস্থায় আছে।
কে?
নতুন চিড়িয়া- এক মেয়ে বলল-তোমাদের স্বীকার করতেই হবে, ওটা আমাদের সকলের চেয়ে রূপসী।
মেয়েটা দিনভর কেঁদেই চলেছে- একজন বলল।
আজ রাতেই তার কান্না থেমে যাবে- এক মেয়ে বলল- ওকে খোদার পুত্রের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে।
মেয়েদের অট্টহাসি শোনা যায়। একজন বলল, খোদা কি স্মরণ করবেন যে, আমরা তাকে কেমন পুত্র দিয়েছি। বড় কামেল মানুষ।
মেয়েরা পরস্পর অশ্লীল কথোপকথন শুরু করে। ইমাম ও মাহমুদ বুঝে ফেলেছেন, নতুন চিড়িয়া সাদিয়া ছাড়া কেউ নয়। তারা সর্বোতভাবে নিশ্চিত হন যে, এসব কর্মকাণ্ড ম্যাজিক-যাদু বৈ নয়। পশ্চাৎপদ মুসলমানদের বিভ্রান্ত করার জন্য এ এক পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র। ইমাম মাহমুদের কানে কানে বললেন, এই মেয়েগুলোর অশ্লীল কথা-বার্তা ও মদের গন্ধই প্রমাণ করে এরা কারা এবং কী করছে…। আমরা ক্ল পেয়ে গেছি বলা যায়।
ইমাম ও মাহমুদ বড় তাবুর নিকট চলে যান। তাঁবুটি একটি টিলা ঘেঁষে তৈরি করা। টিলা ও তাঁবুর পেছন দরজার মাঝখানের ব্যবধান এক-আধ গজের বেশী নয়। তাঁবুর সন্নিকটে গিয়ে তারা উঁকি দিয়ে তাকায়। তাঁবুর পর্দা মধ্যখানে রশি দিয়ে বাঁধা। ভিতরে উঁকি দিয়ে তাকানোর জন্য এক স্থানে এক চোখ পরিমাণ ফাঁকা। ইমাম ও মাহমুদ এই ছিদ্রপথে উঁকি দিয়ে তাকান। ভিতরে লম্বা একটি পালংক পাতানো।
পালংকে জাজিম বিছানো। তার উপর অতি আকর্ষণীয় চাদর। দুধারে দুটি প্রদীপ জ্বলছে। একধারে মদের সোরাহী ও গ্লাস রাখা। পালংকের উপর সাদিয়া বসা। ভিতরের সাজ-সজ্জা ও শান-শওকত প্রমাণ করে, এটি-ই এই কাফেলার নেতার তাঁবু। সাদিয়ার পার্শ্বে উপবিষ্ট একজন নারী ও একজন পুরুষ। সাদিয়াকে বধূসাজে সাজাচ্ছে তারা।
আজ সারাটা দিনই তুমি কেঁদে কাটালে- সাদিয়াকে উদ্দেশ করে মহিলা বলল- তবে একটু পর-ই তোমার মনে হাসি ফুটে যাবে এবং তুমি নিজেকে চিনতেই পারবে না। তুমি বড় ভাগ্যবতী মেয়ে যে, যে মহান ব্যক্তি আল্লাহর পক্ষ থেকে আমাদের কাছে এসেছেন, তিনি তোমাকে পছন্দ করেছেন। তিনি শুধু তোমার জন্য এ এলাকায় এসেছেন। বিশ দিনের দূরত্ব থেকে গায়েবী চোখে তিনি তোমায় দেখেছিলেন। স্বয়ং খোদা তাকে তোমাদের গ্রামে নিয়ে এসেছেন। ইনি যদি না আসতেন, তাহলে তোমার পিতা তোমাকে কোন অসহায় বেদুইনের কাছে বিয়ে দিয়ে দিতেন কিংবা কারো কাছে বিক্রি করে ফেলতেন।
মহিলার কথাগুলো সাদিয়ার উপর যাদুর ন্যায় ক্রিয়া করতে শুরু করে। সাদিয়া নীরবে শুনছে। চরম উত্তেজনা এসে গেছে মাহমুদের। ইমাম তাকে ঠেকিয়ে রাখেন। তিনি দেখতে চান যে, সাদিয়াকে কিসের জন্য সাজানো হচ্ছে।
খানিক পর টিলার অপর দিক থেকে ঘোষণা হয়, তিনি খোদার প্রেরিত পয়গম্বর এবং যার হাতে আমাদের সকলের জীবন ও মৃত্যু, যার চোখ গায়েব দর্শনে সক্ষম, এখন তিনি রাতের অন্ধকার ভেদ করে আকাশে চলে যাচ্ছেন। তোমরা কেউ তাঁবু এলাকার দিকে দৃষ্টিপাত করবে না এবং টিলার উপরে উঠবে না। কেউ সেদিকে যাওয়ার বা দেখার চেষ্টা করলে, সে চিরদিনের জন্য অন্ধ হয়ে যাবে। আগামী রাত তিনি তোমাদের প্রত্যেকের আকুতি শুনবেন।
ইমাম ও মাহমুদ সেখানেই দাঁড়িয়ে রইলেন। তাঁবুর ভিতর পুরুষ ও মহিলা সাদিয়াকে সাবধান করিয়ে দেয় যে, তিনি আসছেন। খবরদার কোন প্রকার বে-আদবী যেন না হয়।– তিনি এসে পড়েছেন। সম্মুখ দিক থেকে পর্দা তুলে তাবুতে প্রবেশ করেন। বুকে তার চারটি তীর ও চারটি খঞ্জর বিদ্ধ হয়ে আছে। দেখে ইমাম ও মাহমুদ অবাক হয়ে যান। সাদিয়া ভয়ে আৎকে উঠে। অস্ফুট একটা চীৎকার বেরিয়ে যায় তার মুখ থেকে। তিনি মুচকি হাসলেন এবং বললেন, ভয় পেয় না বেটী! এই মোজেজা খোদা আমাকে দিয়েছেন যে, তীর-খঞ্জর আমাকে মারতে পারেনা। তিনি সাদিয়ার গা ঘেঁষে বসে পড়েন।
এই ভেল্কি আমি একবার কায়রোতে দেখেছিলাম- মাহমুদের কানে কানে ইমাম বললেন- আমি জানি, তীর- খঞ্জর কোথায় গেঁথে আছে। তিনি উঠে। দাঁড়ান। তাঁবুর পদাটা ভিতর থেকে রশি দ্বারা বেঁধে দেন।
আর অপেক্ষা করার সুযোগ নেই। চোখাচোখি করে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন ইমাম ও মাহমুদ। বেপরোয়া হয়ে উঠেন তারা। বাইরে থেকে পর্দাটা খুলে ফেলেন। শা করে ঢুকে পড়েন ভিতরে। কারো পায়ের আওয়াজ শুনে তিনি পিছনে ঘুরে তাকান। অমনি তারা ঝাঁপটে ধরেন লোকটাকে। মাহমুদ সাদিয়াকে ইংগিত করে বলে, পালংকের উপর থেকে চাদরটা তুলে এর গায়ের উপর ছুঁড়ে দাও। হতভম্ব সাদিয়া তা-ই করে। লোকটার দেহ বেশ শক্তিশালী মনে হল। ইমাম ও মাহমুদ তাকে চাদর পেঁচিয়ে শক্তভাবে আটকে ফেলেন। বাতিগুলো নিভিয়ে দেয়া হল। ইমামের নির্দেশে সাদিয়া তাঁবুর বাইরে বেরিয়ে যায়। মাহমুদ চাদর পেচানো বন্দীটাকে কাঁধে তুলে নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। ধরা পড়ার ভয় প্রতি পায়ে। তারা সতর্কপদে বন্দী ও অপহৃতা সাদিয়াকে নিয়ে নিরাপদ দূরত্বে চলে যায়। রাতের আঁধার তাদের বেশ সহযোগিতা করে।
